শ্রমিকদের দাবি আর জোটের সমীকরণে সাভার-আশুলিয়ার ভোটযুদ্ধ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের আলোচনার মূল বিষয় আসন্ন সংসদ নির্বাচন। এলাকার নির্বাচনী আমেজ, প্রার্থী, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কা, নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে একেক ধরনের মতামত দিচ্ছেন তারা।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই সাভার-আশুলিয়া নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৯ আসনের ভোটার। ঘনবসতিপূর্ণ এ আসনের ভোটার সাত লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন, যাদের মধ্যে তিন লাখ ৭৯ হাজার ৯০৬ পুরুষ, তিন লাখ ৬৭ হাজার ১৫১ নারী ও ১৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের।
ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার শিমুলিয়া, ধামসোনা, ইয়ারপুর, আশুলিয়া, বিরুলিয়া, পাথালিয়া, সাভার ইউনিয়ন, সাভার পৌরসভা ও সাভার সেনানিবাস নিয়ে গঠিত এ আসন মূলত পোশাকশিল্প কারখানা ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জন্য পরিচিত।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব থাকার পরও এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যায় জর্জরিত। নবীনগর, বাইপাইল, সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সবসময়ই তীব্র যানজট লেগে থাকে। শিল্পকারখানার বর্জ্যে বংশী নদী ও আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত। ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া, শিল্প ও আবাসিক উভয় ক্ষেত্রে গ্যাসের সংকট এখানে নিত্যদিনের সমস্যা। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় পরিবহন, ঝুট ব্যবসা ও জমি দখল নিয়ে এখানে সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়মিত ঘটনা।
পোশাক খাতে এ এলাকায় অস্থিরতা তৈরি হলে তা পুরো দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। এখানে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো বেশ শক্তিশালী।
স্থানীয় গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা খায়রুল মামুন মিন্টু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঢাকা-১৯ আসনের ভোটারদের বড় অংশ শ্রমিক। আমরা শ্রমিকদের জীবনমান ও পেশার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। কারা আমাদের দাবিগুলো নিয়ে কী বলেছেন, সেগুলো আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছি।'
'প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মসূচি দেখিনি। অনেক প্রার্থী আমাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনলেও কোনো হেভিওয়েট প্রার্থী দাবিগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেননি বলে মনে হয়েছে,' বলেন তিনি।
স্থানীয়দের মতে, এ আসনের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে আছেন—বিএনপির দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দিলশানা পারুল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ ফারুক খান।
আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন— লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) মো. ইসরাফিল হোসেন সাভারী, জাতীয় পার্টির মো. বাহাদুর ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের শেখ শওকত হোসেন ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. কামরুল।
ঢাকা-১৯ আসনের ভোটার জাবি শিক্ষার্থী জেরিন তাসনিম বৈশাখী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমাদের আড্ডায় নির্বাচনের কথা উঠলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা বিভিন্ন ট্রলগুলো সামনে আসে। একটি বড় দলের ওপর মানুষ ভরসা করলেও তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে সমালোচনা হয়। আরেকটি দলকে নিয়ে নারী স্বাধীনতা ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের নেতাদের নিয়ে গঠিত এনসিপির প্রতি অনেকে আগ্রহী হলেও হঠাৎ করে তারা জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।'
এ বিষয়ে এনসিপি প্রার্থী দিলশানা পারুল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এটা নির্বাচনকে সামনে রেখে একটা সাময়িক জোট, কোনো আদর্শিক জোট নয়। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির মতপার্থক্য আছে, তেমনি জুলাইকে কেন্দ্র করে ঐক্যও আছে। জুলাই প্রশ্নে, সংস্কার প্রশ্নে, নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রশ্নে, ইনসাফের রাজনীতি করার প্রশ্নে আমরা এক। মতাদর্শগত জোটের প্রশ্ন এলে তখন নারী প্রশ্নটাও সামনে আসত।'
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের কাছ থেকে তিনি ব্যাপক সমর্থন ও সহযোগিতা পাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন। 'আমি নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে অনেক সাড়া পাচ্ছি ভোটারদের কাছ থেকে, যার কারণে আমি অনেক আশাবাদী। এখানকার শ্রমিকরা বিশেষ করে নারী ভোটাররা আমাকে আশাবাদী করে তুলেছেন। সিনিয়র সিটিজেনদের কাছ থেকেও ভালো সাড়া পাচ্ছি,' বলেন তিনি।
জয়ী হলে এলাকার মানুষের উন্নয়নে কী করবেন জানতে চাইলে দিলশানা পারুল বলেন, 'তরুণ শ্রমিকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিং সেন্টার, শ্রমিকদের জন্য বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল, কর্মজীবী নারীদের সন্তানদের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি আমার।'
'নির্বাচিত হওয়ার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা নিরসন নিয়ে কাজ শুরু করব। সাভার-আশুলিয়াকে সব ধরনের চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসবাদ থেকে মুক্ত করব। তুরাগ ও বংশী নদীকে দূষণমুক্ত করে নদীর দুই পাশে প্রাকৃতিক পার্ক নির্মাণ করে স্থানীয়দের জন্য বিনোদনের জায়গা তৈরি করার পরিকল্পনা আছে,' বলেন তিনি।
অন্যদিকে জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, 'এবারের নির্বাচনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গত ১৭ বছরের আন্দোলনের লক্ষ্যই ছিল জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার। আমার আসনের ভোটারদের আমার প্রতি আস্থা আছে, যেহেতু গত আমলে জেল খেটেছি, আমার নামে অনেকগুলো মামলা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি মনে করছি ভোটাররা আমাকে নির্বাচিত করবেন।'
জয়ী হলে কী করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এলাকার নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব দেব। সাভারের দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে আমার। পরিবেশ আইনের কঠোর প্রয়োগ করে নদী দূষণ বন্ধের উদ্যোগ নেব।'
তবে, নির্বাচনের সময় টানা ৩-৪ দিনের ছুটি থাকায় গার্মেন্টস শ্রমিকরা বাড়ি চলে যেতে পারেন বলে মনে করেন সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, 'এটা ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে এবং ভোটের গুরুত্ব বোঝাতে আমি চেষ্টা চালাচ্ছি।'
গাজীরচট এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব সাফর আলী মাতবর বলেন, 'আমাদের এলাকায় আগের এমপিরা কেউ কাজ করে নাই। আগামী দিনে চাই তারা সংসদে গিয়ে আমাদের জীবনমানের উন্নয়নে কাজ করুক। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, গ্যাস-পানি সমস্যার সমাধান করুক।'
নবীনগর, বাইপাইল, আশুলিয়া ও সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকা এখন ব্যানার-বিলবোর্ড, মাইকিংয়ে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় মুখরিত। কোথাও কোনো বড় ধরনের সংঘাতের খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।