ঢাকা-৪: প্রার্থীই যখন ভুক্তভোগী

শরীফ এম শফিক
শরীফ এম শফিক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক

ঘড়ির কাটায় তখন দুপুর ১টা। ঢাকা-৪ আসনের আওতাধীন মুরাদপুরের জালালাবাদ এলাকার লোহার কারখানার সামনে একটি টঙয়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন সেখানকার ক্লান্ত শ্রমিকসহ বেশ কয়েকজন। জুরাইনে যেখান থেকে মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে শুরু সেখানে তখন নির্বাচনী প্রচারণা করছিলেন ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান।

চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে পরিচয় দেওয়ার আগেই তাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে সবাই বলে উঠলেন, 'মিজান ভাই আপনাকে আমরা চিনি। নতুন বাংলাদেশ গঠনে আপনার মতো সৎ লোককেই আমরা চাই।'

মিজানুর জানতে চাইলেন, কীভাবে তাকে চেনেন। সবাই তখন ওয়াসার তৎকালীন এমডি তাসকিম এ খানকে 'ওয়াসার পানি খাওয়াতে চাওয়া'সহ বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয়ে তার দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের কথা বললেন। তখন তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, 'ধরুন, আমাকে ভোট দিলেন সৎ হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু নির্বাচিত হলে তো আমি পাঁচ বছর দায়িত্বে থাকব। দায়িত্বে গিয়ে যদি অসৎ হয়ে যাই? যেসব কথা এখন বলছি, যদি সেগুলো না করি? তখন আপনারা কী করবেন?'

সেখানে থাকা লোকেরা তখন এই বিষয়ে নানা কিছু বললেও মনমতো উত্তর পাননি মিজানুর। তখন নিজেই বললেন, 'তখন আপনারা অবশ্যই আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন। এটা আপনাদের দায়িত্ব। আপনাদের অধিকার আদায়ে এটা করতে হবে।'

উপস্থিত সকলে তার সঙ্গে একমত পোষণ করলেন। বিদায় নেওয়ার আগে তিনি বললেন, 'যাকে আপনাদের সৎ-যোগ্য মনে হবে, তাকেই ভোট দেবেন। তবে ভোট অবশ্যই দেবেন। কারণ এটা আপনার ক্ষমতা, অধিকার।'

শ্যামপুর ও কদমতলী থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৪ আসনে সমস্যার শেষ নেই। স্থানীয়রা বলেন, সারাদেশে বিভিন্ন এলাকায় যত সমস্যা আছে, তার সবগুলো আছে এই এলাকায়।

তারপরও এলাকার বাসিন্দারা আশায় বুক বেঁধে আছেন আসন্ন নির্বাচনের দিকে। মিজানুর যখন প্রধান সড়ক ছেড়ে গলির ভেতরে যাচ্ছিলেন, পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী তার পথ আটকালেন। তার অভিযোগ, তার বাড়িতে ৭ জন ভোটার। কিন্তু দরিদ্র এই পরিবারের পক্ষ থেকে একাধিকবার আবেদন করা হলেও সরকারের টিসিবি বা ওএমএসের কোনো সুবিধা পাননি। মিজানুর তার নাম-ঠিকানা লিখে নিয়ে এলাকার ভেতরে প্রচারণায় যান।

ওয়াসার দূষিত পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির এমডিকে খাওয়াতে এসে তিনি এতটাই আলোচিত হন যে, তাকে অনেকে 'ওয়াসা মিজান' নামে ডাকা শুরু করেন। ২০১৭ সালের ২৬ জানুয়ারি সুন্দরবন রক্ষায় রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে ডাকা জাতীয় কমিটির হরতালের সময় পুলিশ তাকে পিটিয়ে আহত করে।

এ ছাড়া, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটিতে যোগ দিয়ে লংমার্চে অংশ নেওয়া, ডেঙ্গুবিষয়ক সচেতনতার স্লোগান নিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বাইসাইকেলে যাওয়া, পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী চা শ্রমিকদের পাশে থাকতে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে তার প্রতিবাদী অবস্থান জানান দিয়েছেন। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৭, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৮, ৫৯, ৬০ ও ৬১—এই ৯ ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো হলো মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, বুড়িগঙ্গা সেতু, পোস্তগোলা সেনানিবাস, পোস্তগোলা শ্মশান ঘাট, জুরাইন কবরস্থান, ধোলাইরপাড় ও শ্যামপুর শিল্প এলাকা।

এলাকার মোট ভোটার ৩ লাখ ৬২ হাজার ৫০৬, যা গত নির্বাচনের চেয়ে ১ লাখ ৭ হাজার ৯২৯ বেশি। এবারের ভোটারদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬৭, নারী ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৪ ও ৫ জন হিজড়া।

খুবই ঘনবসতিপূর্ণ এবং শ্রমজীবী-মধ্যবিত্ত মানুষের সংমিশ্রণে গঠিত এ এলাকায় হাজার হাজার শ্রমিকের বাস। এলাকার প্রধান সমস্যা দারিদ্র্য, পরিবেশ দূষণ, জলাবদ্ধতা, সংকীর্ণ রাস্তা, মাদক, চাঁদাবাজি, গ্যাস ও পানি সংকট।

নামা শ্যামপুরের মোক্তার হোসেন রোডের বাসিন্দা জহির আহমেদ (৩২) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমাদের এখানে একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি উঠে যায়। ব্যবস্থা নেওয়ার কেউ নেই। মাদক বাড়ছে। চাঁদাবাজিও আছে।'

'যে প্রার্থী এলাকার সমস্যা নিয়ে কাজ করবে, সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেবেন, তাকেই জনগণ ভোট দেবে বলে আমার ধারণা,' বলেন তিনি।

স্থানীয় ৫৮ বছর বয়সী এক ব্যবসায়ী জানান, এই এলাকায় অনেক ভোটার নতুন। দীর্ঘ দিন ধরে এলাকায় থাকার সুবাদে এখন ভোটার হয়েছেন। তিনি বলেন, 'আমাদের এখানে ভাড়াটিয়া-বাড়িওয়ালা সম্পর্ক খুব ভালো। আমরা চাই নিরাপত্তা, এলাকার সমস্যা সমাধান।'

এ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দনিয়া কলেজ। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা চলছে। প্রথমবারের মতো ভোটার হওয়ায় নির্বাচন ঘিরে তাদের বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কলেজের এক শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'নিরাপত্তাসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি খুবই ভঙ্গুর বলে মনে হয়। আমি চাই, যারা পুরো দেশকে সামলাতে পারবে তারাই ক্ষমতায় আসুক।'

জুরাইনের বাসিন্দা এই শিক্ষার্থী বলেন, 'এলাকায় অপরাধ বাড়ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।'

এ আসনের আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে আছেন বিএনপির তানভীর আহমেদ রবিন ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সৈয়দ জয়নুল আবেদীন।

জয়নুল আবেদীন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'প্রচারণা শুরুর পর দেখলাম নারী ভোটার, যুবক ও শ্রমিকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। গত ৫৪ বছরে মানুষ দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দেখে ক্লান্ত, তাই তারা এবার পরিবর্তনের আশায় জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে চায়।'

নির্বাচনে অংশ নিতে সম্প্রতি একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে চাকরি ছেড়েছেন এই জামায়াত নেতা। দীর্ঘদিন এই এলাকায় বসবাসের সুবাদে তিনি এখানকার নাগরিক দুর্ভোগগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন।

শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তবসম্মতভাবে সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা করছেন তিনি। জয়নুল আবেদীন বলেন, 'ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করছি, তারা কী কী ধরনের নাগরিক সুবিধা পাচ্ছেন না সেগুলো তালিকাভুক্ত করেছি। সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করছি। আমরা শুধু কথার ফুলঝুরি ছড়াচ্ছি না। আমরা জনগণের সেবক হতে চাই।'

অপরদিকে, এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদের ছেলে বিএনপি নেতা তানভীর আহমেদ রবিন ডেইলি স্টারকে জানান, এলাকায় তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়।

তিনি বলেন, 'গত ১৮ বছর জনগণের কাছে যেতে পারিনি। তবে দলের নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম। নির্বাচনকে সামনে রেখে উঠান বৈঠক ও মতবিনিময়সভা করে জনসম্পৃক্ততা তৈরি করছি।'

'এ আসনকে ঢাকার আসনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত' উল্লেখ করে রবিন বলেন, 'এখানে কোনো খেলার মাঠ, পার্ক, কমিউনিটি সেন্টার বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই। আওয়ামী লীগ আমলে এলাকায় উন্নয়নের চেয়ে লুটপাট বেশি হয়েছে,' বলেন তিনি।

নির্বাচিত হলে তিনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে কাজ করতে চান বলে জানান। সেগুলো হলো—তরুণ ও নারীদের স্বনির্ভর করতে প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কল-কারখানাগুলো পুনরায় চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রতিটি ওয়ার্ডে পাঠাগার স্থাপন ও মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা।

তার মতে, তার বাবা সালাউদ্দিন আহমেদ এলাকার রাস্তাঘাট ও শিক্ষা বিস্তারে 'বিপ্লব' ঘটিয়েছেন। 'আমি এলাকার ছেলে। নির্বাচিত হলে এলাকাতেই থাকব এবং জনগণের আমানতের খেয়ানত করব না।'

তানভীর, জয়নুল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজান তিনজনই পরস্পরকে চেনেন। তারা তিনজনই জানান, এলাকার সমস্যাগুলো সমাধান করতে সবাই একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।

এ আসনের অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সৈয়দ মো. মোসাদ্দেক বিল্লাহ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ ফিরোজ আলম, বাসদের মো. জাকির হোসেন, মুক্তিজোটের সাহেল আহম্মেদ সোহেল, জনতার দলের মো. আবুল কালাম আজাদ।