পুলিশ কি চাইলেই তল্লাশি ও মারধর করতে পারে, আইন কী বলছে?
মাদক নির্মূল করা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রুটিন দায়িত্ব। নাগরিকদের একটি মাদকমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ নিশ্চিতে পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে—এটাই প্রত্যাশিত।
তবে সম্প্রতি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা পুলিশের পেশাদারিত্ব এবং আইনি এখতিয়ার নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। তল্লাশির নামে যথেচ্ছ হয়রানি কিংবা সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই নাগরিকদের ওপর পুলিশের চড়াও হওয়া কি আইনসম্মত হতে পারে?
নাগরিককে তল্লাশি করার আইনি নিয়ম কী?
বাংলাদেশে পুলিশের কোনো নাগরিককে বা তার ব্যক্তিগত মালামাল তল্লাশি করার প্রক্রিয়াটি মূলত ফৌজদারি কার্যবিধি এবং পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (পিআরবি) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আইন অনুযায়ী পুলিশ তল্লাশি করতে পারলেও কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তল্লাশির আইনি ক্ষমতা মূলত সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) বা তার ওপরের পদের কর্মকর্তাদের। কনস্টেবলরা একা তল্লাশি করতে পারেন না। তারা কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সহায়তা করতে পারেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৪ ও ৯৬ অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট দলিল বা বস্তু উদ্ধারের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি বা সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে পুলিশ তল্লাশি করতে পারে।
একই আইনের ১০২ ও ১০৩ ধারা বলছে, যখন পুলিশ কোনো বদ্ধ স্থান (যেমন ঘর বা ব্যাগ) তল্লাশি করবে, তখন অবশ্যই এলাকার দুজন বা ততোধিক সম্মানীয় ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত রাখতে হবে।
তবে ১৬৫ ধারায় বলা হচ্ছে, যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন যে ওয়ারেন্ট পাওয়ার অপেক্ষা করলে অপরাধের আলামত নষ্ট হতে পারে, তবে তিনি নিজে কারণ লিপিবদ্ধ করে ওয়ারেন্ট ছাড়াও তল্লাশি চালাতে পারেন। তবে তাকে দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এর কারণ জানাতে হয়।
দেহ তল্লাশির ক্ষেত্রে ধারা ৫১ অনুযায়ী, যদি কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়, তবে পুলিশ তার দেহ তল্লাশি করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো ব্যক্তির ব্যবহৃত পোশাক ছাড়া অন্য সব মালামাল পুলিশ হেফাজতে নিতে পারবে। জব্দকৃত মালামালের একটি তালিকা তৈরি করতে হবে এবং তল্লাশি করা ব্যক্তিকে তার একটি কপি দিতে হবে।
ধারা ৫২ অনুযায়ী, কোনো নারীকে তল্লাশি করতে হলে তা কেবল আরেকজন নারী পুলিশ সদস্য দিয়েই করাতে হবে। তল্লাশির সময় ওই নারীর শালীনতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কোনো পুরুষ পুলিশ সদস্য কোনো নারীর দেহ তল্লাশি করতে পারেন না।
কোনো নাগরিককে জনসমক্ষে হেনস্তা বা অপমান করে তল্লাশি করা পুলিশের আচরণবিধির লঙ্ঘন।
তল্লাশির সময় নাগরিকের আইনি অধিকার
তল্লাশির সময় নাগরিকেরও কিছু আইনি অধিকার আছে। যেমন আপনি পুলিশের কাছে তার পরিচয়পত্র দেখতে চাইতে পারেন। সিভিল পোশাকে থাকলে তিনি পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য।
পুলিশের কাছে অনুরোধ করতে পারেন যেন আশেপাশের পরিচিত বা নিরপেক্ষ কারো উপস্থিতিতে তল্লাশি চালানো হয়।
পুলিশ যদি আপনার কাছ থেকে কিছু উদ্ধার করে (যেমন মোবাইল বা মানিব্যাগ), তবে তাৎক্ষণিকভাবে একটি জব্দ তালিকা বা রিসিট বুঝে নেওয়া আপনার অধিকার।
মারধর বা নির্যাতন: আইন কী বলছে?
বাংলাদেশের কোনো আইনেই পুলিশকে সন্দেহভাজন, আটক ও গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে মারধর বা শারীরিক নির্যাতন করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
কাউকে সন্দেহ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা বা থানায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, কিন্তু জনসমক্ষে লাঠিচার্জ বা শারীরিক লাঞ্ছনা করা পুলিশের কোড অব কন্ডাক্টের পরিপন্থী।
নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ হলো একটি বিশেষ ফৌজদারি আইন, যা মানবাধিকার সুরক্ষা ও নির্যাতন প্রতিরোধমূলক আইন হিসেবে পরিচিত। এই আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা, এমনকি ভয় দেখানোও দণ্ডনীয় অপরাধ।
যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তার নির্যাতনে কারো মৃত্যু হয়, তবে ওই কর্মকর্তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। আর আহত হলে অন্তত ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে যে, গ্রেপ্তারের সময় বা হেফাজতে থাকাকালে কোনোভাবেই নির্যাতন করা যাবে না।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ থেকে ৫৩ ধারা পর্যন্ত পুলিশের গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগের সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে যতটুকু বল প্রয়োগ প্রয়োজন (যদি সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে), তার বেশি শক্তি প্রয়োগ করা যাবে না। অর্থাৎ, আটক করার পর বা আয়ত্তে আসার পর তাকে মারধর করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুসারে—পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে ওয়ারেন্ট বা পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে, যদি তার বিরুদ্ধে যৌক্তিক সন্দেহ থাকে যে তিনি কোনো অপরাধ করেছেন বা করতে যাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের আগে বা পরে তল্লাশি করতে হলে তা যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ভিত্তিতে করতে হবে।
অন্যদিকে, ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (পিআরবি) অনুযায়ী, কোনো স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বা তথ্য বের করার জন্য পুলিশ কোনোভাবেই শারীরিক বা মানসিক চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না।
পুলিশ কেবল তখনই লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগ করতে পারে যখন জননিরাপত্তা চরম হুমকিতে থাকে (যেমন দাঙ্গা)। তবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনা এমন ছিল না।
বাংলাদেশের সংবিধানও প্রতিটি নাগরিককে নিষ্ঠুরতা থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। অনুচ্ছেদ ৩৫(৫)-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না অথবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না বা তাহার সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।
নির্যাতিত ব্যক্তির জন্য আইন
বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনের অধীনে হওয়া অপরাধগুলো অ-জামিনযোগ্য। অর্থাৎ কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্যাতন করার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলে তার জামিন পাওয়া কঠিন।
যদি কেউ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন, তবে ২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। এমনকি ঘটনার কোনো সাক্ষী না থাকলেও ভুক্তভোগীর জবানবন্দি এই আইনে বড় প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়।
তবে এই আইনে যদি কেউ কোনো পুলিশ বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাবশত মিথ্যা মামলা করেন, সেক্ষেত্রে অভিযোগকারীরও শাস্তির বিধান আছে।
