শামসুল আলম নেই, তবুও আছেন
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে অধ্যাপক এম শামসুল আলম যেন এক অনিবার্য নাম। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির গণশুনানি বয়কট করে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন, কিন্তু পুরো শুনানি জুড়েই বারবার আসে তার নাম। তিনি না থাকায় যেন পুরো আয়োজন কিছুটা অসম্পূর্ণ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ (পিডিবি) বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির জন্য চলতি মে মাসের শুরুর দিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে আবেদন করে।
এর ধারাবাহিকতায় আজ বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী এই শুনানি শুরু হয়েছে।
আজ পিডিবির পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম এবং পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সঞ্চালন চার্জ নির্ধারণের গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
আগামীকাল খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের শুনানি হবে।
পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পিডিবি। এই প্রস্তাবের বিপক্ষে আলোচনায় অংশ নেন অন্তত ১৫-১৬ জন , যাদের মধ্যে শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও বিভিন্ন ভোক্তা অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা ছিলেন।
সেখানে উপস্থিত অন্তত ৮ জন অধ্যাপক শামসুল আলমের অনুপস্থিতিতে আয়োজন প্রাণ হারাচ্ছে বলে মত প্রকাশ করেন। বিইআরসি চেয়ারম্যানও এই অধ্যাপককে 'মিস' করার কথা জানান।
অধ্যাপক আলম বর্তমানে বেসরকারি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন। পাশাপাশি কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক দীর্ঘ সময় ধরে দেশের জ্বালানি খাতে ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন।
আজ শুনানি পর্বের শুরুতেই বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ ক্যাবের প্রতিনিধির বক্তব্য শুনতে চান এবং বলেন, কমিশন সবসময় ক্যাবের বক্তব্য প্রাধান্য দেন।
এ সময় ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমের এখানে উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগের অনেক গণশুনানিতে তিনি কার্যকর কোনো ফল না পেয়ে গণশুনানি বর্জন করেছেন।
তিনি আরও জানান, ক্যাবের পক্ষে সংগঠনের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন। এর বাইরে তার কিছু বলার নেই।
পরে বিইআরসি চেয়ারম্যান ক্যাব সভাপতির লিখিত বক্তব্যের একাংশ পড়ে শোনান।
লিখিত বক্তব্যে ক্যাব সভাপতি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশের ভোক্তারা এর পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন না। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়।
'বিদ্যুৎ খাতে অদক্ষতা, সিস্টেম লস, বিলম্বিত প্রকল্প, অতিরিক্ত ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় এবং ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো উচিত নয়। এসব খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন,' বলেন ক্যাব সভাপতি।
এর সঙ্গে বিইআরসি চেয়ারম্যান যুক্ত করেন, 'আমিও এসব বক্তব্যের সঙ্গে একমত।'
পরে বক্তব্য দেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা ও উদ্যোক্তা অনুষদের সহযোগী ডিন অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান। তিনি নিজেকে অধ্যাপক আলমের 'শিষ্য' হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ক্যাব এই গণশুনানির প্রক্রিয়া বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এর সম্মানে অধ্যাপক আলম এখানে আসেননি।
মিজানুর বলেন, 'দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে একটি কথা বারবার বলা হচ্ছে—দাম না বাড়ালে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। সরকার ভর্তুকি কোথা থেকে দেয়? ভোক্তার টাকা দিয়েই কিন্তু ভর্তুকি দেওয়া হয়। সবাই শুধু সরকারের মুনাফা নিয়েই ভাবছে, অথচ মানুষ যে মরে যাবে, তার কোনো খেয়াল নেই।'
তিনি বলেন, 'বিগত দিনে আইনের দোহাই দিয়ে সবচেয়ে বেশি বেআইনি কাজ করা হয়েছে। এ কাজে সহায়তা করেছে বিইআরসি। আপনাদের এখনো সতর্ক হওয়ার সময় আছে। আপনাদের দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে।'
'৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। অথচ, বিইআরসি কোনো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেল না। আপনারা বলেন যে, আইন অনুযায়ী ক্ষমতা নেই। যেখানে সংবিধান পরিবর্তনের মতো কথা উঠতে পারে, সেখানে বিইআরসি আইন পরিবর্তন কেন সম্ভব হবে না?' প্রশ্ন রাখেন তিনি।
অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান আরও বলেন, 'আপনারা মানুষের পক্ষ না নিয়ে যারা অবৈধভাবে এসব প্রস্তাব দিচ্ছে, তাদের পক্ষ নিচ্ছেন। আপনাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, এখান থেকে সরে আসুন। সরে না আসলে আপনারা একসময় গণশত্রুতে পরিণত হবেন।'
এ পর্যায়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, তিনি ১৯৯৯ সাল থেকে জ্বালানি খাতে কাজ করছেন। তখন থেকেই অধ্যাপক শামসুল আলমকে চেনেন। তার মতো নিবেদিতপ্রাণ মানুষ এই খাতের জন্য খুবই কম আছে।
'অধ্যাপক আলম থাকলে এই অনুষ্ঠান আরও প্রাণবন্ত হতো' উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'তাকে আমরা আজ "মিস" করছি।'
শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, আজকের শুনানির সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অধ্যাপক শামসুল আলম আসেননি। কারণ, বিইআরসি তাদের আইনের আড়ালে জনস্বার্থ এড়িয়ে যায়।
'আইন অনুযায়ী বিইআরসি দাম কমানোর সুপারিশ গ্রহণ করতে পারে না। আমরা চাই আইন পরিবর্তন করে বিইআরসি দাম বাড়ানো নয়, বরং দাম কমানোর সুপারিশ নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করুক। সেখানে আমরা ভোক্তারা তথ্য-প্রমাণসহ শুনানিতে অংশ নেব। প্রমাণ করব, দাম বাড়ানো তো দূরের কথা, বিদ্যুৎ খাতে দাম কমানো সম্ভব। যদি হেরে যাই, তবে সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেব,' বলেন তিনি।
এ ছাড়া শুনানিতে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ, সিকিউরিটি সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের শাহ আলম সরকার, সাংবাদিক শুভ কিবরিয়াসহ আরও একাধিক বক্তা অধ্যাপক এম শামসুল আলমের নাম উল্লেখ করেন।
এর আগে অধ্যাপক এম শামসুল আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, বর্তমান গণশুনানি প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে ভোক্তাদের কোনো বাস্তব সুফল মিলছে না বলেই শুনানি বর্জনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, বিইআরসি মূলত বিতরণ ও উৎপাদন কোম্পানিগুলোর দেওয়া ব্যয়ের হিসাবের ভিত্তিতেই দাম বাড়ায়, কিন্তু সেই ব্যয় যৌক্তিক কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করে না।



