বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ভিসা আরও কঠোর হচ্ছে
'অসততা সংক্রান্ত সমস্যা' ও জালিয়াতি নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাটাগরিতে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়া।
নিউজ ডটকম ডট এইউ–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশকেও এভিডেন্স লেভেল-২ থেকে লেভেল-৩ এ নেওয়া হয়েছে।
গত বছর অস্ট্রেলিয়ায় ভর্তি হওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই গিয়েছে এই চারটি দক্ষিণ এশীয় দেশ থেকে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন, '২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের এভিডেন্স লেভেল (ইএল) পরিবর্তন করা হয়েছে।'
তিনি বলেছেন, 'এই পরিবর্তনের মাধ্যমে উদীয়মান অসততা সংক্রান্ত সমস্যার কার্যকর ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। একইসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় মানসম্মত শিক্ষা নিতে ইচ্ছুক প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ অব্যাহত থাকবে।'
অস্ট্রেলিয়ার সিমপ্লিফায়েড স্টুডেন্ট ভিসা ফ্রেমওয়ার্ক (এসএসভিএফ) অনুযায়ী, জালিয়াতির কারণে আবেদন বাতিলের হার, ভিসা বাতিলের হার, শিক্ষার্থী ভিসাধারীদের অবৈধ বসবাসকারী হয়ে পড়ার হার এবং পরবর্তী সময়ে শরণার্থী হওয়ার আবেদন করার হারসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে দেশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এভিডেন্স লেভেল নির্ধারণ করা হয়।
এভিডেন্স লেভেল–৩ রেটিংয়ের অর্থ হলো, ভিসা আবেদনকারী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সক্ষমতা ও একাডেমিক ইতিহাসের আরও বিস্তৃত নথি জমা দিতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন দপ্তরের সাবেক উপসচিব ড. আবুল রিজভি এটাকে অত্যন্ত 'অস্বাভাবিক' পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
ড. রিজভি বলেন, 'মূলত এভিডেন্স লেভেল যত বেশি হয়, ভিসা প্রক্রিয়াকরণ কর্মকর্তা (আবেদনকারীর পক্ষে নিশ্চয়তা হিসেবে) তত বেশি নির্ভর করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের ওপর।'
তিনি বলেন, 'ঝুঁকি বেশি হলে নথিপত্রও বেশি প্রয়োজন হয়; নথি ও নথির পেছনের তথ্য যাচাইয়ে হাতে–কলমে কাজ বাড়ে। তারা ট্রান্সক্রিপ্ট যাচাই করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফোন করা হতে পারে, আর্থিক বিবরণী যাচাই করতে ব্যাংকের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হতে পারে।'
সাধারণত আগের বছরের তথ্যের ভিত্তিতে বছরের মাঝামাঝি সময়ে রেটিং হালনাগাদ করা হয়।
ড. রিজভি জানান, ২০২৫ সালের জুলাই–আগস্টের দিকে চীনকে লেভেল–১ থেকে ২–এ নেওয়া হয়েছিল। ফলে চীন, ভারত ও নেপাল একই এভিডেন্স লেভেলে আসে।
তিনি বলেন, 'কিন্তু, পরবর্তীতে তারা বিশেষ ডেটা বিশ্লেষণ করেছে বলে মনে হয়। আমার ধারণা, যেসব মামলা সহজ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়েছিল, সেখান থেকে কিছু নমুনা তারা পরীক্ষা করেছে—যেগুলো নিয়ে তাদের উদ্বেগ ছিল। আমার মনে হয়, তারা জালিয়াতির মাত্রা বেড়েছে বলে কোনো তথ্য পেয়েছে।'
তার ধারণা, গত ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতে বড় ধরনের ভুয়া ডিগ্রি চক্রের সন্ধান পাওয়ার খবর অস্ট্রেলিয়া কর্তৃপক্ষের এই অতিরিক্ত নজরদারির কারণ হতে পারে—যেখানে ভারত এক লাখেরও বেশি জাল সনদ জব্দ করেছে।
ড. রিজভি বলেন, অস্ট্রেলিয়া 'এই বাড়তি যাচাই-বাছাই করবে মূলত আর্থিক সক্ষমতা ও একাডেমিক তথ্য নিয়েই। ইংরেজি ভাষা পরীক্ষার ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হবে।'
তিনি জানান, এর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ 'খুবই ধীরগতি'তে হবে। তবে সরকার ২০২৬ সালের জন্য জাতীয় পরিকল্পনার ২ লাখ ৯৫ হাজার আসনের লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত রেখেছে।
ড. রিজভি মনে করেন, এই ৪ দেশ থেকে 'ভিসা আবেদন বাতিলের হার বাড়বে এবং সেই ঘাটতি অন্য জায়গা থেকে পুষিয়ে নিতে হবে।'
তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে কড়াকড়ির কারণে চীন থেকে আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়তেও পারে। তবে আমি মনে করি ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও বেশি শিক্ষার্থী আসবে। কারণ, এই দুটি দেশ লেভেল–১-এ আছে।'
ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার (আইইএএ)– প্রধান নির্বাহী ফিল হানিউড বলেন, 'দুঃখজনকভাবে, এখন অস্ট্রেলিয়া এমন অবস্থায় রয়েছে, অথচ অনেক তরুণ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় পড়াশোনা করতে পারছে না।'
তিনি বলেন, 'সম্প্রতি স্পষ্ট হয়েছে যে, যারা ওই তিন দেশে ঢুকতে পারছে না, তারা অস্ট্রেলিয়ায় আবেদন করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আমরা আর্থিক ও একাডেমিক নথিতে জালিয়াতি বাড়ছে বলেও দেখতে পেয়েছি।'
তিনি আরও বলেন, 'এই দেশগুলোর কয়েকটিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির রেটিংয়ে রাখলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই আরও কঠোর হয়।'
হানিউড বলেন, 'প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি সীমা থাকায় এই নতুন ব্যবস্থার ফলে শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে মানসম্মত শিক্ষার্থীদেরই আসার সম্ভাবনা বেশি।'