বরফ এত পিচ্ছিল কেন, যা জানা গেল নতুন গবেষণায়
বরফের ওপর হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ পিছলে পড়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। যদিও স্কেটাররা বরফের ওপর অনায়াসে ছুটে বেড়ায়, তবে গাড়ির চাকা আবার বরফের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, বরফ এত পিচ্ছিল কেন?
অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি জানতেন না! প্রায় ২০০ বছর ধরে বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীরা এর কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন।
অবশেষে জার্মানির একদল গবেষক এই রহস্যের নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে সায়েন্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পুরনো ধারণা কী ছিল
১৮৫০-এর দশকে বিখ্যাত বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে একটি পরীক্ষা করেন। তিনি দেখান, দুটি বরফের টুকরা একসঙ্গে স্পর্শ করালে কিছু সময় পর তারা জোড়া লেগে যায়। ফ্যারাডের ধারণা ছিল, বরফের ওপর খুব পাতলা একটি পানির স্তর থাকে। দুটি বরফ একে অপরকে স্পর্শ করলে সেই পানি আবার জমে তাদের আটকে দেয়।
কিন্তু প্রশ্ন ছিল, সেই পাতলা পানির স্তর কোথা থেকে আসে?
এরপর আরেকজন বিজ্ঞানী জেমস থমসন বললেন, মানুষের পায়ের চাপ বা স্কেটের ব্লেডের চাপে বরফ সামান্য গলে যায়। ফলে পানি তৈরি হয় এবং বরফ পিচ্ছিল হয়ে ওঠে।
কথাটা শুনতে বেশ যুক্তিসংগত মনে হয়। কিন্তু পরে দেখা গেল, মানুষের পায়ের চাপ এত বেশি নয় যে, বরফকে যথেষ্ট গলাতে পারে। তাই রহস্য থেকেই গেল!
পরে বিজ্ঞানীরা বললেন, চাপের সঙ্গে ঘর্ষণের কারণে তৈরি হওয়া তাপও বরফ গলাতে সাহায্য করে। কিন্তু এখানেও সমস্যা ছিল। কারণ অত্যন্ত ঠাণ্ডা আবহাওয়াতেও বরফ পিচ্ছিল থাকে। অথচ তখন ঘর্ষণজনিত তাপ খুবই কম।
নতুন ব্যাখ্যা
সম্প্রতি জার্মানির গবেষক মার্টিন মুসার ও তার সহকর্মীরা কম্পিউটার সিমুলেশনের সাহায্যে বরফের ভেতরে কী ঘটে তা খুঁজে দেখেন।
বরফ আসলে একটি স্ফটিক বা ক্রিস্টাল। এর ভেতরের পানির অণুগুলো সুন্দর ও নিয়মিতভাবে সাজানো থাকে। অনেকটা বিশাল সেনাদলের নিখুঁত সারিতে দাঁড়িয়ে থাকার মতো।
কিন্তু যখন কোনো জুতা, টায়ার বা স্কেট বরফের ওপর স্পর্শ করে, তখন সেই সুশৃঙ্খল বিন্যাসে গোলমাল শুরু হয়।
গবেষকদের ভাষায়, বরফের অণুগুলো তখন ‘ফ্রাস্ট্রেটেড’ হয়ে পড়ে!
শুনতে মজার লাগলেও এর পেছনে আছে জটিল বিজ্ঞান। বরফের অণুগুলো তাদের সঠিক অবস্থান থেকে সরে যেতে শুরু করে। ফলে বরফের ওপরের স্তর আর শক্ত স্ফটিকের মতো আচরণ করে না। বরং তা তরল পানির মতো আচরণ করতে শুরু করে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের জন্য কোনো অতিরিক্ত তাপের প্রয়োজন হয় না।
অর্থাৎ বরফ কিছুটা ‘তাপ ছাড়াই গলে যায়’। এমনটাই বলেছেন জার্মানির গবেষকরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়া এত শক্তিশালী যে, অত্যন্ত কম তাপমাত্রাতেও বরফ পিচ্ছিল হতে পারে। এমনকি প্রায় পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি অবস্থাতেও বরফের ওপর পাতলা তরল স্তর তৈরি হতে পারে। এ কারণেই বরফ কেবল শূন্য ডিগ্রির আশেপাশে নয়, আরও অনেক কম তাপমাত্রাতেও পিচ্ছিল থাকে।
কেবল বরফ নয়!
গবেষকরা আরও দেখেছেন, একই ধরনের ঘটনা হীরা ও সিলিকনের মতো কঠিন পদার্থের ক্ষেত্রেও কিছুটা ঘটতে পারে। তবে বরফের বিশেষত্ব হলো, চাপ বাড়লে এর পৃষ্ঠ আরও সহজে তরলের মতো হয়ে যায়। এ কারণেই স্কেটের ব্লেড বরফের ওপর এত সহজে চলতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে পিছলে যাওয়া থেকে কীভাবে রক্ষা পাব?
বিজ্ঞানীরা মজা করে বলছেন, এর সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো ভালো গ্রিপযুক্ত জুতা পরা! কারণ বরফের পিচ্ছিলতা তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। বরফের অণুগুলো সামান্য স্পর্শেই তাদের সাজানো অবস্থান হারিয়ে ফেলে এবং ওপরের স্তরে তৈরি হয় অতি পাতলা এক তরল আবরণ। আর সেই আবরণই বরফকে সবচেয়ে পিচ্ছিল করে।
সংক্ষেপে মনে রাখার মতো কিছু তথ্য
বরফ কেন পিচ্ছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রায় ২০০ বছর ধরে গবেষণা করেছেন।
আগে মনে করা হতো চাপ বা ঘর্ষণের তাপ বরফ গলিয়ে দেয়।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বরফের অণুগুলোর বিন্যাস নষ্ট হওয়ার কারণেই ওপরের স্তর তরলের মতো আচরণ করে।
এই প্রক্রিয়ার জন্য অতিরিক্ত তাপের প্রয়োজন হয় না।
তাই অত্যন্ত ঠাণ্ডা আবহাওয়াতেও বরফ পিচ্ছিল থাকতে পারে।
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হবে, বরফ পিচ্ছিল হওয়ার কারণ কেবল গলে যাওয়া নয়। বরং এর অণুগুলোর সুশৃঙ্খল বিন্যাস ভেঙে ওপরের স্তরকে তরলের মতো করাই হলো আসল রহস্য।
সূত্র: সায়েন্স নিউজ, নিউ সায়েনটিস্ট, সায়েন্স এক্সপ্লোরার


