মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে বিশ্বকাপে হিমেনেজের গোল

স্পোর্টস ডেস্ক

রাউল হিমেনেজ যখন অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামের আকাশ ছুঁয়ে ওঠা হেডে বল জালে জড়ালেন, তখন সেটি ছিল শুধু একটি গোল নয়। সেটি ছিল মৃত্যুকে হারিয়ে ফিরে আসা এক ফুটবলারের বিজয়ের গল্প, দীর্ঘ সংগ্রামের পর পূরণ হওয়া এক স্বপ্নের মুহূর্ত।

বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়েছে স্বাগতিক মেক্সিকো। ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি করেন হিমেনেজ। কিন্তু গোলের পর যা ঘটল, সেটিই হয়ে উঠল রাতের সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য।

গোল করার পর উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে ওঠেন ৩৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার। এরপর আকাশের দিকে আঙুল তুলে তাকান। অনেকের ধারণা, চলতি বছরের মার্চে মারা যাওয়া তার বাবা রাউল হিমেনেজ ভেগার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এমন উদযাপন করেছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পরই সতীর্থদের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মেক্সিকান তারকা।

অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের গর্জনের মাঝেও সেই আবেগ স্পষ্ট ছিল। কারণ সবাই জানত, কয়েক বছর আগেও এই মুহূর্তটা প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছিল।

২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার শিকার হন হিমেনেজ। আর্সেনাল ডিফেন্ডার ডেভিড লুইজের সঙ্গে মাথায় মাথায় সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে মাঠেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। খুলিতে মারাত্মক ফাটল ধরা পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে, তার সতীর্থ, কোচ এবং পরিবারের সদস্যরা শঙ্কায় ছিলেন, তিনি আদৌ বেঁচে থাকবেন কি না।

মাঠেই তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ পুনর্বাসনের পথচলা। ছয় মাস পর্যন্ত অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনুশীলন করতে পারেননি। প্রায় আট মাস পর আবারও মাঠে ফেরেন। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে সাউদাম্পটনের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে চোটের পর প্রথমবারের মতো গোলের দেখা পান।

কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের পরও প্রশ্ন ছিল। তিনি কি আগের মতো গোল করতে পারবেন? আগের মতো ভয়হীন ফুটবল খেলতে পারবেন? সন্দেহ ছিল অনেকের। এমনকি নিজের মধ্যেও ছিল সংশয়।

তবে হিমেনেজ হার মানেননি। প্রিমিয়ার লিগে এখন পর্যন্ত ২৩৩ ম্যাচে ৬৮ গোল করেছেন তিনি। এখনও মাথা রক্ষার জন্য বিশেষ সুরক্ষিত হেডব্যান্ড পরে খেলতে হয় তাকে। তবুও লড়াই থামাননি।

বিশ্বকাপের আগে ফুলহাম ছেড়ে আবারও নিজের পুরোনো ক্লাব উলভারহ্যাম্পটনে ফিরে গেছেন তিনি। আর বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই লিখেছেন নতুন ইতিহাস।

এটি ছিল বিশ্বকাপের মূল পর্বে তার প্রথম একাদশে সুযোগ পাওয়া ম্যাচ। এর আগে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে মোট ছয়বার বদলি হিসেবে মাঠে নামলেও কখনও শুরু থেকে খেলার সুযোগ পাননি। প্রথম শুরুর ম্যাচেই গোল করে নিজের ছাপ রেখে দিলেন তিনি।

মেক্সিকোর হয়ে এটি ছিল তার ১২৫তম ম্যাচ এবং ৪৬তম গোল। এর ফলে দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় তিনি যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন। তার সামনে এখন শুধু রয়েছেন হাভিয়ের হার্নান্দেজ, যার গোলসংখ্যা ৫২।

মেক্সিকোর প্রথম গোলদাতা হুলিয়ান কিনোনেস ম্যাচ শেষে বলেন, 'আমরা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি। সে দলকে অনেক কিছু দেয়। জাতীয় দলের হয়ে তার গোলসংখ্যা বাড়তে থাকাটা আমাদের জন্য দারুণ গর্বের।'