পাম্প থেকে পাম্পে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা...
‘ঈদে বাড়িতে যাই না। এই সময় বাইকের চাহিদা থাকে। আমরা যারা রাইড শেয়ার করি, এই সময় দৈনিক প্রায় ৫ হাজার টাকা আয় করতে পারি। তাই একেবারে ঈদ শেষে বাড়িতে যাই। কিন্তু এবার তেল সংকটের কারণে প্রত্যাশিত সেই আয় হয়নি। তাই এখনো বাড়ি যাওয়া হয়নি।’
দ্য ডেইলি স্টারকে কথাগুলো বলছিলেন আব্দুল আলিম। রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা আলিম ৬ জনের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ঢাকার উত্তরার আজমপুরে একটি মেসে থাকেন তিনি। স্ত্রী ও ৩ সন্তানসহ পরিবারের বাকিরা থাকেন গ্রামের বাড়িতে।
প্রায় ৫ ঘণ্টা অপেক্ষার পর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিতে পারেন আলিম। ‘সকালে উত্তরা থেকে একটা ট্রিপ নিয়ে মহাখালী আসি। সেখান থেকে তেল নিতে ট্রাস্টে এসে লাইন ধরি। তেলের এই সংকট চলতে থাকলে আমার আয় তো একেবারে কমে যাবে। পরিবার নিয়ে বিপদে পড়তে হবে।’
বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন, মহাখালীর ক্লিন ফুয়েল ফিলিং স্টেশন, পরিবাগ মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারসহ রাজধানীর অন্তত ১০টি পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও তেল নেই, তাই পাম্প বন্ধ। কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে, দুয়েকটি পাম্প চাহিদামতো তেল সরবরাহ করছিল।
দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে মহাখালীর ক্লিন ফুয়েল ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, মোটরসাইকেলের জন্য ৩০০ টাকার বেশি তেল বিক্রি করছেন না। সেখানে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী মামুনুর রশীদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রায় আধঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। আশা করছি আরও ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে তেল নিতে পারব। এখানে ৩০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। এটা আমাদের জন্য একটু ভোগান্তি হচ্ছে।’
নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল বিক্রি করায় লাইনে থাকা আরও কয়েকজনও প্রশ্ন তুললেন, সরকার থেকে যেহেতু এখন কোনো সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া নেই, তাহলে তারা কেন এভাবে বিক্রি করছে?
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ক্লিন ফুয়েলের স্টেশন ইনচার্জ নুর আমিন খান ডেইলি স্টারকে বলেন, আমরা সার্বক্ষণিক পাম্প চালু রাখার চেষ্টা করি। তেল সংকটের কারণে সকালে কিছু সময় আমাদের পাম্প বন্ধ ছিল। তেল আসার পর থেকে আবার চালু হয়েছে। আমাদের এখানে দৈনিক ২৫-৩০ হাজার লিটার তেলের চাহিদা। এখন পাচ্ছি ১৩ থেকে সাড়ে ১৩ হাজার লিটার। সেই কারণেই আমরা নির্দিষ্ট পরিমাণের বাইরে দিচ্ছি না, যাতে অল্প করে হলেও বেশি মানুষকে দিতে পারি।
বিকেল ৪টার দিকে ট্রাস্টে গাড়ির লাইনে অপেক্ষায় ছিলেন প্রাইভেটকারচালক মাহবুবুর রহমান। তিনি যার গাড়ি চালান, তার বাসা আদাবর। সকাল ১০টায় এসে লাইনে দাঁড়ান মাহবুব। বিকেল নাগাদও তেল পাননি, অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বলেন, মাঝে তেল দেওয়া বন্ধ থাকায় সিরিয়াল ধীরে এগোচ্ছে। যার গাড়ি চালাই, তিনিও অনেকবার ফোন করে খোঁজ নিচ্ছেন। কারণ তেল নিয়ে গেলে তিনি পরিবারসহ বেরোনোর কথা ছিল। কিন্তু আমি এখনো অপেক্ষায়।’
পরীবাগে মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে কথা হয় মিরপুর-১২ নম্বরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, শ্যাওড়াপাড়ার দুটি স্টেশনে তেল না পেয়ে ট্রাস্টে গিয়ে লাইন ধরি। এক ঘণ্টা সেখানে অপেক্ষো করে পরে এখানে আসি। আমার সিরিয়াল যখন কাছে এলো, সেই সময় ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়। পরে নির্ধারিত সময় ৭টার দিকেই তারা পাম্প বন্ধ করে দেয়। এরপর পাশের পূর্বাচল ট্রেডার্স পাম্পে গিয়ে ১৫ মিনিটের সিরিয়াল ধরে তেল পাই।
পূর্বাচল ট্রেডার্সের সেল সুপারভাইজার আশরাফুজ্জামান দুলাল ডেইলি স্টারকে জানান, তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় সোমবার রাত ২টার দিকে তাদের পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। কিছু তেল আসায় আজ সন্ধ্যা থেকে আবার তেল দেওয়া শুরু করেছেন তারা।
দুপুরে গিয়ে বন্ধ পাওয়া যায় বেগম রোকেয়া সরণির মেসার্স সোবহান ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিস স্টেশন। কথা হয় সেখানকার কর্মকর্তা মাসুদ সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের দৈনিক চাহিদা সাড়ে ৮-৯ হাজার লিটার। কিন্তু এখন আমরা সাড়ে ৪ হাজার লিটারের বেশি তেল পাচ্ছি না। পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো দিয়ে দেই। তেল না থাকলে আমাদের বন্ধ রাখতে হয়। আজকে সকাল থেকেই বন্ধ। রাতে তেল পেলে আবার চালু হবে।’
বেসরকারি চাকরিজীবী রাজিবুল হাসান বলেন, আমার বাসা শনির আখড়া। আমার বাইকের তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় সকাল থেকেই ঘুরছি। ৭টা পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে পরে ট্রাস্টে এসে পেলাম।
ট্রাস্ট এনার্জির সহকারী পরিচালক মেজর (অব.) আবুল আলা মুহাম্মাদ তৌহিদ ডেইলি স্টারকে বলেন, আমরা যে পরিমাণ তেল পাওয়ার কথা, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তারচেয়ে কম পাচ্ছি। কিন্তু যে পরিমাণই পাই, তাৎক্ষণিকভাবে আমরা তা গ্রাহকের মাঝে বিতরণ করে দিই। তেল দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কোনো ধরনের রেশনিং করছি না। যেহেতু সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো নির্দেশনা নেই। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আমাদের এখানে তেল নিতে আসেন। তাই তাদের যতটুকু প্রয়োজন, আমরা দিয়ে দেই। যখন আমরা মনে করি স্টক ফুরিয়ে যাওয়ার পথে, তখন যারা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাদের আমরা জানিয়ে দেই লাইনের কতটুকু পর্যন্ত তেল দেওয়া যাবে।
‘আজকেও সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত আমরা তেল দিতে পেরেছি। তারপর কিছু সময় বন্ধ রেখেছি। এখন দুপুর আড়াইটা থেকে আবার তেল দেওয়া শুরু করেছি। আশা করি আজকে সারারাত তেল দিতে পারব। কিন্তু পরবর্তীতে হয়তো আমাদের রাতের বেলা বন্ধ রাখতে হবে। কারণ যে পরিমাণ তেল আমরা এখন পাচ্ছি, তা দিয়ে ২৪ ঘণ্টা আমাদের এই ফিলিং স্টেশন চালু রাখা সম্ভব হবে না।’