ক্যাম্পাসের সেই বিশ্বকাপ উন্মাদনা...
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টিএসসি’—এই তিন অক্ষরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে দীর্ঘ একটা সময়। ক্লাস, পরীক্ষা, রাজনীতি—সবকিছুর মাঝখানে টিএসসি ছিল আমাদের বিরতি নেওয়ার জায়গা। আর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল বিশ্বকাপের উন্মাদনা, যা জায়গা দখল করে আছে এখনো।
বিশ্বকাপ এলেই টিএসসি বদলে হয়ে যেত এক জীবন্ত স্টেডিয়াম। ফিফার উত্তেজনা, আড্ডা, তর্ক আর বন্ধুত্ব—সব মিলিয়ে আমাদের ছাত্রজীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
বিশ্বকাপের সময় টিএসসির রাতগুলো ছিল আলাদা। সারাদিনের ক্লাস শেষে সন্ধ্যা থেকেই শুরু হতো আড্ডা। কিন্তু আসল জমজমাট সময়টা শুরু হতো মাঝরাতে। বিশ্ববিদ্যালয় হলে যারা থাকতো কিংবা অনেকেই বাসা থেকেও রাতে টিএসসিতে চলে আসত খেলা দেখার জন্য।
আমরা বন্ধুরা মিলে টিএসসির স্ক্রিনের সামনে বসে পড়তাম। কেউ চা হাতে, কেউ সিগারেট টেনে, কেউ আবার উত্তেজনায় চুপচাপ তাকিয়ে থাকত স্ক্রিনে। আবার সেহরির সময় পর্যন্ত আড্ডা, মাঝরাতে উঠে খেলা দেখা, বন্ধুকে মেসেঞ্জারে অনবরত খেলা নিয়ে খুদেবার্তা পাঠানো—এই রুটিন যেন বিশ্বকাপ চলাকালীন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে যেত।
ক্যাম্পাসে বেশিরভাগই ছিল ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা ভক্ত। তাই এই দুই দলের খেলা যেদিন থাকতো, সেদিন এক ধরনের উচ্ছ্বাস, টান টান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ছিল অনেকের কাছে আবেগের প্রতীক। মেসির আগের সময়েও এই দলের প্রতি এক অদ্ভুত টান ছিল। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে তর্ক মানেই ছিল টিএসসির আড্ডার প্রাণ।
‘কে জিতবে’—এই প্রশ্নে বন্ধুত্বের ভেতরেও ছোটখাট বাকযুদ্ধ চলত। এমনও হয়েছে এই তর্কের জেরে বন্ধুমহলে মনোমালিন্য চলেছে বেশ কিছু দিন।
তবে এই দুই দল বাদে দেখা যেত স্পেন, জার্মানির ভক্তদের। ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল জার্মানির জন্য আলাদা এক যুগ। ঠান্ডা মাথার, নিখুঁত আর ভয়ংকর কার্যকরী এক দম। আড্ডায় কেউ বলত, ‘শেষে তো জার্মানিই যাবে।’ এই কথার সঙ্গে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার আবেগের এক ধরনের টক্কর লেগে যেত। ২০১৪ সালের সেই ব্রাজিল-জার্মানি ম্যাচটা তো আমাদের আড্ডার ইতিহাসে এক অমোচনীয় দাগ কেটে গেছে। সেই ৭-১ এর সেই ধাক্কা কেউ ভুলতে পারিনি।
সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল সেই ম্যাচগুলো, যখন মাঝরাতে আমরা সবাই একসঙ্গে জেগে উঠতাম শুধু খেলা দেখার জন্য। চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু, কিন্তু ম্যাচ শুরু হলেই সব ক্লান্তি উধাও। গোল হলে টিএসসি কেঁপে উঠত, আবার মিস হলে পুরো জায়গাটা নিস্তব্ধ হয়ে যেত।
এরপর আবার আড্ডা, হাসি, তর্ক...অনেকেই বলত, আমরা মেয়েরা নাকি খেলা দেখতাম না! তবে এই ভুল সহজেই ভেঙ্গে যেত, যখন আমরা কয়েকজন খেলার প্রতিটা বিবরণ দিতে পারতাম। আমরা কয়েকজন আসলেই নিয়মিত প্রতিটি ম্যাচ দেখতাম এবং যাবতীয় খবর রাখতাম।
আজ সেই দিনগুলো অনেক দূরে! এই যে আবারও ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হলো, কিন্তু কাজের রুটিনে খেলার সময় মনে রাখার সেই দিন কোথায়? গতবার বিশ্বকাপ দেখেছিলাম যুক্তরাষ্ট্রে। তবে সেখানেও ম্যাচের উন্মাদনা টের পেয়েছি, কেননা ছিলাম ডর্মে।
তবে এও সত্য যে, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মতোন অন্য কোনো দেশের, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই আবেগ কিংবা উদ্বেগটা দেখিনি। এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার ভালো একটি অংশগ্রহণ থাকলেও, খেলা শেষে পরদিন শ্রেণিকক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রফেসরকেও দেখিনি কোনো খবর রাখতে! তাই ভালো করেই বুঝতে পারলাম, বিশ্বকাপের উন্মাদনা আমরা যেভাবে অনুভব করি, এটা আসলে আমাদের বৈশিষ্ট্যে গেঁথে গেছে...
