জাপানের সঙ্গে সই হচ্ছে প্রথম ইপিএ, রপ্তানিতে বাড়বে শুল্কমুক্ত সুবিধা

রেফায়েত উল্লাহ মীরধা
রেফায়েত উল্লাহ মীরধা

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশটির সঙ্গে প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে বাণিজ্য কূটনীতিতে এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। আগামীকাল শুক্রবার টোকিওতে এই চুক্তি সই হবে। 

বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, চুক্তি সই উপলক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল আজ বৃহস্পতিবার জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবে।

গত ২২ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদিত এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা তৈরি পোশাকসহ প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যে জাপানের বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবেন, যা মোট রপ্তানি পণ্যের ৯৭ শতাংশ। বিনিময়ে জাপান বাংলাদেশের বাজারে ১ হাজার ৩৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

তবে টয়োটা, হোন্ডা ও সুবারুর মতো গাড়ি ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। বাণিজ্যসচিব জানান, জাপানি উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে গাড়ি সংযোজন বা উৎপাদনে সরাসরি বিনিয়োগে উৎসাহিত করতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, এতে স্থানীয় অটোমোবাইল শিল্পে জাপানি বিনিয়োগ বাড়বে এবং এ খাতের চেহারা বদলে যেতে পারে।

বাংলাদেশ এশিয়ার অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি পণ্য জাপানে রপ্তানি করে। বর্তমানে সেখানে বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার, যার বেশির ভাগই তৈরি পোশাক। অন্যদিকে জাপান থেকে আমদানির পরিমাণ ১ দশমিক ৮ থেকে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, ইপিএ সইয়ের ফলে রপ্তানি বাড়বে এবং জাপানি বিনিয়োগ আসার পথ সুগম হবে, যা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শুল্ক কমানোর পাশাপাশি এই চুক্তিতে সেবা, বিনিয়োগ, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং মেধা স্বত্ব অধিকারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা আশা করছি এই ইপিএর অধীনে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের একটি বড় প্রবাহ আসবে। জাপান বিনিয়োগের জন্য অনুকূল গন্তব্য খুঁজছে এবং বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছে।’

বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার। জাপানের বৈদেশিক বিনিয়োগের মধ্যে এটা খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ। তবে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতিমধ্যে বেশ কিছু জাপানি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরু করেছে।

চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ জাপানের জন্য ৯৭টি সেবা খাত উন্মুক্ত করবে, আর জাপান বাংলাদেশের জন্য ১২০টি খাত খুলে দেবে। এতে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তৈরি পোশাক খাত ‘সিঙ্গেল স্টেপ ট্রান্সফরমেশন’ নিয়মের আওতায় তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, যা এলডিসি–পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বড় অর্জন।

২০২০ সালে ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) সই করলেও জাপানের সঙ্গে এই ইপিএ হবে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। ভারত, তুরস্ক, চীন, ইউএই, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এমন চুক্তির চেষ্টা চালিয়ে আসছে বাংলাদেশ।

২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আগ্রহ প্রকাশের পর যৌথ সমীক্ষা দল গঠন করা হয়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে আলোচনা গতি পায়। গত ডিসেম্বরে জাপান এবং চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকার খসড়া চুক্তিতে অনুমোদন দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ জাপানের মতো বড় অর্থনীতির সঙ্গেও চুক্তি করতে সক্ষম।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা, তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।’

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, ‘এই ইপিএর মাধ্যমে বাংলাদেশ জি-৭ ভুক্ত একটি দেশের অংশীদার হবে। এতে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দুয়ার খুলবে।’