সাক্ষাৎকার

‘সততা নিয়ে বেঁচে থাকা, সৎ থাকার মধ্যেই সুখ’

শাহ আলম সাজু
শাহ আলম সাজু

ওয়াহিদা মল্লিক জলি এবং রহমত আলী—দুজনেই অভিনয়ের মানুষ। দীর্ঘ দিন থিয়েটার করেছেন। নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন। দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছেন। দুজনে পড়াশোনা করেছেন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সঙ্গে দুজনে দীর্ঘ দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এখনো অভিনয়ে সরব আছেন এই তারকা দম্পতি। 

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেছেন জীবনের নানা বিষয় নিয়ে।

ওয়াহিদা মল্লিক জলি এবং রহমত আলী সংসার জীবন শুরু করেন ১৯৯০ সালে। তারপর থেকে দুজনের সুন্দর সংসার জীবন চলছে। ঘর আলো করে এসেছে দুই সন্তান। একজন জার্মানিতে পড়াশোনা করে সেখানেই থাকছেন। আরেক সন্তান কানাডায় পড়াশোনা করছেন।
দুই সন্তান ভালো মানুষ হয়ে, মানবিক মানুষ হয়ে বেঁচে থাকুক—এটাই তারা চান।

অনেক বছর সংসার করছেন, মূলমন্ত্রটা কী? এর জবাবে ওয়াহিদা মল্লিক জলি বলেন, ‘অনেকে অনেকরকম যুক্তি দেখান। আমার কাছে মূল বিষয় হচ্ছে মায়া। সংসারের মায়া, সন্তানদের জন্য মায়া এবং স্বামীর প্রতি মায়া। বিশ্বাস—সে তো থাকবেই। মায়াটাই আসল। মায়া আছে বলেই এতটা পথ একসঙ্গে পাড়ি দিতে পেরেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সংসারের মানুষদের ছেড়ে থাকব, এটা ভাবতেই পারি না।’

দুজনের পরিচয়ের পর্বটি জানতে চাইলে ওয়াহিদা মল্লিক জলি বলেন, ‘আমরা দুজনেই রাজশাহীর মানুষ। যখন ক্লাস টেনে পড়ি, তখন পরিচয়। আমার বাবার সঙ্গে থিয়েটার করত। একসময় আমি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাই। রহমত সেখানে পড়তে যায়। এভাবে পরিচয় থেকে চেনাজানা বাড়ে। আমার বাবা ছিলেন নাটকপাগল মানুষ। কিন্তু, তিনি চাইতেন না অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিই। কেননা, সেই সময় অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার অবস্থা ছিল না।’

জলি আরও বলেন, ‘রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার পর রহমত থিয়েটারে যোগ দিতে চাইল। আমাকেও দিতে বলল। সেই সময় কলকাতায় থিয়েটার ওয়ার্কশপ নামকরা ছিল। আরো তিন-চারটা নামকরা ওয়ার্কশপ ছিল। রহমত থিয়েটার ওয়ার্কশপে যোগ দেয়। বাবা বলতেন, আমিও যেন যোগ দেই। এভাবেই আমিও সেখানে যোগ দেই।’

‘থিয়েটারে কাজ করতে গিয়ে বেশ রাত হয়ে যেত। দল থেকে বলা হয়, রহমত যেন পৌঁছে দেয়। আমাকে পৌঁছে দিত। তখন কলকাতার কিছুই চিনি না। এভাবে আমাদের চেনাজানা বাড়তে থাকে। ভালো লাগাও বাড়তে শুরু করে’, স্মৃতিচারণ করে বলেন জলি। 

পেছনের স্মৃতি মনে করে জলি আরও বলেন, ‘রেডিওতে কাজ করার কারণে কলকাতায় যেদিন থিয়েটার ওয়ার্কশপে যোগ দিই, সেদিন আমাকে স্ক্রিপ্ট পড়তে দেওয়া হয়। আমার পড়া দেখে দলের সবাই অবাক হয়। এ কারণে, দলে যোগ দিয়ে আমাদের দুজনের কাউকেই বেশিদিন বসে থাকতে হয়নি। দ্রুত নাটকে কাজ করার সুযোগ পাই আমরা।’

রহমতের দোষ-গুণ কী? এ প্রশ্নের জবাবে জলি বলেন, ‘রহমতের বড় দোষ সে অল্পতে রেগে যায়। যা সত্য, তা অকপটে বলে দেয়। গুণ হচ্ছে, সে অনেক সরল। ভালো মানুষ তো অবশ্যই। আরো বড় গুণ, রহমত একজন সৎ মানুষ। সততা নিয়ে জীবন পার করছে। এজন্যই বোধ করি আমরা সুখে আছি। এজন্যই আমাদের সুখের পরিমাণ বেশি।’

রহমত আলী বলেন, ‘আমাদের সুখ বেশি। সুখ-দুঃখ থাকবেই। তবে, সুখটা বেশি। আমাদেরও ঝগড়া হয়, মান-অভিমান হয়। বেশি সময় থাকে না। সব ভুলে যাই। ভুল হলে স্বীকার করি। বড় বিষয় হচ্ছে ছাড় দেওয়া। দুজন দুজনকে ছাড় দেই। না হলে হবে না। তাতে সুখটা বেশি পাওয়া যায়।’

‘সততা নিয়ে বেঁচে থাকা, সৎ থাকা—এখানেই সুখ’, যোগ করেন রহমত। 

সংসারে কে বেশি দায়িত্ববান? রহমত বলেন, ‘আমার মনে হয় জলি বেশি দায়িত্ব পালন করে। সংসারের দায়িত্ব, সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব—সবই সে পালন করে।’

একটি উদাহরণ টেনে রহমত আলী বলেন, ‘একসময় আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছি। জলি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। সেই সময় আমি দূরে ছিলাম। সংসার, সন্তান—সব সামলাতে হয়েছে তাকে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বছর শিক্ষকতা করে একসময় আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই। তারপর দুজনে দায়িত্ব ভাগ করে নিই।’

জলির বড় গুণ কী? এর জবাবে রহমত বলেন, ‘ওর বড় গুণ সে বিবেচক। প্রচণ্ড বিবেচনাবোধ আছে। কথা বলে মেপে। হুট করে কিছু বলে না। ভেবে কথা বলে। ভেবে সিদ্ধান্ত নেয়।’

‘আমরা দুজন দুজনকে বিশ্বাস করি। দুজন দুজনকে সম্মান করি। অন্যদেরও সম্মান করি। এজন্য মনে করি, এক জীবনে বহু মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। সম্মান পেয়েছি। এখনো পাচ্ছি’, যোগ করেন তিনি। 

সবশেষে ওয়াহিদা মল্লিক জলি বলেন, ‘জীবনে মানুষের ক্ষতি করিনি। মানুষকে সম্মান করেছি, ভালোবেসেছি।’