টাইব্রেকার: বিশ্বকাপে যেখানে আর্জেন্টিনার রাজত্ব
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, লুসাইল স্টেডিয়াম। গ্যালারিতে উপস্থিত ৮৮ হাজারের বেশি দর্শকের তখন হৃদস্পন্দন থমকে যাওয়ার উপক্রম, আরও কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ স্থির টেলিভিশনের পর্দায়। আর মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একদল রণক্লান্ত যোদ্ধা। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় শেষে স্কোরবোর্ডে তখন ৩-৩ সমতা। কাতার বিশ্বকাপের সেই মহাকাব্যিক ফাইনাল যখন টাইব্রেকারে গড়াল, তখন পুরো বিশ্বের নজর ছিল গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের ওপর। তার মনস্তাত্ত্বিক খেলার সামনে খেই হারিয়ে ফেলেন ফ্রান্সের ফুটবলাররা। কিংসলে কোমানের শট তিনি ঝাঁপিয়ে রুখে দেওয়ার পর অহেলিয়া চুয়ামেনি তালগোল পাকিয়ে বল মারেন বাইরে। এরপর গঞ্জালো মন্তিয়েলের শটটি জালে জড়াতেই নিশ্চিত হয়ে যায়— লিওনেল মেসির হাতেই উঠছে ফুটবলের মহাযজ্ঞের পরম আকাঙ্ক্ষিত সোনালি ট্রফি।
৩৬ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার এই তৃতীয় শিরোপা জয় কেবল ফুটবলের সৌন্দর্য নয়, বরং টাইব্রেকারে তাদের ক্ষুরধার মানসিক দৃঢ়তারই প্রমাণ। আর পরিসংখ্যানও বলছে, বিশ্বকাপের লটারি খ্যাত পেনাল্টি শুটআউটে আলবিসেলস্তেদেরই অঘোষিত রাজত্ব।
টাইব্রেকার যেভাবে এলো
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে খেলা অমীমাংসিত থাকলে ফল নির্ধারণের জন্য টাইব্রেকার পদ্ধতি চালু করা হয়। ফিফা ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে প্রথমবার এই নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করলেও প্রথমবার এর প্রয়োগ ঘটে ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে।
ইতিহাসের প্রথম টাইব্রেকার ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যকার সেমিফাইনালে। নির্ধারিত ৯০ ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিট শেষে খেলাটি ৩-৩ গোলে সমতায় ছিল। শেষ পর্যন্ত অনেক নাটকীয়তার পর পেনাল্টি শুটআউটে ৫-৪ ব্যবধানে জয়ী হয় পশ্চিম জার্মানি।
স্নায়ুর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার দাপট
টাইব্রেকার প্রথা চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে ৩৫টি শুটআউটের মধ্যে আর্জেন্টিনা সর্বোচ্চ সাতবার অংশ নিয়ে ছয়বারই জয়ী হয়েছে।
এই যাত্রার সূচনা হয় ১৯৯০ সালে, যখন গোলরক্ষক সার্জিও গয়কোচিয়া কোয়ার্টার ফাইনালে যুগোশ্লাভিয়া ও সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে দুটি করে মোট চারটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে নায়ক বনে যান। ১৯৯৮ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এবং ২০১৪ সালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জয় সেই আধিপত্য ধরে রাখে। তবে মাঝে ২০০৬ সালে জার্মানির সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে পেরে ওঠেনি তারা, যা বিশ্বকাপে টাইব্রেকারের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার একমাত্র হার।
তবে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ছিল আলবিসেলেস্তেদের পেনাল্টি ইতিহাসের চূড়া। 'দিবু' মার্তিনেজের অতিমানবীয় নৈপুণ্যে কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডস ও মহানাটকীয় ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর জয় তুলে নিয়ে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়বারের মতো এক বিশ্বকাপে দুটি শুটআউট জেতার কীর্তি গড়ে।
জার্মানি ও ক্রোয়েশিয়ার শতভাগ জয়ের কীর্তি
টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও বিশ্বকাপে এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশিবার অংশ নিয়ে শতভাগ জয়ের রেকর্ড জার্মানি (পশ্চিম জার্মানিসহ) ও ক্রোয়েশিয়ার দখলে।
জার্মানি এখন পর্যন্ত চারটি শুটআউটের সবকটিতেই জিতেছে। ১৯৮২ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে প্রথম জয়ের পর ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর বিপক্ষে, ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এবং ২০০৬ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তারা এই ধারা বজায় রাখে। মজার ব্যাপার হলো, পেনাল্টি শুটআউটে নেওয়া ১৮টি শটের মধ্যে জার্মানির ব্যর্থতা স্রেফ একটি। ১৯৮২ সালে মিসটি করেন উলি স্টিলিকে।
অন্যদিকে, ক্রোয়েশিয়াও ২০১৮ বিশ্বকাপে দুটি ও ২০২২ বিশ্বকাপে দুটি করে মোট চারটি শুটআউটে অংশ নিয়ে চারটিতেই জয়লাভ করেছে। দানিয়েল সুবাসিচ ও দমিনিক লিভাকোভিচের মতো গোলরক্ষকদের বীরত্বে তারা একে একে ডেনমার্ক, রাশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলকে পরাজিত করে।
কাতার বিশ্বকাপে টাইব্রেকারের মহোৎসব
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৯৯০ সালে ইতালিতে, ২০০৬ সালে জার্মানিতে, ২০১৪ সালে ব্রাজিলে ও ২০১৮ সালে রাশিয়ায়— এই চারটি আসরে চারটি করে পেনাল্টি শুটআউট দেখা গিয়েছিল। তবে ২০২২ সালের সবশেষ কাতার বিশ্বকাপ আগের সব রেকর্ড ওলটপালট করে দেয়, যেখানে ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী হয় রেকর্ডসংখ্যক পাঁচটি টাইব্রেকারের।
যদিও ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ছিল টাইব্রেকার নিয়ম চালু হওয়ার পর প্রথম টুর্নামেন্ট, কিন্তু নিয়মটি অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকে এটিই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র আসর যেখানে একটি ম্যাচও টাইব্রেকারে গড়ায়নি।
পরাজয়ের বৃত্তে স্পেন
বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে সবচেয়ে বেশি হারের বিব্রতকর রেকর্ড স্পেনের দখলে। তারা পাঁচটি শুটআউটে অংশ নিয়ে চারটিতেই হেরেছে। এমনকি ২০২২ সালের শেষ ষোলোতে মরক্কোর বিপক্ষে তারা একটি গোলও করতে পারেনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সুইজারল্যান্ডের (২০০৬ সালে) পর স্পেনই দ্বিতীয় দল যারা টাইব্রেকারে কোনো গোল করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের একমাত্র জয়টি এসেছিল ২০০২ সালে যৌথভাবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় আয়োজিত বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে।
ইতালি একমাত্র দেশ যারা টানা তিনটি বিশ্বকাপে (১৯৯০ সালে, ১৯৯৪ সালে ও ১৯৯৮ সালে) টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছে। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত আসরে ব্রাজিলের কাছে তাদের হারটি ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফাইনাল নির্ধারণী শুটআউট। তবে ২০০৬ সালের ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে তারা সেই অভিশপ্ত বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসে।
ইতালির মতো ইংল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডসও চারটি শুটআউটের তিনটিতেই হারের তিক্ত স্বাদ পেয়েছে। ইংল্যান্ড ১৯৯০ সালে, ১৯৯৮ সালে ও ২০০৬ সালে টানা তিনটি হারের পর ২০১৮ সালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছরের আক্ষেপ ঘোচায়। নেদারল্যান্ডস ১৯৯৮ সালে ব্রাজিল ও ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার কাছে হারে। আর ২০১৪ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে কোস্টারিকার সঙ্গে জিতলেও সেমিফাইনালে তারা পরাস্ত হয় আর্জেন্টিনারই কাছে।
বিশ্বকাপের দীর্ঘতম ও সংক্ষিপ্ততম টাইব্রেকার
বিশ্বকাপের দীর্ঘতম টাইব্রেকারগুলোতে সর্বোচ্চ ১২টি করে শট নেওয়া হয়েছে। ১৯৮২ সালে পশ্চিম জার্মানি বনাম ফ্রান্স এবং ১৯৯৪ সালে রোমানিয়া বনাম সুইডেন ম্যাচে এই ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, সংক্ষিপ্ততম টাইব্রেকারও দেখা গেছে দুবার— ১৯৮৬ সালে (জার্মানি-মেক্সিকো) ও ২০০৬ সালে (ইউক্রেন-সুইজারল্যান্ড), যেখানে মাত্র সাতটি করে শট নেওয়া হয়।
তিন টাইব্রেকারের বিয়োগান্তক সাক্ষী
বিশ্বকাপের ইতিহাসে রবার্তো ব্যাজিও এক অনন্য কিন্তু আক্ষেপের নাম। তিনিই একমাত্র ফুটবলার, যিনি তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (১৯৯০ সালে, ১৯৯৪ সালে ও ১৯৯৮ সালে) টাইব্রেকারের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে কোনোবারই তার দল ইতালি পারেনি সেই চ্যালেঞ্জ টপকে যেতে।
১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এবং ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে শুটআউটে ব্যাজিও গোল করেছিলেন। তবে ১৯৯৪ সালের ফাইনাল ব্যাজিওর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ক্ষত। পুরো টুর্নামেন্টে জাদুকরী ফুটবল খেলে ইতালিকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু ব্রাজিলের বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী সেই টাইব্রেকারে তার নেওয়া শেষ শটটি অবিশ্বাস্যভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। মুহূর্তেই ইতালির বিশ্বজয়ের স্বপ্ন এক বিয়োগান্তক পরিণতির দিকে চলে যায়।
গোলপোস্টের নিচে দুর্ভেদ্য দুর্গ
বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে গোলপোস্টকে রীতিমতো এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছেন চারজন কিংবদন্তি গোলরক্ষক। শুটআউটে সর্বোচ্চ চারটি করে গোল ঠেকানোর রেকর্ড পশ্চিম জার্মানির হারাল্ড শুমাখার, আর্জেন্টিনার সার্জিও গয়কোচিয়া এবং ক্রোয়েশিয়ার দমিনিক লিভাকোভিচ ও দানিয়েল সুবাসিচের দখলে।
কোনো একটি নির্দিষ্ট ম্যাচে তিনটি করে গোল আটকে নিজেদের গোলপোস্টকে অক্ষত রেখেছেন মাত্র তিনজন গোলরক্ষক। পর্তুগালের রিকার্দো ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম এই চমক দেখান। এরপর ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার সুবাসিচ ডেনমার্কের বিপক্ষে এবং ২০২২ সালে দমিনিক লিভাকোভিচ জাপানের বিপক্ষে তিনটি করে শট রুখে দিয়ে প্রতিপক্ষকে স্তম্ভিত করে দেন।