অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ভণ্ডুল করে দিতে পারে যে নিয়োগ

জিনা তাসরিন
জিনা তাসরিন

ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে, প্রথমে ট্র্যাজেডি হিসেবে, পরে প্রহসন হিসেবে—বলেছিলেন জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের সদরদপ্তরে যা ঘটল, তা যেন মাত্র ১৮ মাসের ব্যবধানে ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি এবং ট্র্যাজেডি হিসেবেই।

বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিতে হাঁটু গেড়ে বসা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার নেপথ্য কারিগর আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নরের পদ থেকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

‘আমি পদত্যাগ করিনি, আমাকে অপসারণও করা হয়নি। মিডিয়ায় দেখলাম, তাই বাসায় চলে যাচ্ছি,’ দুপুর ২টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সদরদপ্তর ত্যাগ করার সময় সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। সেসময় তাকে একদল বিক্ষুব্ধ মানুষের ভিড় এড়িয়ে বের হতে দেখা যায়।

প্রায় এক ঘণ্টা পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তার ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট শুরু হওয়া চার বছরের মেয়াদের অবশিষ্ট অংশ বাতিল করে গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করে।

তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের একটি মাঝারি মানের সোয়েটার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাকুর রহমান। প্রতিষ্ঠানটি মাত্র কয়েক মাস আগে ৮৯ কোটি ২ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করে।

শিক্ষাগতভাবে তিনি একজন হিসাববিদ। তিনি অর্থনীতিবিদ নন, ব্যাংকারও নন—যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার মৌলিক পূর্বশর্তগুলোর একটি। ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতে তার পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই।

বিষয়টি আরও বিস্ময়কর এই কারণে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হতে হলে সুদৃঢ় শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘ ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এবং অন্তত তিন বছর অতিরিক্ত বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।

নতুন গভর্নর ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ বলয়ে আছেন, বিএনপির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কমিটিতে তার অন্তর্ভুক্তিই যার প্রমাণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী, একটি ব্যাংকের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতাই তিনি রাখেন না, পুরো ব্যাংকিং খাতের নেতৃত্ব তো দূরের কথা।

এ নিয়োগ অদ্ভুতভাবে আওয়ামী লীগ আমলের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ হতো রাজনৈতিক বিবেচনায়, শীর্ষ নেতৃত্বের ইচ্ছার প্রতি অনুগত রাখার উদ্দেশ্যে।

তবে তখনো কিছুটা নিয়মকানুন মানা হতো। সর্বশেষ দুই গভর্নর ছিলেন অর্থসচিব, তার আগে ছিলেন একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ব্যবসায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হলেন।

আসলে বিশ্বজুড়েই এমন নজির খুবই বিরল। কারণ এ পদে জনস্বার্থে তীক্ষ্ণ মনোযোগ প্রয়োজন, যেমন মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষা। কিন্তু মুনাফা সর্বাধিককরণের মানসিকতা নয়, যা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক।

ফলে স্বভাবতই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, ব্যাংকিং খাত আবারও পদ্ধতিগত লুটপাটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। যেমনটি শেখ হাসিনার আমলে দেখা গিয়েছিল।

আহসান এইচ মনসুরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কৌশলগত জাল বিস্তার করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ১৫ বছরে দেশের আর্থিক খাত থেকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বহু ব্যাংক ও তাদের পরিচালনা পর্ষদ তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দখলে চলে গিয়েছিল।

এরপর কিছু কাল্পনিক কোম্পানিসহ অন্যান্য কোম্পানিকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়, যা কখনোই পরিশোধ হয়নি। উপরন্তু নিয়ন্ত্রকের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া হয়। বিপুল অর্থ পরে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়।

এমন ভগ্নদশার মধ্যেই ২৭ বছর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে কাজ করা অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর গভর্নরের দায়িত্ব নেন এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যোগী হন।

তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

ডলার মজুত ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার আমদানি সীমিত করে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন খাতে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বকেয়া জমতে দেয় এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বছরের পর বছর মুনাফা দেশে নিতে বাধা দেয়।

গত ১৮ মাসে সব বিদেশি দায় শুধু পরিশোধই হয়নি, মুনাফা প্রত্যাবাসনও পুনরায় চালু হয়েছে, আমদানি বিধিনিষেধও তুলে নেওয়া হয়েছে। তবু রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে।

মুদ্রা বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হলেও টাকা আশঙ্কাজনকভাবে ধসে পড়েনি আহসান এইচ মনসুরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণেই। এখন ডলারের বিপরীতে টাকার দর প্রায় ১২২ টাকায় স্থিতিশীল।

অর্থপাচারের অন্যতম কৌশল ‘মিস-ইনভয়েসিং’ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন আহসান এইচ মনসুরের প্রতি আস্থার কারণে।

গত তিন বছর ধরে দ্বিগুণ অঙ্ক ছোঁয়া মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮ শতাংশে, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তার দক্ষ কৌশলের ফলেই।

মোট বকেয়া সম্পদের এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছে যাওয়া খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে জর্জরিত ব্যাংক খাতও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ইসলামি ব্যাংকগুলোর আর্থিক হিসাবও পুনর্গঠিত হচ্ছে।

এর চেয়েও উল্লেখযোগ্য, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে তিনি অগ্রগতি অর্জন করেন।

তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতার কারণেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পুরোপুরি পূরণ না করেও ঋণ কর্মসূচির কিস্তি ছাড় করতে পেরেছে বাংলাদেশ।

মাত্র ১৮ মাসে আহসান এইচ মনসুর যা করেছেন, তা নিঃসন্দেহে অসাধারণ।

কিন্তু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখনো নাজুক। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-ঝুঁকি বাড়লে এলএনজির দাম বাড়তে পারে, ফলে দ্রুত রিজার্ভ কমে যেতে পারে। তখন মূল্যস্ফীতি বাড়বে, টাকার মান চাপে পড়বে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে।

এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে আহসান এইচ মনসুরের মতো অভিজ্ঞ নেতৃত্ব যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন দায়িত্ব দেওয়া হলো এক অনভিজ্ঞ ব্যক্তির হাতে।

এতে আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, অভিজ্ঞতাহীন কারও হাতে মুদ্রানীতি থাকলে বহুপাক্ষিক ঋণদাতা কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে? যদি আইএমএফ কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে বাংলাদেশের ঋণমান কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে? আন্তর্জাতিক ঋণপ্রাপ্তি ও তার ব্যয় কতটা বাড়বে?

সংক্ষেপে, এতে দেশের অর্থনীতি কয়েক দশক পিছিয়ে পড়তে পারে। আর যদি তা-ই ঘটে, তবে বাংলাদেশের জন্য সেটি হবে নিঃসন্দেহে এক ট্র্যাজেডি।