শতাব্দীর প্রবীণতম বিশ্বকাপ দল পেতে যাচ্ছে ব্রাজিল!
নতুন মুখের ঝলক নয়, বরং অভিজ্ঞতার কাঁধে ভর করেই ২০২৬ বিশ্বকাপের পথে হাঁটতে যাচ্ছে ব্রাজিল। কোচ কার্লো আনচেলত্তির ঘোষিত সম্ভাব্য দল নিয়ে যখন ভক্তদের আগ্রহ ঘুরপাক খাচ্ছে; কে থাকবেন, কে বাদ পড়বেন, নেইমার ফিরবেন কি না, তখন একটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠেছে: এ শতাব্দীতে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ-অভিজ্ঞ খেলোয়াড় নিয়ে উত্তর আমেরিকায় নামতে যাচ্ছে সেলেসাওরা।
আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় রিও ডি জেনেইরোর ‘মিউজিয়াম অব টুমরো’তে ২০২৬ বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৬ সদস্যের তালিকা ঘোষণা করার কথা। কিন্তু তার আগেই প্রশ্নের পাহাড় জমেছে সমর্থকদের মনে। তরুণ ফরোয়ার্ড এন্দ্রিক কি সুযোগ পাবেন? দলে থাকবেন কি লুকাস পাকেতা কিংবা পেদ্রো? আর সব প্রশ্ন ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় কৌতূহল, ফিরবেন কি নেইমার?
তবে এসব জিজ্ঞাসার উত্তর মেলার আগেই একটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত। আনচেলত্তির দল হবে এই শতাব্দীতে ব্রাজিলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ বিশ্বকাপ স্কোয়াড।
বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর ব্রাজিলে প্রায়শই ‘পুনর্গঠন’ শব্দটি জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়। ২০২২ সালের হতাশার পরও অনেকে নতুন দল গঠনের প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গত সোমবার ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) যে ৫৫ সদস্যের প্রাথমিক তালিকা ফিফার কাছে পাঠিয়েছে, সেখানে ২০ জন খেলোয়াড় আছেন যারা অন্তত একটি বিশ্বকাপ খেলেছেন, আর তারা সবাই ছিলেন কাতার বিশ্বকাপে।
অর্থাৎ, আনচেলত্তির ঘোষিত দলে মাত্র ছয়জন খেলোয়াড়ই নতুন সংযোজন হতে পারেন, যারা ২০২২ সালে জাতীয় দলের ভাবনায় ছিলেন না।
এই ছয়জনের মধ্যে কেবল একজন, দানি আলভেস, ইতোমধ্যে অবসর নিয়েছেন। ইনজুরির কারণে ছিটকে যাওয়া রদ্রিগো ও এদের মিলিতাওকে নিশ্চিতভাবেই দলে থাকার মতো খেলোয়াড় হিসেবে ধরা হচ্ছিল। হাতে গোনা তিনজন -আলেক্স তেলেস, ফ্রেদ ও এভেরতন রিবেইরো এখনো খেলছেন, কিন্তু কোচিং স্টাফের পরিকল্পনায় নেই।
এতে স্পষ্ট হয়, কাতার বিশ্বকাপে বিদায়ের পরও সেই দলের বড় অংশ এখনো শীর্ষ পর্যায়ে নিজেদের ধরে রেখেছেন। বিশ্বকাপ-অভিজ্ঞ ২০ খেলোয়াড়ের মধ্যে অন্তত ১৫ জনকে এবার প্রায় নিশ্চিত ধরা হচ্ছে। যেমন, ভিনিসিউস জুনিয়র, রাফিনিয়া, কাসেমিরো ও মার্কিনিওস। এছাড়া ভালো সম্ভাবনায় আছেন আলেক্স সান্দ্রো, ব্রেমের, ফাবিনিয়ো ও গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি।
অন্যদিকে, এখনো আশা বাঁচিয়ে রেখেছেন নেইমার ও পেদ্রো। যদিও আনচেলত্তি এখন পর্যন্ত কাউকেই ডাকেননি, তবু সপ্তাহান্তের ম্যাচগুলোকে ধরা হচ্ছে ইতালিয়ান কোচকে প্রভাবিত করার শেষ সুযোগ হিসেবে।
সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ-অভিজ্ঞ খেলোয়াড় দেখা যেতে পারে আক্রমণভাগে, সংখ্যাটা পাঁচ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে অনুপাতে সবচেয়ে অভিজ্ঞ হতে পারে মিডফিল্ড, যেখানে পাঁচ বা ছয়জনের মধ্যে চারজনই হতে পারেন বিশ্বকাপ-ফেরত।
মজার বিষয়, ইতিহাস গড়তে আনচেলত্তিকে ১৫ জন ‘প্রবীণ’ খেলোয়াড়ও নিতে হবে না। এ শতাব্দীতে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ-অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ছিল ১০ জন, ২০০৬ ও ২০২২ বিশ্বকাপে। ২০০৬ সালে ২৩ সদস্যের দলে এবং ২০২২ সালে ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে ছিল সেই সংখ্যা।
এই দুই আসরের প্রেক্ষাপটও আলাদা। ২০০৬ সালে ব্রাজিল ভরসা রেখেছিল ২০০২ সালের বিশ্বজয়ী দলের ধারাবাহিকতার ওপর। অন্যদিকে ২০২২ ছিল মূলত কোচ তিতের দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনারই সম্প্রসারণ।
উল্টো দিকে, এবার বিশ্বকাপ-অভিষিক্ত খেলোয়াড়ের সংখ্যাও হতে পারে এ শতাব্দীর সর্বনিম্ন। বর্তমানে সেই রেকর্ড ২০০৬ সালের, যখন ‘রুকি’ ছিল মাত্র ১৩ জন।
এ শতাব্দীতে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নতুন ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের অনুপাত:
• ২০২২: ১৬ নতুন, ১০ অভিজ্ঞ
• ২০১৮: ১৭ নতুন, ৬ অভিজ্ঞ
• ২০১৪: ১৭ নতুন, ৬ অভিজ্ঞ
• ২০১০: ১৪ নতুন, ৯ অভিজ্ঞ
• ২০০৬: ১৩ নতুন, ১০ অভিজ্ঞ
• ২০০২: ১৮ নতুন, ৫ অভিজ্ঞ
কৌতূহলের বিষয়, শেষ বিশ্বকাপেও ব্রাজিল ছিল বয়সে তুলনামূলক বেশি পরিণত দলগুলোর একটি। কাতারে তাদের গড় বয়স ছিল ২৭.৮৮ বছর, ৩২ দলের মধ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ। কেবল ইরান, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়া ছিল তাদের ওপরে।
তবে বয়স বা অভিজ্ঞতা সবসময় নেতিবাচক কিছু নয়। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ ইতিহাসই তা বলে। আর্জেন্টিনা ২০২২ সালে মাত্র সাতজন অভিষিক্ত খেলোয়াড় নিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল। আবার ফ্রান্স ২০১৮ সালে শিরোপা জেতে মাত্র ছয়জন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় নিয়ে। আর ২০১৪ সালে ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করে শিরোপা জেতা জার্মানির স্কোয়াডে ছিল ১১ জন বিশ্বকাপ-অভিজ্ঞ ফুটবলার।
যদি নেইমারের ডাক নিশ্চিত হয়, সেটি হবে এই ধারাবাহিকতা-নির্ভর স্কোয়াডের সবচেয়ে প্রতীকী ছবি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২-এর পর নিজের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে পারেন ব্রাজিলের এই তারকা। তাতে তিনি যোগ দেবেন চারটি বিশ্বকাপ খেলা ব্রাজিলিয়ানদের এক বিশেষ তালিকায়।
আরও প্রতীকী নাম হতে পারেন ৪১ বছর বয়সী থিয়াগো সিলভা। প্রাথমিক তালিকায় থাকা এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ইতোমধ্যে চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। তার সঙ্গে এই কীর্তিতে আছেন কাস্তিলহো, নিলতন সান্তোস, জালমা সান্তোস, পেলে, লেয়াও, কাফু ও রোনালদো নাজারিও। যদিও তার দলে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়, তবু সুযোগ পেলে তিনি হয়ে যেতে পারেন পাঁচটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রথম ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার।