আর্জেন্টিনার অভাবনীয় বিদায় ও বেকহ্যামের শাপমোচন
২০০২ সাল। আর্জেন্টিনার জন্য ১৬ বছরের শিরোপাখরা কাটানোর মোক্ষম সময় হিসেবে ভাবা হচ্ছিল এই বিশ্বকাপটিকে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে খুব কম দলই তাদের মতো এত বিশাল প্রত্যাশার চাপ নিয়ে পা রেখেছিল।
কাগজে-কলমে সেবার আর্জেন্টিনাই ছিল বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে নিখুঁত দল। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে রীতিমতো রাজত্ব করে বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছিল তারা। ১৮ ম্যাচের ১৩টিতেই জয়, ৪২টি গোল ও মাত্র একটি হার নিয়ে বাছাইয়ের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থানটি ছিল তাদেরই দখলে। সেসময় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের সেরা তিনে থাকা দলটি বিশ্বমঞ্চে পা রেখেছিল শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে।
কিংবদন্তি কোচ মার্সেলো বিয়েলসার সুনিপুণ পরিকল্পনায় গড়া স্কোয়াডটি ছিল অভিজ্ঞতা, মান ও আক্রমণভাগের শক্তিতে টইটুম্বুর। দলে ছিলেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, হার্নান ক্রেসপো, অ্যারিয়েল ওর্তেগা, হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন, পাবলো আইমার, ক্লদিও লোপেজ ও দিয়েগো সিমিওনের মতো পরীক্ষিত ও সৃজনশীল তারকারা। অন্যদিকে, রক্ষণ সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন রবার্তো আয়ালা, হুয়ান পাবলো সোরিন, ওয়াল্তার স্যামুয়েল ও হাভিয়ের জানেত্তির মতো তারকারা— যা দলকে এনে দিয়েছিল বাড়তি নির্ভরতা।
নাইজেরিয়া, সুইডেন ও ইংল্যান্ডের সঙ্গে 'গ্রুপ অব ডেথ' খ্যাত 'এফ' গ্রুপে পড়লেও আর্জেন্টিনার পরের রাউন্ডে যাওয়া নিয়ে খুব একটা সংশয় ছিল না। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ১-০ গোলের ঘাম ঝরানো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জয় দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করে তারা। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে জয়সূচক গোলটি আসে বাতিস্তুতার দারুণ হেড থেকে। খুব একটা দাপুটে পারফরম্যান্স না হলেও এই জয় তাদের মসৃণ যাত্রারই ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
তবে টুর্নামেন্টে তাদের সেই যাত্রা খুব দ্রুতই এক নাটকীয় মোড় নেয়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ম্যাচটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল চরম উত্তেজনা। ম্যাচটি ছিল মূলত ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের আগুনে লড়াইয়ের অলিখিত প্রতিশোধের এক মঞ্চ। আগের আসরের সেই ম্যাচে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছিলেন ২৩ বছর বয়সী ডেভিড বেকহ্যাম। আর টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডের বিদায়ের পর নিজ দেশে তাকে সইতে হয়েছিল তীব্র সমালোচনা। চার বছর পর একই মঞ্চে নিজের শাপমোচনের সুযোগ পান বেকহ্যাম— আর দুহাত ভরে তা লুফেও নেন।
স্নায়ুক্ষয়ী ও তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচটির প্রথমার্ধের শেষদিকে ডি-বক্সের ভেতর মরিসিও পচেত্তিনোর ট্যাকলে মাইকেল ওয়েন পড়ে গেলে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। রেফারি পিয়েরলুইজি কোলিনার সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে অনেক জলঘোলা হয়েছে। রিপ্লেতে দেখা যায়, সংযোগ ছিল খুবই সামান্য। ওয়েন নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি মূলত পেনাল্টি আদায়েরই চেষ্টায় ছিলেন। তবে রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। স্পট-কিক থেকে ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়ান ইংলিশ অধিনায়ক বেকহ্যাম। ওই একটি গোলেই জয় নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড এবং ব্যক্তিগত শাপমোচনের মধ্য দিয়ে সমালোচকদের কড়া জবাব দেন বেকহ্যাম।
এই হারে খাদের চরম কিনারায় এসে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনা। দুই ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ড ও সুইডেনের পয়েন্ট দাঁড়ায় চার, আর্জেন্টিনার তিন। অন্যদিকে, টানা দুই হারে নাইজেরিয়ার বিদায় ততক্ষণে নিশ্চিত। সমীকরণটা হয়ে দাঁড়ায় একেবারেই সহজ— নকআউট পর্বের টিকিট পেতে হলে শেষ গ্রুপ ম্যাচে সুইডেনকে হারাতেই হবে আর্জেন্টিনাকে।
মহাগুরুত্বপূর্ণ ওই লড়াইয়ের প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্যভাবে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে অ্যান্ডার্স সভেনসনের দুর্দান্ত ফ্রি-কিকে লিড নেয় সুইডেন। তাতেই পাহাড়সম চাপে পিষ্ট হয় আর্জেন্টিনা।
সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে আলবিসেলেস্তেরা। সুযোগও আসে। আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পেলেও ওর্তেগার শট ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক। তবে ক্ষিপ্রতা দেখিয়ে ফিরতি বল জালে পাঠান ক্রেসপো। স্কোরলাইন ১-১ হলে ক্ষণিকের জন্য আশার আলো দেখতে শুরু করেন আকাশি-সাদা জার্সিধারীদের সমর্থকরা। কিন্তু প্রবল চাপ ধরে রাখলেও কাঙ্ক্ষিত জয়সূচক গোলটি আর পায়নি আর্জেন্টিনা।
রেফারির শেষ বাঁশির সাথে সাথে নিশ্চিত হয় এক অবিশ্বাস্য পরিণতি। গ্রুপে তৃতীয় হয়ে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার। ১৯৬২ সালের পর প্রথমবার এবং সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয়বারের মতো গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে পড়ার তেতো স্বাদ পায় তারা। টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচিত একটি দলের এমন অসহায় বিদায় ছিল চরম হতাশার।
টুর্নামেন্ট শেষে তাদের পরিসংখ্যানে ছিল রূঢ় বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। বিশ্বমানের আক্রমণভাগ থাকার পরও তিন ম্যাচে তাদের গোলসংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। বাছাইপর্বে তাদের যে সাবলীল ও গতিময় ফুটবলের দেখা মিলেছিল, বিশ্বমঞ্চে তা ছিল একেবারেই অনুপস্থিত। দক্ষিণ আমেরিকার ত্রাস বিয়েলসার দল বিশ্বকাপের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ ও চাপ সামলাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
এশিয়া মহাদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের প্রথম আসরে এমন অপ্রত্যাশিত বিদায়ের তালিকায় আর্জেন্টিনা একা ছিল না। তৎকালীন বিশ্ব ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নের তকমা গায়ে মেখে বিশ্বকাপ খেলতে আসা ফ্রান্সের পরিণতি ছিল আরও করুণ। একটি ম্যাচেও জয় তো দূরের কথা, কোনো গোল পর্যন্ত করতে পারেনি তারা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম বড় এই ভরাডুবির সাক্ষী হয়ে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় ফরাসিরাও।
বিপরীতে, ফুটবলের মহাযজ্ঞের চরম অনিশ্চয়তাকে দারুণভাবে কাজে লাগায় ব্রাজিল। রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনিয়োর জাদুকরী পারফরম্যান্সে ভর করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেদের পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে সেলেসাওরা। বিশ্বমঞ্চে নতুন করে তারা জানান দেয় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্যের।
২০০২ সালে আর্জেন্টিনার ব্যর্থতা প্রমাণ করে দেয় যে, ফুটবল শুধু কাগজে-কলমের হিসাব নয়। বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গেলে দলগুলোর অতীত পরিসংখ্যান, র্যাঙ্কিং কিংবা খ্যাতির কোনো কানাকড়ি মূল্য থাকে না। বিশ্বকাপের মঞ্চে সফল হতে হলে শুধু প্রতিভা থাকলেই চলে না; দরকার হয় ধারাবাহিকতা, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং প্রতিটি ম্যাচে প্রচণ্ড চাপের মুখে সেরাটা দেওয়ার মানসিকতা।
আর্জেন্টিনার জন্য আসরটি ছিল এক চরম শিক্ষণীয় অধ্যায়। এটি আন্তর্জাতিক ফুটবলের জয়-পরাজয়ের মাঝের সূক্ষ্ম পার্থক্যটাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল। তবে বেকহ্যামের জন্য, এটি ছিল এমন এক শাপমোচনের গল্প, যা তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আর গোটা ফুটবল বিশ্বের কাছে ২০০২ সালের আসরটি একটি চিরন্তন সত্যকে আবারো প্রতিষ্ঠিত করেছিল— বিশ্বকাপ যতটা অনিশ্চিত, ঠিক ততটাই ক্ষমাহীন।