শেরপুরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ: পরিবারকে মামলা প্রত্যাহারের চাপ

মোকাম্মেল শুভ

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে মা ও মেয়েকে ধর্ষণের মামলা তুলে নিতে পরিবারটিকে হুমকি দিচ্ছেন অভিযুক্তরা।

মামলার বাদীর বড় বোন বলেন, 'তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার পর তারা আমাদের চাপ দিচ্ছে। বলছে, আমরা পরে "আফসোস" করব। এমনকি আদালতের বাইরে সবকিছু মিটিয়ে ফেলার জন্য আমাদের টাকা দেওয়ার কথাও বলছে তারা।'

তিনি আরও বলেন, 'পার পেয়ে যাবে— এ কথা ভেবে নিয়েই তারা আমার বোন ও ভাগ্নিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেছে। ঘটনার সময় যদি আমি গ্রামে না থাকতাম, তাহলে হয়তো এই জঘন্য অপরাধটা সামনেই আসতো না। আমি এখন বিভিন্ন মহল থেকে হুমকি পাচ্ছি।'

রোববার ভোরে মা ও মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার পর, ওইদিনই নালিতাবাড়ী থানায় ৮ জনকে আসামি করে মামলা করেন মা। অভিযুক্তদের মধ্যে ২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে প্রধান আসামি ওমর আলীসহ ৬ জন এখনো পলাতক।

এফআইআরে গ্রেপ্তার যে ২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলেন- গরু ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৪৫) এবং ড্রেজার চালক সাদেক মিয়া (৩০)। আব্দুস সাত্তারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বশির আহমেদ জানান, অন্য ৬ আসামির নাম ওমর আলী, ওসমান আলী, জাহাঙ্গীর আলম, তারা মিয়া, মফিজ উদ্দিন এবং আহমেদ আলী। তাদের বয়স ৩০ থেকে ৪২ বছরের মধ্যে।

এলাকাবাসী জানান, অভিযুক্তরা ও ওই নারী একই গ্রামের বাসিন্দা। ২ জন ছাড়া অভিযুক্তদের কারোরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তাদের একটি গ্রুপ আছে এবং স্থানীয়দের কাছে তারা বখাটে হিসেবে পরিচিত। বেশিরভাগ সময় জুয়া খেলে কাটান।

ওসি বশির জানান, অতীতে তাদের কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড পাওয়া যায়নি। তবে তাদের পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ ছিল এবং একসঙ্গে তারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজ করতেন।

পোড়াগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ফজলুল হক জানান, প্রধান অভিযুক্ত ওমর আলী ঢাকায় গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।  মহামারির সময় চাকরি হারান তিনি। পরে গ্রামে ফিরে গিয়ে খামার শ্রমিক হিসেবে নিজের ও বর্গা জমিতে কাজ শুরু করেন।   

জাহাঙ্গীর আলম ও মফিজ উদ্দিনও রাজধানীতে পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তারাও মহামারিতে চাকরি হারান এবং গ্রামে ফিরে কৃষি কাজ শুরু করেন বলে গ্রামবাসী জানান।

বাকিদের মধ্যে তারা মিয়া ক্ষমতাসীন দলের ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা। আর আহমেদ আলী পেশায় কৃষক।

যে বাড়িতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, সে বাড়ির মালিক ওসমান ঢাকার একটি পোশাক কারখানার নিরাপত্তাকর্মী। তিনি তার পরিবারের সঙ্গে সেখানেই থাকেন। ঘটনার ৩ দিন আগে তিনি গ্রামে নিজের খালি বাড়িতে যান বলে জানান ফজলুল হক।

পরিবারটির সঙ্গে দেখা করার পর এই প্রতিবেদক দেখতে পান, কিশোরী মেয়েটি ঘটনার পর থেকে কান্না থামায়নি।

পুরো গ্রাম জুড়ে খবরটি ছড়িয়ে পড়ায় পরিবারটি প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে আছে।

কাঁদতে কাঁদতে মা বলেন, 'আমি বিচার চাই। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই'।

ওসমানের বাড়িতে গিয়ে এই প্রতিবেদক দেখেন, এটি অত্যন্ত নির্জন এলাকায়। আশেপাশের ১০০ গজের মধ্যে একটি ছাড়া অন্য কোনো বাড়ি নেই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই বাড়ি ও এর পেছনের বাঁশঝাড় অভিযুক্তরা জুয়া খেলাসহ বিভিন্ন অবৈধ কাজের আখড়া ছিল।

ওসি বশির জানান, মা ও মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বিষয়টি প্রাথমিক মেডিকেল পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। ক্রস পরীক্ষার জন্য অভিযুক্তদেরও নমুনা সংগ্রহ করা হবে।

বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অনুবাদ করেছেন জারীন তাসনিম