এক মাসের বৃষ্টি তিন দিনে: মৌলভীবাজারে বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা

নিজস্ব সংবাদদাতা, মৌলভীবাজার

এক মাসে যেখানে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা, সেখানে গত তিন দিনেই তা ঝরেছে। অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে মৌলভীবাজারের কয়েকটি উপজেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে গেছে। প্লাবিত হয়েছে কয়েকটি গ্রাম এবং হাওরের পাকা বোরো ধান।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, ‘এ মৌসুমে যেখানে এক মাসে প্রায় ৩০০ মিমি বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা, সেখানে গত এক মাসে জেলায় প্রায় ৫৩০ মিমি বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত তিন দিনেই প্রায় ৩০০ মিমি বৃষ্টি হয়েছে, অর্থাৎ সারা মাসের বৃষ্টি মাত্র তিন দিনেই ঝরেছে।’

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া কার্যালয়ের পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান জানান, ২ মে সকাল ৬টা থেকে ৩ মে সকাল ৬টার মধ্যে ৫৩ মিমি এবং গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৪ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

হাওর
ছবি: স্টার

কমলগঞ্জে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলের চাপে লাউয়াছড়া খালের একটি বাঁধ ধসে পড়ে আদমপুর ইউনিয়নের অন্তত দুটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক দিনের একটানা বৃষ্টির কারণে বাঁধ ভেঙে গেলে প্রবল স্রোতে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা নীলমণি সিংহ বলেন, ভানুবিল ও ছড়াগাঁও গ্রামের কিছু অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং চাওগাঁও-ভানুবিল ইটের রাস্তাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। গ্রামের বেশ কয়েকটি রাস্তা জলমগ্ন থাকায় বাসিন্দাদের হাঁটুসমান পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগী মোস্তাফিজ ও সাদেক মিয়া অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের পূর্বাভাস ছাড়াই হঠাৎ ঢলের পানি তাদের বাড়িঘরে ঢুকে পড়েছে এবং জিনিসপত্রের ব্যাপক ক্ষতি করেছে।

আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য রোশন আলী বলেন, ‘প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকার রাস্তাঘাটও ভেঙে গেছে। বিষয়টি আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ভানুবিল ও চানগাঁও গ্রাম জলমগ্ন হওয়ার খবর আমরা পেয়েছি। প্রশাসন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

হাওর
ছবি: স্টার

এদিকে জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার হাওর এলাকায় ক্রমাগত পানি বৃদ্ধি এবং একটানা বৃষ্টির মধ্যে কৃষকেরা বোরো ধান কাটতে হিমশিম খাচ্ছেন।

হাকালুকি হাওর এলাকার কৃষক সুকমল রায় বলেন, ‘পানিতে দাঁড়িয়ে থেকে কিছু ধান কাটতে পারলেও সব ফসল বাঁচাতে পারিনি। আমার দুই বিঘারও বেশি জমি এখনো পানির নিচে। বৃষ্টি থামছে না, আবার শ্রমিকও পাচ্ছি না। আমি প্রায় আশাই ছেড়ে দিয়েছি।’

স্থানীয় চা বিক্রেতা সাজু আলম তার ঘরের ভেতরে ধান দেখিয়ে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে রোদ নেই, ধান শুকাতে পারছি না। প্রথমে পানি ক্ষতি করেছে, এখন বাকিটা নষ্ট করে দিচ্ছে বৃষ্টি।’

হাওর অঞ্চলজুড়ে অনেক কৃষকই একই রকম পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। টানা বৃষ্টির কারণে আগে কাটা ধান শুকানো যায়নি। অন্যদিকে মাঠের ধান পানিতে ডুবে যাচ্চে। বজ্রপাতের ঝুঁকির কারণে শ্রমিকেরা হাওরে কাজ করতে আগ্রহী না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

কিছু এলাকায় কৃষকদের ডুবে যাওয়া খেত থেকে ধান কেটে নৌকায় করে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। আবার অনেকেই ধান কেটে আটি বেঁধে পানিতেই ভাসিয়ে রেখেছেন পরে তুলে নেওয়ার আশায়।

হাওর
ছবি: স্টার

বেলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা সাদেক ইসলাম বলেন, ‘এ বছর ফসল ভালো হয়েছিল, কিন্তু মানুষ তা বাড়িতে আনার সময় পেল না।’

জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান বলেন, চলতি মৌসুমে জুড়ীতে ৬ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওর এলাকার অনেক ফসল ডুবে গেছে। প্রায় ২ হাজার ২৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সরকারি সহায়তা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, কুলাউড়ায় ৮ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ৩৮০ হেক্টর জমি ইতিমধ্যে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২ হাজার ৮০০ কৃষককে সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।