একটি গোল্ডেন গোল এবং তার করুণ পরিণতি
২০০২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ অঘটন ও চমকের টুর্নামেন্ট হিসেবে স্মরণীয়। ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনার মতো ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তিরা গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেয়। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্কের মতো উদীয়মান দলগুলো সব প্রত্যাশা ছাপিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয়।
নকআউট পর্বেও অঘটনের ধারা অব্যাহত ছিল, যেখানে ইতালি ও স্পেনের মতো প্রতিষ্ঠিত ইউরোপিয়ান জায়ান্টরা বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে যায়। তবে ইতালির বিদায় ঘটেছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ও বিতর্কিত এক ম্যাচের মধ্য দিয়ে।
দেজুন বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৩৯ হাজার দর্শকের বেশিরভাগই দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে গলা ফাটাচ্ছিল। কারণ, তারা কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার ঐতিহাসিক মুহূর্তের সন্ধানে ছিল। স্বাগতিকদের সামনে শুরুতেই একটি সুযোগ আসে, কিন্তু পঞ্চম মিনিটে পাওয়া পেনাল্টিটি আন জং-হুয়ান মিস করেন। এরপর ১৯তম মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরির চমৎকার গোলে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় ইতালি।
দক্ষিণ কোরিয়া মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালাতে থাকে এবং খেলার একদম শেষ সময়ে— ৮৮তম মিনিটে সেওল কি-হিয়নের গোলে সমতায় ফেরে। ফলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
তখন ফিফা বিশ্বকাপে 'গোল্ডেন গোল'-এর নিয়ম চালু ছিল। এটি ছিল এমন এক 'সাডেন-ডেথ' ফরম্যাট, যেখানে অতিরিক্ত সময়ে প্রথম গোল করা দল সাথে সাথেই জয়ী হতো। যখন টাইব্রেকারের সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছিল, তখন ১১৮তম মিনিটে নিজের পেনাল্টি মিসের প্রায়শ্চিত্ত করেন আন। শূন্যে ভেসে আসা ক্রসে দারুণ হেডে জয়সূচক গোলটি করেন তিনি। এর মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত হয় এবং ইতালি টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ে।
গোলটি দেশজুড়ে উৎসবের জন্ম দেয় এবং ফুটবলের লোকগাথায় আনের জায়গা পাকা করে। কিন্তু এরপর যা ঘটেছিল, তা ছিল গোলের মতোই বিস্ময়কর ছিল।
আন তখন ইতালিয়ান ক্লাব এসি পেরুজিয়া ক্যালসিওর হয়ে খেলতেন। নিজ দেশের হারে ক্লাবটির মালিক লুসিয়ানো গাউচ্চি ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং আনের চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেন। গাউচ্চি তখন বলেছিলেন, 'যে ব্যক্তি ইতালিয়ান ফুটবলকে ধ্বংস করেছে, তাকে বেতন দেওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।'
এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় এবং একটি চরম বৈপরীত্য উন্মোচন করে— বিশ্বকাপের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত এক খেলোয়াড় একই অর্জনের জন্য তার নিজের ক্লাবের কাছেই কার্যত শাস্তি পেয়েছিলেন।
পরিস্থিতি দ্রুতই আরও জটিল হয়ে ওঠে। চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও পেরুজিয়া আনের অন্য ক্লাবে যোগ দেওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। তার অসামান্য পারফরম্যান্স ইংলিশ ক্লাব ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সসহ পুরো ইউরোপের নজর কেড়েছিল। এমনকি ব্ল্যাকবার্ন তাকে দলে ভেড়াতে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিজেদের কর্মকর্তাও পাঠিয়েছিল।
আন পরে স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছিলেন, ব্ল্যাকবার্নের প্রতিনিধিদের সাথে তিনি চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ভেস্তে যায়। এর আগে তাকে ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও পেরুজিয়া হঠাৎ ফিফার কাছে 'চুক্তিভিত্তিক স্বত্ব' দাবি করে এবং ট্রান্সফার ফি চেয়ে অভিযোগ দায়ের করে। এই বিরোধ ২৬ বছর বয়সী আনকে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। ফলে ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রায় ছয় মাস তাকে মাঠের বাইরে থাকতে হয়।
'আমি ভীষণ হতাশ ছিলাম। কোথাও খেলতে পারছিলাম না,' আইনি জটিলতা কীভাবে তাকে ব্ল্যাকবার্ন বা অন্য কোনো ক্লাবে যোগ দিতে বাধা দিয়েছিল সেটার বর্ণনা দিয়ে পরে কথাগুলো বলেছিলেন আন।
অবশেষে তিনি এশিয়ায় ফিরে নিজের ক্যারিয়ার পুনরুজ্জীবিত করেন। ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে যোগ দেন জাপানিজ ক্লাব শিমিজু এস-পালসে এবং পরে একই দেশের ইয়োকোহামা এফ মারিনোসে পাড়ি জমান। ইউরোপিয়ান ফুটবলে ফেরার চেষ্টা করলেও বিশ্বকাপের বীরত্বের পর অনেকেই তার যে উচ্চতায় পৌঁছানোর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সেখানে তিনি আর পৌঁছাতে পারেননি।
অবসরের পর টিভি ব্যক্তিত্ব ও ধারাভাষ্যকার হয়ে ওঠা আন বহু বছর পর এই ঘটনার আরও অন্ধকার দিক উন্মোচন করেন। তিনি দাবি করেন, ম্যাচটির পর তিনি ইতালিয়ান মাফিয়াদের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে হারটি ইতালিতে কতটা গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
ঘটনার প্রায় ২৪ বছর পর এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে আন বলেন, 'ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যমে মাফিয়ারা আমাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। আমি এখনও ইতালিতে যেতে পারি না।'
তার গোল্ডেন গোলটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক মুহূর্ত হয়ে আছে এবং এটি ছিল এই নিয়মের শেষ উদাহরণগুলোর একটি। নিয়মটি অতিরিক্ত কঠোর হওয়ার সমালোচনা উঠলে ২০০৪ সালে তা বাতিল করা হয়। উল্লেখযোগ্য গোল্ডেন গোলগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের লঁরা ব্লাঁ, ২০০২ সালে সেনেগালের অঁরি কামারা ও তুরস্কের ইলহান মানসিজের গোল, যা ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বশেষ গোল্ডেন গোল।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়ের আরও একটি বিস্তৃত তাৎপর্য ছিল। কারণ, এর ফলে প্রথমবারের মতো কোনো টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে পাঁচটি মহাদেশের দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
তবে আনের জন্য অবিস্মরণীয় হেডটি তার ক্যারিয়ারের চূড়া ও টার্নিং পয়েন্ট— দুটিই নির্ধারণ করে দেয়। ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাসে, যে মুহূর্তটি তাকে জাতীয় বীরের আসনে বসিয়েছিল, সেটিই তার পেশাদার জীবনে এক অশান্ত ও কণ্টকাকীর্ণ যাত্রার সূচনা করে। এটি ফুটবল জগতের অনিশ্চিত ও এবং অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমাহীন রূপের এক রূঢ় প্রতিফলন।