খেলার জন্য নির্মিত, ব্যবহৃত হচ্ছে হাটবাজার হিসেবে
শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্টেডিয়ামটি যেন অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির এক নীরব স্মারক।
৪১ লাখ টাকা সরকারি অর্থ ব্যয়ে, আশাবাদ আর স্বপ্নকে সঙ্গী করে নির্মিত এই স্টেডিয়ামের উদ্দেশ্য ছিল এলাকার তরুণদের অনুপ্রাণিত করা এবং উদীয়মান ক্রীড়াবিদদের স্বপ্নকে লালন করা। কিন্তু বাস্তবে এটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। বরং নতুন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক যে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধ অবকাঠামোর চেয়ে উন্মুক্ত খেলার মাঠে জোর দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন, এই স্টেডিয়াম যেন তার প্রয়োজনীয়তারই জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
২০১৭ সালে স্টেডিয়াম নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। যৌথভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আখতার এন্টারপ্রাইজ এবং ঢাকাভিত্তিক ফোর সাইট কোম্পানি প্রকল্পটির কাজ পায়। ২০১৯ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই প্যাভিলিয়ন ভবনে ফাটল দেখা দেয়, যা নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবুও স্টেডিয়ামটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু তারপর থেকে এটি প্রায় অচলই পড়ে আছে।
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের অভিযোগ, গত প্রায় ছয় বছরে এখানে একদিনের জন্যও কোনো খেলাধুলার আয়োজন হয়নি। বরং প্রতি শনিবার স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে বসে জমজমাট হাট। গরু-ছাগল ও আসবাবপত্র কেনাবেচায় মুখর থাকে পুরো মাঠ, যে মাঠে গড়ে ওঠার কথা ছিল ক্রীড়াবিদ, সেখানে এখন চলছে পশু বাণিজ্য।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় হতাশাজনক চিত্র। খেলার মাঠজুড়ে অসংখ্য গর্ত। গ্যালারির বেঞ্চগুলো মাটি ও আগাছায় ঢেকে গেছে। বৃষ্টির পানিতে মাটি ক্ষয়ে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাউন্ডারি ও কাঠামো। অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে গরু-ছাগল, চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আবর্জনা। ভবনের দেয়ালের লাইনিং খসে পড়ছে, গণশৌচাগার নষ্ট অবস্থায়, এমনকি গোলপোস্টগুলোও ভাঙা ও অযত্নে পড়ে আছে।
স্থানীয় ফুটবলার ও কলেজশিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, 'আমাদের বাড়ির পাশেই স্টেডিয়াম, কিন্তু আমরা ব্যবহার করতে পারি না। ফুটবল অনুশীলন করতে চাই, কিন্তু মাঠজুড়ে গর্ত।'
সাবেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক আক্তারুজ্জামান খান জানান, 'আমি এখানে টুর্নামেন্ট আয়োজনের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীরা বাধা দেন। এখন রাতে এখানে মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীরা আড্ডা দেয়, অথচ স্থানীয় প্রশাসন যেন কিছুই জানে না।'
পরিচিত খেলোয়াড় তানজিনুর রহমান ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, যদি স্টেডিয়াম তার উদ্দেশ্য পূরণই না করে, তবে এত বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের মানে কী?
উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. রতনও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। শিয়ালকোল হাটের পাশে স্টেডিয়াম নির্মাণের পর থেকেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। একাধিকবার কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে এই মিনি স্টেডিয়ামকে প্রাণবন্ত ক্রীড়া কেন্দ্রে রূপান্তর করা গেলে তা তরুণদের মোবাইল ফোনের আসক্তি, মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব হাসান জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক অবকাঠামোর গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ দেশজুড়ে নানা ক্রীড়া স্থাপনা নির্মাণ করেছে। কিন্তু যথাযথ ব্যবহার ছাড়া কংক্রিটের এসব কাঠামোর মূল্যই বা কতটুকু?
দেশের অনেক স্টেডিয়াম বছরে কেবল কয়েকটি জাতীয় কর্মসূচির আয়োজনে ব্যবহৃত হয়, বছরের বাকি সময় পড়ে থাকে পরিত্যক্ত, প্রাণহীন দেহের মতো, যেখানে নেই কোনো ক্রীড়ার স্পন্দন।