হাওরের বুকে ডুবে গেছে স্বপন দাসদের স্বপ্ন

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ধানখেতে চলে যেতেন স্বপন কুমার দাস। সোনালি রোদ পিঠ ছুঁয়ে দিত। কাদাভর্তি দু’পায়ে দাঁড়িয়ে দেখতেন সোনালি ধানে ভরে উঠেছে খেত। কিন্তু সে স্বপ্ন যে এমন দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে তা ভাবতে পারেননি হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের স্বপন কুমার দাস।

টানা কয়েকদিনের বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে স্বপনের ১৭ বিঘা জমির ধান।

স্বপন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রতিবেশী ও মহাজনের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা ধার করেছিলাম। লাজ-লজ্জা ভুলে স্বজনদের কাছেও হাত পেতেছিলাম। আশা ছিল ধান বিক্রি করে শোধ করে দেবো। ফলনও ভাল হয়েছিল। কিন্তু এখন তো সব শেষ।’

স্বপন জানান, চার-পাঁচ দিন বৃষ্টি ঝরেছে। এরপর থেকে একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টি চলেছে। টানা বৃষ্টিতে হাওরের পানি দ্রুত বাড়তে লাগল। গত মঙ্গলবার ভোরবেলা তিনি গিয়ে দেখেন পুরো ১৭ বিঘা জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে।'

পরিশ্রমের ফসলের এমন অবস্থা দেখে স্বপন কাঁদতেও ভুলে গেছেন। বুক সমান পানির মধ্যে নেমে দুহাতে ধানের গোছা তুলে ভাঙা গলায় স্বপন বললেন, ‘আমার যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে।’

হাওরের এই করুণ পরিস্থিতি কেবল স্বপনের একার নয়। আজমিরীগঞ্জের বদলপুর ইউনিয়নের উত্তরহাটী গ্রামের বাতাসে এখন শুধুই পচা ধানের গন্ধ। কয়েকদিন আগেও হাওরের যে মাঠজুড়ে ছিল ফসলের হাতছানি—সেখানে এখন থৈ থৈ জল। কোথাও কোথাও ডুবে যাওয়া ধানগাছের ডগা উঁকি দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।

ধান
ছবি: মিন্টু দেশোয়ারা

উত্তরহাটী গ্রাম থেকে সামান্য দূরেই সদর ইউনিয়নের হাওর তীরবর্তী বিরাট গ্রাম। সেখানেই কথা হয় আরেক কৃষক গিরিন্দ্র দাসের সঙ্গে। তার দুচোখে এখন কেবলই শূন্যতা। নিজের জমির পাশাপাশি মহাজনের কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়ে ২৩ বিঘার জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। গিরিন্দ্র বলেন, ‘কত স্বপ্ন ছিল, মনে মনে কত হিসেব কষেছিলাম। মাত্র তিন বিঘার ধান কাটতে পেরেছি। বাকি জমির সব ফসল এখন পানির তলায়।’

গিরিন্দ্র দাসের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখনও বৃষ্টি থামেনি। গিরিন্দ্র বলেন, ‘এমন এক আবহাওয়া! এই আবহাওয়ায় ধান কাটার শ্রমিকও পাচ্ছি না।’

হাওর জুড়ে এখন এক ভিন্ন দৃশ্যের দেখা মিলছে। বুকসমান পানিতে নেমে কৃষকেরা হাত দিয়ে ধান টেনে টেনে তুলছেন। যেন তারা শেষবারের মতো কিছুটা হলেও ধান ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কালো হয়ে যাওয়া ধান নৌকায় তুলছেন। কদিন ধরেই রোদের কোন দেখা নেই। তাতেও কৃষকের দুশ্চিন্তা বেড়েই চলেছে।

আজমিরীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন হাওরে মোট ১৪ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। উপজেলার বদলপুর, সদর, জলসুখা, শিবপাশা ও কাকাইলছেও ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রেজাউল করিম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে শ্রমিক সরবরাহে জনপ্রতিনিধিসহ সবাইকে নিয়ে জরুরি সভা করা হয়েছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড হবিগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টায় মাঝারি থেকে হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। খোয়াই ও সুতাং নদীর পানি কমলেও আজমিরীগঞ্জ অংশে কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।’