নার্গিস-মধুবালা থেকে কারিনা-ঐশ্বর্য: ৭ দশকে গেয়েছেন ১২ হাজার গান 

মো. ইমরান
মো. ইমরান

সংগীতের জগতে কিছু কণ্ঠ থাকে যা শুধু আমাদের কানে নয়, সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের মায়া ও নানান স্মৃতি। কিন্তু সেই কণ্ঠের পেছনে যদি থাকে এক পাহাড় সমান লড়াইয়ের গল্প, তবেই তা হয়ে ওঠে কিংবদন্তি। 

আশা ভোসলে ছিলেন তেমনই একজন শিল্পী। যার কর্মজীবন বর্ণাঢ্য ও সুরেলা, ঠিক তার কণ্ঠের মতোই। 

তবে এই কিংবদন্তির ব্যক্তিগত জীবন মোটেও সহজ ছিল না। ১৬ বছরের কিশোরী বয়সে তিনি মা-বাবার ঘর ছেড়েছিলেন। পরিবার ও বড় বোন লতার অমত থাকার পরেও গণপতরাও ভোসলে নামের এক ব্যক্তিকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। গণপতরাওয়ের বয়স তখন ৩১। এই সংসারে তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেন আশা। এমনকি, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আশা ভোসলেকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। এই সম্পর্ক ছিন্ন করে ১৯৬০ সালে তিন সন্তানকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন আশা।

ষাটের দশকের ‘চরম রক্ষণশীল সমাজে দুই সন্তান এবং তৃতীয় সন্তানকে গর্ভে নিয়ে ‘সিঙ্গেল মাদার হিসেবে শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ। বেশিরভাগ সময় সন্তানদের স্টুডিওতে নিয়ে যেতেন আশা। এক স্টুডিও থেকে আরেক স্টুডিও, এভাবেই চলতে থাকে রেকর্ডিং। এরই মাঝে মুক্তি পায় ‘হাম দোনো অমর হয় তার গান, ‘আভি না যাও ছোড়কার, কে দিল আভি ভারা নেহি। 

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সেই উত্তাল সময়ে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে আশার একমাত্র সম্বল ছিল তার কণ্ঠ। স্টুডিওর এক কোণে ছোট সন্তানদের বসিয়ে রেখে তিনি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গান গেয়েছেন। পরে তিনি রাহুল দেব বর্মণকে (আর ডি বর্মণ) বিয়ে করেন। 

তখন হিন্দি সিনেমায় বড় বোন লতা মঙ্গেশকর এবং গীতা দত্তের জয়জয়কার। বড় দিদির বিশাল ছায়ার নিচ থেকে নিজের আলাদা একটি পরিচয় তৈরি করা ছিল অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ। 

শুরুতে তাকে কেবল সেই গানগুলোই দেওয়া হতো যা লতা মঙ্গেশকর প্রত্যাখ্যান করতেন। কিন্তু আশা, আশাহত হননি। নিজের কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ করেছেন কোটি হৃদয়। 

রেকর্ডের রাজকন্যা

আশা ভোসলের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে বিস্ময়ে বিমূঢ় হতে হয়। ২০১১ সালে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশটিরও বেশি ভাষায় তিনি প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার, কারও মতে আরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন। মেলোডি, পপ, গজল, ভজন থেকে শুরু করে লোকসংগীত সবখানেই তার অবাধ বিচরণ ছিল। 

১৯৪৩ সালে মারাঠি সিনেমা ‘মাঝা বাল এ তিনি প্রথম গান গান। হিন্দি সিনেমায় যাত্রা শুরু করেন ১৯৪৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চুনারিয়া সিনেমার মাধ্যমে। এরপর এই যাত্রা চলে সাত দশক! 

আশা ভোসলে ও চিত্রনায়িকা রেখা। ছবি: সংগৃহীত

তার সুরে সুর মিলিয়েছেন সাদা কালো যুগের নার্গিস, মধুবালা, বৈজন্তিমালা ও ওয়াহিদা রহমানের মতো অভিনেত্রী। আবার একুশ শতকের কারিনা কাপুর, ঐশ্বর্য, কাজলের জন্যও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। সহশিল্পী হিসেবে যেমন পেয়েছেন মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার আবার জুটি করেন উদিত নারায়ণ, সনু নিগমের সঙ্গেও। মজার বিষয় হলো, কিংবদন্তি ফাস্ট বোলার ব্রেট লির সঙ্গেও ডুয়েট গেয়েছেন আশা।   

পুরস্কার ও অর্জন

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন অগণিত সম্মাননা। ভারত সরকার তাকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মবিভূষণ ও ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এছাড়া তিনি সাতবার ফিল্মফেয়ার সেরা নারী সঙ্গীতশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন। ভারতীয় সংগীতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্বও তার। ১৯৯৭ সালে প্রথম ভারতীয় সংগীতশিল্পী হিসেবে তিনি ‘লিগেসি অ্যালবামের জন্য গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডে মনোনীত হয়েছিলেন।

পদ্মবিভূষণ সম্মাননা গ্রহণ করছেন আশা ভোসলে। ছবি: সংগৃহীত

জন্ম ও লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে সম্পর্ক

১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের এক সংগীত পরিবারে জন্ম নেন আশা ভোসলে। তিনি ছোটবেলা থেকেই গানের আবহে বড় হয়েছেন। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক মুখরোচক গল্প থাকলেও, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

দিদি লতাকে তিনি তার মায়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন। যদিও পেশাদার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তারা ছিলেন একে অপরের শক্তির উৎস। লতার প্রয়াণে আশা বলেছিলেন, তার জীবনের একটি অংশই যেন হারিয়ে গেল।

দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে আশা ভোসলে। ছবি: সংগৃহীত

 

মন্দ মেয়ের কণ্ঠ

আশা ভোসলে তার গান নির্বাচনের জন্যও বিখ্যাত ছিলেন। পর্দার ‘নেতিবাচক চরিত্রগুলো, খল নারী চরিত্রদের জন্য কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। ‘ঝুমকা গিরা রে, ‘দম মারো দম, ‘পিয়া তু আব তো আ যা, ‘ইয়ে লাড়কা হায় আল্লাহ এসব গানে ব্যক্ত করেছেন নারীর অনুভূতি, যা সমাজ এক রকম চেপেই রাখতে চায়। ক্যাবরে শিল্পী যাদের তথাকথিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ‘মন্দই দেখা হতো সেই ‘অভদ্র ও ‘মন্দ মেয়েদের কণ্ঠ ছিলেন আশা। তিনি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন ‘প্রথাবিরোধী। 

এক যুগের অবসান

অবশেষে সুরের এই মহাযাত্রার যবনিকা পড়ল। ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই সুরসম্রাজ্ঞী। ৯২ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতা এবং মাল্টি-অর্গান ফেইলিউরের কারণে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। 

তার মৃত্যুতে বিশ্ব সংগীতে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা অপূরণীয়। ১৩ এপ্রিল, মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। 

আশা ভোসলে মারা গেলেও তার রেখে যাওয়া হাজারো কালজয়ী গান চিরকাল বেঁচে থাকবে সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে।