জবাবদিহিমূলক সরকার কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই কি এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে?

মাহফুজ আনাম
মাহফুজ আনাম

গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সাধারণত তিনটি বিষয় দিয়ে বিচার করা হয়: যৌক্তিকতা, প্রয়োগ পদ্ধতি এবং তাৎপর্য বা অর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে ড. আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণের সরকারি সিদ্ধান্ত এই তিন ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। বুধবার খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই এর যৌক্তিকতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। বাস্তবায়নের দিক বিবেচনায় এটি ছিল অমার্জিত, অমর্যাদার ও মবের চাপে নেওয়া পদক্ষেপের মতো। আর তাৎপর্যের দিক বিবেচনায় এটি প্রায় দুর্বোধ্য, বিশেষ করে এই সময়ে।

প্রথমে আসি সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতার প্রশ্নে। একটি নতুন সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদে তার পছন্দমতো নতুন নিয়োগ দিতেই পারে। তাদের নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য সেই পদগুলোতে যথাযথ ব্যক্তিদের রাখতে চাইবে। এটাই স্বাভাবিক। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু বুধবারের এই সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা কোথায়?

এই পদে থাকা ব্যক্তি অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল খাত ‘ব্যাংকিং’ নিয়ে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পুঁজি পাচারসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এই খাত। রিজার্ভ হ্রাস ও মুনাফা বিদেশে পাচারের ফলে যে গুরুতর সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিমশিম খাচ্ছিল। গভর্নরের প্রতিটি পদক্ষেপ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। গভর্নর শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা করেন না, তার নেতৃত্বের প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতেই পড়ে। আর এই খাত দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অদক্ষ, রাজনৈতিকভাবে আপসকামী ও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্বের কারণে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিপুল।

অর্থনীতির প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, সে প্রেক্ষাপটে বর্তমানে এই পদে যিনি আছেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি, প্রশিক্ষণ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে জ্ঞানের প্রশ্নগুলো কি তার নিয়োগকে যথার্থতা দেয়? এটি কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে সমালোচনা নয়, বরং বৃহত্তর প্রেক্ষাপট—দেশের প্রয়োজন এবং বিশেষ করে এই সরকারের চাহিদা—নিয়ে ভাবনার বিষয়। সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচিতে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে তিনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারবেন? নতুন গভর্নর অন্য অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত হতে পারেন। কিন্তু এই পদে?

তার বিশ্বাসযোগ্যতায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি অস্বস্তিকর তথ্য হলো—গত ডিসেম্বরেই তিনি নিজের ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। ঋণখেলাপি দুই ধরনের—ইচ্ছাকৃত এবং পরিস্থিতিগত। আমরা আশা করি তিনি প্রথম শ্রেণিতে পড়েন না। খেলাপি ঋণ আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যাধি এবং এটি সব ব্যাংকের কার্যক্রমকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। যিনি নিজেই একসময় ঋণখেলাপি ছিলেন, তিনি অন্য ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবেন—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। ঋণ পুনঃতফসিল খেলাপিকে দায়মুক্ত করে না; এটি কেবল তাকে ওই পরিস্থিতি থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে।

আরেকটি প্রশ্ন গভর্নরের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির বিপুল সাফল্য এনে দেওয়া নির্বাচন পরিচালনা দলের একজন শীর্ষ সদস্য ছিলেন তিনি। তাহলে গভর্নরের পদ কি তার পুরস্কার? অতীত অভিজ্ঞতা কি আমাদের শেখায়নি যে এমন একটি পদে অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ পেশাদার ব্যক্তিরই নিয়োগ হওয়া উচিত? অতীত শাসনামল কি আমাদের এই শিক্ষা দেয়নি যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারিত অংশ হতে পারে না এবং এর কার্যক্রমে একটি স্বায়ত্তশাসনের উপাদান থাকা জরুরি? তা নিশ্চিত করতে গভর্নরকে হতে হবে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, দৃঢ়চেতা ও আত্মবিশ্বাসী—যাতে তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। সর্বোপরি, তাকে হতে হবে নিরপেক্ষ পেশাদার। তাহলে সরকার জেনেশুনে সরাসরি দলীয় এক কর্মীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যে নিয়োগ দিয়েছে, সেটার ব্যাখ্যা কীভাবে করব? তাহলে অতীতের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়?

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে এই পরিবর্তন নতুন সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক উদ্যোগের অংশ। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, অনেক জায়গায় পরিবর্তন হচ্ছে। আরও অনেক পরিবর্তন প্রক্রিয়াধীন আছে।’ তার এই মন্তব্যে স্পষ্ট বোঝা যায় যে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য দপ্তরের মতোই। তাহলে আবারও প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে নতুন সরকারের ভাবনায় নতুনত্ব কোথায়?

এরপর আসে ‘পদ্ধতি’র প্রশ্ন—নতুন গভর্নর নিয়োগের সিদ্ধান্ত যেভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যুক্তির খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, সরকারের নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রয়োজন ছিল, নির্বাচিত ব্যক্তিও যথার্থ ছিলেন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা জরুরি ছিল। তবু কি প্রক্রিয়াটি আরও মর্যাদাপূর্ণ হতে পারত না? ন্যূনতম সৌজন্যতার খাতিরে অর্থমন্ত্রী নিজে আহসান এইচ মনসুরকে নিজ দপ্তরে ডেকে সিদ্ধান্তটি জানাতে পারতেন কিংবা অন্তত ফোনে অবহিত করতে পারতেন। ন্যূনতম সৌজন্যতার খাতিরে তাকে কিছু সময় দেওয়া যেত, যাতে তিনি দপ্তর ছাড়ার, সহকর্মীদের বিদায় জানানোর এবং সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেওয়ার সুযোগ পান। এর পরিবর্তে তিনি গণমাধ্যমে নিজের অপসারণের খবর শুনে নিজ উদ্যোগে দপ্তর ছাড়েন। একই সময়ে তার এক উপদেষ্টাকে ক্ষুব্ধ একদল কর্মকর্তা ঘেরাও করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরকারপ্রধান ইতোমধ্যে যে মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, এ ধরনের আচরণ সেটির সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর যে মর্যাদাবোধ, সংযম ও স্থিরতা আমরা দেখি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে থাকা একজন ব্যক্তির অপমানজনকভাবে বিদায় নেওয়ার ঘটনায় এর ঠিক বিপরীত চিত্রই দেখা গেল।

সর্বশেষ আসে সিদ্ধান্তটির ‘অর্থ’ বা তাৎপর্যের প্রশ্ন। এর মাধ্যমে কী বোঝা যায়? অতীতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়া এবং যার পুনর্গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এমন একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এই নাটকীয় ও অপমানজনক পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার কী বার্তা দিতে চাইছে? যখন নতুন সরকার নিজেকে গোছাতে শুরু করেছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিশাল কাঠামো কীভাবে কাজ করে তা শিখছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুনর্গঠন করছে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নিয়োগ দিচ্ছে—ঠিক এই মুহূর্তে গভর্নরকে অপসারণের প্রয়োজন কেন হলো?

এই অপসারণ এমন এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঘটল, যিনি শেখ হাসিনার পতনের পর অর্থনীতির নানা সমস্যা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছিলেন। তার ১৮ মাসের মেয়াদকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সময় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আহসান এইচ মনসুর দেশে মুদ্রার বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করেন, যা নিয়ে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে টাকার মান কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ডলারের বিপরীতে টাকা স্থিতিশীল থাকে। তার সময়ে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার হয়।

আহসান এইচ মনসুর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেন এবং শিথিল ঋণনীতির বদলে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও মূল্যস্থিতিকে অগ্রাধিকার দেন। অন্তত ১১টি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনে তিনি সাহসী পদক্ষেপ নেন। সামগ্রিকভাবে তিনি আর্থিক খাতের দুর্বলতাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে তিনি আস্থা সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে শুধু ভালো করাই যথেষ্ট নয়, বৈশ্বিক বাজারকে বিশ্বাস করাতেও হয় যে আমরা ভালো করছি। আহসান এইচ মনসুর তা অনেকাংশে করতে পেরেছিলেন। তার অপসারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে এবং আমাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি অঙ্গীকার ছিল—তার সরকারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে যথাযথভাবে যুক্তিসঙ্গত ও স্বচ্ছ। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া ব্যাখ্যায় কেবল নতুন নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এত আকস্মিক, নাটকীয় ও বিদায়ী গভর্নরের প্রতি অবমাননাকর এই সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো—সে বিষয়ে এখনো কিছুই বলা হয়নি।

এই পদক্ষেপের কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারে এই ধারণা থেকে যে, ‘মব’-এর কাছে নতি স্বীকার করে নেওয়া হলো। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণ, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সার্বিক মূল্যায়ন কিংবা এর প্রভাব নিয়ে যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে কি না, তার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। এটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন কিছু কর্মকর্তা মূলত প্রশাসনিক দাবিদাওয়া নিয়ে সমবেত হয়েছিলেন।

নতুন সরকারের প্রথম দিককার অঙ্গীকারগুলোর একটি ছিল ‘মব’ বরদাশত না করা। বাংলাদেশ ব্যাংকে যা ঘটেছে, তা কি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই ধরনের পদক্ষেপকে উসকে দেবে না? আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাই, তিনি যেন ঘটনাটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করেন এবং এটি তার সরকারের জন্য কী বার্তা বহন করে ও ভবিষ্যতে এমন পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী করা প্রয়োজন—তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন। এ ধরনের পদক্ষেপ সরকারের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে এর পরিণতি দীর্ঘ হতে পারে।

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার