বেনজেমার হ্যাটট্রিকে পিএসজিকে বিদায় করে শেষ আটে রিয়াল

স্পোর্টস ডেস্ক

পিছিয়ে পড়ার ধাক্কা সামলে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সফলতম ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ তেতে উঠল বিরতির পর। তাদেরকে সঙ্গ দিল প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুমার অমার্জনীয় ভুলও। ছন্দে থাকা ফরাসি স্ট্রাইকার করিম বেনজেমা মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যে পেলেন দুরন্ত হ্যাটট্রিকের স্বাদ। দাপুটে পারফরম্যান্স দেখিয়ে পিএসজিকে বিদায় করে আসরের শেষ আটে উঠল লস ব্লাঙ্কোসরা।

বুধবার রাতে ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে শেষ ষোলোর জমজমাট ফিরতি লেগে ৩-১ গোলে জিতেছে রিয়াল। দুই দলের আগের দেখায় নিজেদের মাঠে ১-০ গোলে জিতেছিল পিএসজি। ফলে দুই লেগ মিলিয়ে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পেয়েছে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা।

প্রথমার্ধের শেষদিকে প্যারিসিয়ানদের এগিয়ে দিয়েছিলেন চোট থেকে সেরে ওঠা কিলিয়ান এমবাপে। দলটির প্রথম লেগের জয়ের এই নায়ক বিরতির আগে-পরে আরও দুবার জালে বল পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু অফসাইডের কারণ গোল দুটি বাতিল হয়। অন্যদিকে, ম্যাচের ৬০তম মিনিটে পর্যন্ত পিছিয়ে থাকা স্বাগতিকরা পরের সময়টাতে উপহার দেখায় চোখ ধাঁধানো ফুটবল। বেনজেমা, লুকা মদ্রিচ, ফেদেরিকো ভালভার্দে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের সামনে রীতিমতো ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে সফরকারীরা।

বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে পাড়ি জমানোর পর প্রথমবার স্পেনের মাটিতে খেলতে নেমেছিলেন লিওনেল মেসি। তাও আবার পুরনো 'শত্রু' রিয়ালের বিপক্ষে। তবে প্রথম লেগে পেনাল্টি মিস করা এই আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড দ্বিতীয় লেগে থাকলেন নিজের ছায়া হয়ে। নেইমার সামর্থ্যের ছাপ রাখলেও তা যথেষ্ট হয়নি। আগামী মৌসুমে পিএসজি ছেড়ে যার রিয়ালে যাওয়ার গুঞ্জন জোরালো, সেই এমবাপেই ছিলেন আক্রমণভাগের 'ত্রয়ী'র মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল।

বল দখলে পিছিয়ে থাকলেও আক্রমণে এগিয়ে ছিল স্প্যানিশ পরাশক্তি রিয়াল। ম্যাচের শেষ আধা ঘণ্টায় একের পর এক শট নিয়ে পিএসজির রক্ষণভাগকে এলোমেলো করে দেয় তারা। গোলমুখে তাদের ২১ শটের মধ্যে লক্ষ্যে ছিল সাতটি। বিপরীতে, ফরাসি জায়ান্ট পিএসজির দশ শটের চারটি ছিল লক্ষ্যে।

একদম শুরু থেকেই রিয়াল ছিল আগ্রাসী মনোভাবে। প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যে দুটি সুযোগ আসে মার্কো আসেনসিওর কাছে। তবে কাজে লাগাতে পারেননি এই স্প্যানিশ উইঙ্গার। এরপর পাল্টা জবাব দিয়ে অষ্টম ও ত্রয়োদশ মিনিটে এমবাপে দুবার ঢুকে পড়েন রিয়ালের ডি-বক্সে। কিন্তু তার প্রচেষ্টাগুলো রুখে দেন গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া।

২৫তম মিনিটে দোন্নারুমার দক্ষতায় জাল অক্ষত থাকে পিএসজির। বেনজেমার দূরপাল্লার শট ঝাঁপিয়ে রক্ষা করেন তিনি। ছয় মিনিট পর নেইমারের সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করে দুরূহ কোণ থেকে মেসির নেওয়া শট রিয়ালের জালের ঠিকানা খুঁজে পায়নি। তিন মিনিট পর বিশ্বকাপজয়ী ফরাসি তারকা এমবাপে নিশানা ভেদ করলেও আক্রমণের শুরুতে নুনো মেন্দেস অফসাইডে থাকায় তা গণ্য হয়নি।

অল্প সময়ের ব্যবধানে জোড়া সুযোগ হাতছাড়া করেন বেনজেমাও। ৩৫তম মিনিটে ভালভার্দের ক্রসে তার সোজাসুজি হেড লুফে নেন দোন্নারুমা। দুই মিনিট পর তার কোণাকুণি আরেকটি হেড অল্পের জন্য দূরের পোস্টের বাইরে চলে যায়। এই হতাশা না কাটতেই পিছিয়ে পড়ে রিয়াল।

৩৯তম মিনিটে লক্ষ্যভেদ করে উল্লাসে মাতেন এমবাপে। নিজেদের অর্ধ থেকে নেইমারের বাড়ানো কোণাকুণি থ্রু বল ধরে দ্রুতগতিতে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি। এরপর তার ডান পায়ের জোরালো শটে পরাস্ত হন বেলজিয়ান গোলরক্ষক কোর্তোয়া।

বিরতির পর খেলা শুরুর নবম মিনিটে ফের গোল করেছিলেন এমবাপে। কিন্তু মেসির পাস নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগে তিনি নিজেই ছিলেন অফসাইডে। সমানতালে চলতে থাকা আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের চিত্র পাল্টে যায় কিছুক্ষণ পরই। হাইভোল্টেজ লড়াইয়ে একক প্রাধান্য বিস্তার করে রিয়াল।

৬১তম মিনিটে অবিশ্বাস্য এক ভুল করে দলের বিপদ ডেকে আনেন ২০২০ ইউরোর সেরা গোলরক্ষক দোন্নারুমা। মার্কো ভেরাত্তির ব্যাক-পাসে অযথা কালক্ষেপণ করে বেনজেমার চাপের মুখে পড়েন তিনি। এরপর বল বিপদমুক্ত করতে গিয়ে এই ইতালিয়ান তুলে দেন ভিনিসিয়ুসের পায়ে। তার কাছ থেকে বল পেয়ে অনায়াসে ফাঁকা জালে বল ঠেলে দেন বেনজেমা।

ম্যাচে সমতায় ফিরে রিয়াল হয়ে ওঠে রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য। জড়সড় হয়ে পড়া প্রতিপক্ষের গোলমুখে বারবার হানা দিতে থাকে তারা। আক্রমণের সেই ধারাবাহিকতায় আসে কাঙ্ক্ষিত ফল। দুই মিনিটে দুই গোল করে বার্নাব্যুতে সাড়া ফেলে দেয় দলটি।

৭৬তম মিনিটে প্রতিপক্ষের কয়েকজন খেলোয়াড়কে এড়িয়ে নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে আক্রমণে ওঠেন মদ্রিচ। তার পাস পেয়ে সুবিধা করতে না পেরে এই ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডারকেই বল ফেরত দেন ভিনিসিয়ুস। মদ্রিচ এরপর নিখুঁতভাবে খুঁজে নেন বেনজেমাকে। বাকি কাজটা সারেন তিনি। শট ঠেকাতে যাওয়া পিএসজি অধিনায়ক মার্কুইনোসের পায়ে লেগে একটু ওপরে উঠে বল দোন্নারুমার আয়ত্বের বাইরে চলে যায়।

পরের মিনিটেই হ্যাটট্রিক পূরণ করে ফেলেন অভিজ্ঞ রিয়াল দলনেতা বেনজেমা। ডি-বক্সে ঢুকে পড়া ভিনিসিয়ুসের পা থেকে বল কেড়ে বিপদমুক্ত করতে চেয়েছিলেন মার্কুইনোস। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য বেনজেমার জন্য পরিণত হয় সৌভাগ্যে। বল পেয়ে নিচু শটে জাল কাঁপান তিনি। ফলে দুই লেগ মিলিয়ে রিয়াল এগিয়ে যায় ৩-২ ব্যবধানে।

যোগ করা সময়ের শেষদিকে মেসির সামনে সুযোগ এসেছিল দলকে ম্যাচে ফেরানোর। কিন্তু রেকর্ড সাতবারের ব্যালন ডি'অর জয়ী এই তারকা পারেননি রোমাঞ্চ ছড়াতে। তার ফ্রি-কিক চলে যায় ক্রসবারের সামান্য ওপর দিয়ে। ফলে তারকাখচিত দল বানিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্বপ্ন এবারও অধরা থেকে গেল পিএসজির।