এক্সপ্লেইনার

ট্রাম্পের সফরসঙ্গী শীর্ষ মার্কিন ব্যবসায়ীরা কে কী চান চীনে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরে বেশি কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা রয়েছেন। সফরে ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছে, বুধবার বেইজিংয়ে পৌঁছে ট্রাম্প দলটিকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে শি জিনপিংকে বলেন, তারা সবাই মার্কিন ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং চীনকে সম্মান ও গুরুত্ব দেন।

দলটি শি জিনপিংকে জানায়, তারা চীনের বাজারকে মূল্যায়ন করে ও সেখানে আরও ব্যবসা করতে চায়।

জবাবে চীনা প্রেসিডেন্ট পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতাকে স্বাগত জানান। বলেন, মার্কিন কোম্পানিগুলোর চীনে আরও বিস্তৃত সম্ভাবনা রয়েছে।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

 

এই সফরটি এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে।

গত বছর ট্রাম্পের অধিক শুল্ক আরোপের পর পাল্টাপাল্টি শুল্ক ১০০ শতাংশেরও বেশি পৌঁছে যায়। এবার দুই নেতা ১ বছরের শুল্ক যুদ্ধবিরতি এবং চীনের বিরল খনিজ রপ্তানি সংক্রান্ত চুক্তি সম্প্রসারণের বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। গত বছরের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় তাদের শেষ বৈঠকে হয়েছিল।

গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে লাল গালিচায় ফুল ও পতাকা দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। এ সময় তার পেছনে হাঁটছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এই সফরকে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে সম্ভাব্য ব্যবসায়িক চুক্তির একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্রাম্পের সফরসঙ্গী কারা?

এই প্রতিনিধিদলটি মূলত মার্কিন শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে গঠিত। তারা বেইজিংয়ের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুর সমাধান চাইছেন।

ট্রাম্পের সফরসঙ্গীদের মধ্যে স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক, অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক ও গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রধান নির্বাহী ডেভিড সলোমনসহ শীর্ষ ব্যবসায়ীরা রয়েছেন।

গত বছর ট্রাম্পের সঙ্গে বাগযুদ্ধের পরও এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে চীনে গেছেন মাস্ক। ওই সময় মাস্ক দাবি করেন, ট্রাম্প কুখ্যাত যৌন অপরাধী  জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপলে’ ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ইলন মাস্ক। ছবি: রয়টার্স
বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপলে’ ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ইলন মাস্ক। ছবি: রয়টার্স

 

এই ধনকুবের ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত ট্রাম্পের সরকারি দক্ষতা বিভাগের (ডিওজিই) প্রধান ছিলেন। পরে তিনি পদত্যাগ করেন। বিতর্কিত এই অস্থায়ী সংস্থাটি নভেম্বরে বন্ধ হয়ে যায়।

এছাড়া রয়েছেন—বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরকের চেয়ারম্যান ও সিইও ল্যারি ফিঙ্ক, সিটির প্রধান নির্বাহী জেন ফ্রেজার, ব্ল্যাকস্টোনের প্রধান নির্বাহী স্টিফেন সোয়ার্জম্যান এবং বোয়িংয়ের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কেলি ওর্টবার্গ।

এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং ছিলেন শেষ মুহূর্তে যুক্ত হওয়া চমকপ্রদ নাম। তিনি আলাস্কায় যাত্রাবিরতির সময় এ সফরে যোগ দেন।

বেইজিংয়ের এই রাষ্ট্রীয় সফরে আরও আছে মেটা, কারগিল, ভিসা, সিসকো, কোয়ালকম, কোহেরেন্ট, মাইক্রন, জিই অ্যারোস্পেস, ইলুমিনা ও মাস্টারকার্ডসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ট্রাম্পের চীন সফরে সিইওরা কেন?

বেইজিংয়ে ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপলে’ আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার পর ট্রাম্পের সফরসঙ্গীরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।

টেসলার সিইও মাস্ক বলেন, আমি চীনে অনেক ভালো কাজ করতে চাই।

এনভিডিয়ার সিইও হুয়াং বলেন, চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

অনেক কোম্পানিরই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে।

মার্কিন শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আমদানি-রপ্তানি ও উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন বৈশ্বিক বিরল খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান পর্যন্ত প্রযুক্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গত বছরের এপ্রিলে চীন ১২টি নির্দিষ্ট বিরল খনিজের মধ্যে ৭টির রপ্তানি সীমিত করে। পরে আরও ৫টির রপ্তানি সীমিত করার পরিকল্পনার কথা জানায়।

অক্টোবর মাসে ট্রাম্পের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে দ্বিতীয় দফার ওই ৫টির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।

রয়টার্সের মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাস্ক চীনা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সৌর প্যানেল উৎপাদনের জন্য ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের যন্ত্রপাতি কেনার আশা করছেন। তবে চীন যদি যুক্তরাষ্ট্রে উন্নত প্রযুক্তি রপ্তানি সীমিত করে, তাহলে বিষয়টি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

চীন মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি টেসলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। তিনি বর্তমানে চীনা নিয়ন্ত্রকদের কাছ থেকে টেসলার ফুল সেলফ-ড্রাইভিং সিস্টেম সম্প্রসারণের অনুমোদন চাইছেন। ২০১৮ সালে টেসলা প্রথম বিদেশি গাড়ি কোম্পানি হিসেবে স্থানীয় অংশীদার ছাড়াই চীনে উৎপাদন কারখানা স্থাপনের অনুমতি পায়।

টেসলা প্রতি বছর সাংহাই গিগাফ্যাক্টরি থেকে বিপুল সংখ্যক গাড়ি উৎপাদন করে, যা তাদের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক রপ্তানি কেন্দ্র। আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ৪ মাসে সাংহাই কারখানা ২ কোটি ৯২ লাখ ৮৭৬টি গাড়ি বিক্রি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

অ্যাপলের বিদায়ী সিইও টিম কুক গত সেপ্টেম্বরে ১৫ বছরের দায়িত্ব শেষ করার ঘোষণা দেন। তার কোম্পানিও আইফোন উৎপাদনের জন্য বিদেশি উৎপাদনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অ্যাপলের সিইও টিম কুক। ছবি: এএফপি
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অ্যাপলের সিইও টিম কুক। ছবি: এএফপি

 

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপল প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৬ কোটিরও বেশি আইফোন বিক্রি করে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই চীনে তৈরি। গত বছর ট্রাম্প ডিভাইসটির ওপর শুল্ক আরোপ করেন এবং উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে সরানোর চাপ দেন। তবে কুক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য নির্ধারিত আইফোনের উৎপাদন ভারতসহ অন্য দেশে সরিয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুল্ক কমাতে সক্ষম হন।

অন্যদিকে, এনভিডিয়ার হুয়াং বেইজিংয়ে রয়েছেন তার কোম্পানির ‘এইচ২০০’ চিপ চীনে বিক্রির ওপর থাকা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের আশায়।
 
এ বছরের শুরুতে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপের আগে এনভিডিয়া চীনের উন্নত চিপ বাজারের প্রায় ৯৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত। হুয়াং আগে ধারণা করেছিলেন, চীনের এই বাজারের মূল্য এ বছর ৫০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।

জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন এইচ২০০ এআই চিপ চীনে রপ্তানির অনুমতি দিলেও নতুন নিরাপত্তা শর্ত আরোপ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তরের ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটি নতুন নিয়মে বলেছে, এনভিডিয়াকে আগে যুক্তরাষ্ট্রে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং চীনে রপ্তানির আগে তৃতীয়পক্ষের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংও চীনের সঙ্গে বড় ধরনের ব্যবসার চেষ্টা করছে।

ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, চীন প্রায় ৫০০টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স এবং আরও ১০০টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৭৭এক্স উড়োজাহাজ কেনার বিষয় বিবেচনা করছে।

কোম্পানির সিইও অর্টবার্গ আশা করেছেন, ট্রাম্প-শি চুক্তিতে কিছু উড়োজাহাজ অর্ডার অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

সিইওদের নিয়ে ট্রাম্প কী অর্জন করতে চাইছেন?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চীনের কাছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য অর্থনীতি আরও উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি চাইছেন। একইসঙ্গে তিনি সিলিকন ভ্যালির সমর্থন বাড়াতে চান, কারণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনার মধ্যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে।

ট্রাম্প আগামী নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে চান।

স্বাধীন চীন বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু লেউং আল জাজিরাকে বলেন, শীর্ষ মার্কিন সিইওদের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্পকে এমন কিছু অর্জন করে ফিরতে হবে, যা তিনি রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরতে পারবেন। যেমন চীনে মার্কিন কোম্পানির জন্য বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি। বিশেষ করে সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় তার জনপ্রিয়তা এখন চাপের মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন, এর বিনিময়ে চীন শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার, চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, উন্নত সেমিকন্ডাক্টরে বেশি প্রবেশাধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা বিনিয়োগের সুযোগ চাইবে। যদি এর জন্য কিছু বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করতে হয়, তাহলে সেখানে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমও বাড়তে পারে।