নিজেকে অসম্ভব সৌভাগ্যবান মনে করি: অপূর্ব
জিয়াউল ফারুক অপূর্ব—দেশের টেলিভিশন নাটকের শীর্ষস্থানীয় তারকাদের একজন। তার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পুরোটাই যেন সাফল্যের জোয়ারে ভাসছে। ‘বড় ছেলে’সহ অসংখ্য সুপারহিট নাটক উপহার দিয়েছেন তিনি। ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও নিজের শক্ত অবস্থানের প্রমাণ দিয়েছেন। এমনকি ওপার বাংলায় কলকাতার সিনেমায় অভিনয় করেও কুড়িয়েছেন প্রশংসা।
এবারের ঈদে অপূর্বর অভিনীত দুটি নাটক প্রচার হবে। এর মধ্যে একটি তানিম রহমান অংশু পরিচালিত ‘অচেনা আমি’ এবং অন্যটি জাকারিয়া সৌখিন পরিচালিত ‘মায়া পাখি’।
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন এই জনপ্রিয় অভিনেতা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পথচলা, প্রাপ্তি, সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক এবং শিল্পের প্রতি তার ভালোবাসার কথা উঠে এসেছে এই আলাপচারিতায়।
অভিনয়জীবনে এতটা পথ পাড়ি দেওয়ার পর নিজেকে কতটা সৌভাগ্যবান মনে করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে অপূর্ব বলেন, ‘আমি নিজেকে ভীষণ সৌভাগ্যবান অভিনেতা মনে করি। অসম্ভব সৌভাগ্যবান একজন শিল্পী। পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন, কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক মানুষই অন্যের কাছ থেকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পান। গুটি কয়েক মানুষ এই ভালোবাসা ও সম্মান পান। তাদের মধ্যে অভিনয়শিল্পী আছেন, গানের শিল্পী আছেন, খেলাধুলার মানুষেরা আছেন। এ দেশের মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন এবং এখনো দিচ্ছেন, তা সত্যিই বিরল।’
ক্যারিয়ারের শুরুতে সিনিয়র শিল্পীদের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন অপূর্ব। তিনি বলেন, ‘নতুন অবস্থায় আমি বড় বড় তারকার সঙ্গে কাজ করেছি। তারা সবাই আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন। প্রথমেই বলতে হয় গাজী রাকায়েত ভাইয়ের কথা। তার পরিচালনায় কাজ করে শুরুর দিকে অনেক কিছু শিখেছি। সহশিল্পী হিসেবেও তার কাছ থেকে শেখার সুযোগ হয়েছে।’
একটা সময় তারিন ও অপি করিমের বিপরীতে অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক উপহার দিয়েছেন অপূর্ব। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, তারিন আপুর বিপরীতে একটা সময়ে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছি, যা দর্শক দারুণভাবে গ্রহণ করেছিলেন। অপি করিমের সঙ্গেও অনেক নাটক করেছি। মাহফুজ আহমেদ ভাইয়ের সঙ্গেও অনেক কাজ হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই আমি অনেক সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছি।’
পরিচালকদের কথা বলতে গিয়ে চয়নিকা চৌধুরীর নাম আলাদা করে বলেন অপূর্ব। এ ছাড়া ফেরদৌস হাসান রানা ও শিহাব শাহীনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। সমসাময়িক সহশিল্পীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হিল্লোল, মম বা মিলন ভাইয়ের কথা বলতেই হয়। শুটিংয়ের সময় সংলাপ দিতে কোনো সমস্যা হলে তারা আমাকে তা শুধরে দিতেন। একটা শুটিং সেটে এটা অনেক বড় বিষয়।’
প্রায় দেড় দশকের ক্যারিয়ারে অপূর্বর বিপরীতে অনেক নতুন বা জুনিয়র শিল্পী অভিনয় করেছেন। তাদের মুখেও প্রায়ই অপূর্বর প্রশংসা শোনা যায়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জুনিয়রদের প্রতি আমার অগাধ সম্মান ও ভালোবাসা আছে। তারাও আমাকে অনেক সম্মান করেন। আমার জার্নিটা খুব পজিটিভ। তাই আমি যেমন সিনিয়রদের সম্মান করি, তেমনি জুনিয়রদেরও ভালোবাসি। এই ভালোবাসার জায়গাটা আসলে পারস্পরিক সম্মানের।’
পুরোনো দিনের সহশিল্পীদের কথা মনে পড়লে তিনি আজও তাদের ফোন করেন। অপূর্ব বলেন, ‘হঠাৎ করেই অনেক সময় সিনিয়র শিল্পীদের ফোন করি। তাদের যখনই মিস করি, ফোন করে খোঁজ নিই। একসময় তারা প্রচুর কাজ করতেন, এখন হয়তো করছেন না, কিন্তু তাদের মনে পড়ে।’
অনেক বছর আগে ‘ব্যাকডেটেড’ নামের একটি টেলিফিল্ম পরিচালনা করেছিলেন অপূর্ব। এরপর আর কখনো পরিচালনায় আসেননি। এর কারণ জানতে চাইলে তার উত্তর, ‘আমি একজন অভিনেতা এবং অভিনয়কেই ভালোবাসি। মূলত কাজের ব্যস্ততার কারণেই পরে আর পরিচালনা করা হয়ে ওঠেনি।’
দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের প্রসঙ্গে অপূর্ব বলেন, ‘আমাদের একজন গোলাম মুস্তাফা ছিলেন, একজন সৈয়দ আহসান আলী সিডনী ছিলেন। আলী যাকের ছিলেন, আবদুল্লাহ আল মামুন ছিলেন, আতিকুল হক চৌধুরী ছিলেন। এখনো ফেরদৌসী মজুমদার, দিলারা জামান, ডলি জহুর, মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াত, আফজাল হোসেনের মতো মানুষেরা আছেন। তারা প্রত্যেকেই একেকটি প্রতিষ্ঠান। দেশের শিল্পে তাদের এই অবদান ভোলা সম্ভব নয়।’
মাইলফলক ‘বড় ছেলে’
অপূর্বর ক্যারিয়ারে ‘বড় ছেলে’ নাটকটি একটি মাইলফলক, যা দেশের নাটকের ইতিহাসে রেকর্ড গড়েছিল। ওই নাটকের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি বলেন, ‘বড় ছেলে নাটকের কথা মানুষ এখনো বলে। এটা আমার অভিনয়জীবনের অনেক বড় একটি অর্জন। সে সময় অনেক ঘটনা ঘটেছে। অসংখ্য দর্শক দেখা করে তাদের ভালো লাগার কথা জানিয়েছেন। একজন তরুণ আমাকে বলেছিলেন, “আপনার নাটক দেখে শিখেছি, বাবা-মাকে আর কখনো জ্বালাব না।” তখনই বুঝেছিলাম, নাটকটি মানুষের মনে চিরকাল গেঁথে থাকবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ‘পারিবারিক’ ঘরানার নাটক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘আমাদের গল্প’ নাটকের প্রসঙ্গ টানেন। অপূর্ব বলেন, ‘এই নাটকটি দেখার পর আমি পরিচালক মোস্তফা কামাল রাজ ও অভিনেতা ইরফান সাজ্জাদকে ফোন করেছিলাম। এটি আমাদের কাঁদিয়েছে। এটি আমাদের নিজেদের গল্প, ভীষণ ইমোশনাল একটি গল্প।’
এত সব পেশা থাকতে অভিনয়েই কেন এলেন? অপূর্বর উত্তর, ‘পৃথিবীতে খুব কম সৌভাগ্যবান মানুষ আছেন, যারা লাখ লাখ মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সম্মান পান। আমি দেখেছি, অভিনয়শিল্পীরা সেই ভালোবাসা পান। অভিনয়ের প্রতি আমার শুরু থেকেই একটা টান ও ভালোবাসা ছিল, যা এখনো আছে। আর সে কারণেই আমি অভিনয়ে এসেছি।’