দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবনে শুরু কাঁকড়া আহরণ

নিজস্ব সংবাদদাতা, সাতক্ষীরা

প্রজনন মৌসুমে টানা দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবনে আবারও শুরু হয়েছে কাঁকড়া আহরণ।

আজ রোববার সকাল থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের নিবন্ধিত জেলেরা নতুন আশায় নৌকা-জাল নিয়ে নেমেছেন সুন্দরবনের নদী-খালে।

দুপুর ২টা পর্যন্ত ১১৫টি নিবন্ধিত নৌকায় প্রায় ৩০০ জন জেলে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে কাঁকড়া আহরণে যান। দীর্ঘ বিরতির পর পেশায় ফিরতে পেরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন তারা।

কাঁকড়ার প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতিবছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে আহরণ বন্ধ রাখা হয়। এ বছরও ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা ছিল। নিয়মিত এই বিরতি কাঁকড়ার বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক হলেও বননির্ভর পরিবারগুলোর জন্য তা নিয়ে আসে অর্থকষ্টের দিন।

শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন দাতিনাখালীর জেলে মনোরঞ্জন মুন্ডা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরেই আমার পাঁচজনের সংসার চলে। অন্য কাজ জানি না, এলাকাতেও কাজ নেই। দুই মাস বসে থাকতে হয়েছে। সংসার চালাতে মহাজনের কাছ থেকে সুদে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। এখন বনে যেতে পারলে ঋণ শোধ করতে পারব।’

বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের কোরবান গাজী বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার দুই মাস খুব কষ্টে গেছে। কোনো রকমে সেহরি-ইফতার করেছি। মাছ ধরা বন্ধের সময় জেলেদের প্রণোদনা দেওয়া হয়, কিন্তু কাঁকড়া ধরার ক্ষেত্রে তা নেই। ধার করে চলতে হয়েছে। সামনে ঈদ-কাঁকড়া ভালো পড়লে ঋণ শোধ করে বাচ্চাদের নিয়ে ভালোভাবে ঈদ আনন্দ করতে পারব।’

আজ সকাল ১১টার দিকে বুড়িগোয়ালিনী জেলেপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, চুনকুড়ি নদীর তীরজুড়ে প্রস্তুতির ব্যস্ততা। নৌকায় তোলা হচ্ছে দোন-দড়ি, খাঁচা, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম। কয়েক দিনের বন যাত্রার জন্য চাল-ডাল ও শুকনো খাবারও গুছিয়ে রাখা হয়েছে। অনুমতিপত্র হাতে নিয়ে দলবেঁধে বনের দিকে রওনা হচ্ছেন জেলেরা।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে নিবন্ধিত নৌকার সংখ্যা ২ হাজার ৯০০টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৬০০টি কাঁকড়া ধরার নৌকা। প্রতিটি নৌকায় তিনজন করে জেলে হিসেবে মোট ৪ হাজার ৮০০ জন নিবন্ধিত জেলে এ পেশায় যুক্ত।

বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কৈখালী ও কবাদক-এই চারটি স্টেশন নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা রেঞ্জ। সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ, কাঁকড়া, মধু সংগ্রহসহ বিভিন্ন পেশার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল সুন্দরবন ও তার সম্পদের ওপর।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পুষ্পকাটি, মান্দারবাড়িয়া, নটাবেঁকি ও হলদেবুনিয়া এলাকা অভয়ারণ্য। এ ছাড়া দোবেকী ও কাঁচিকাটার ৫২ শতাংশ অংশ সংরক্ষিত। ছোট কেয়াখালী, বড় কেয়াখালী, খোলশিবুনিয়া ও সাপখালীসহ ২৫ ফুটের কম প্রশস্ত খালে সারা বছর কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ।

পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মসিউর রহমান বলেন, ‘কাঁকড়ার প্রজনন ও বৃদ্ধির স্বার্থে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাস আহরণ বন্ধ ছিল। আজ ১ মার্চ থেকে অভয়ারণ্য বাদে অন্য নদী-খালে অনুমতি নিয়ে জেলেরা কাঁকড়া ধরতে যাচ্ছে। তবে কেউ যাতে বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে, সে জন্য টহল জোরদার করা হয়েছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারে কাঁকড়া পরিবহনের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।’

তিনি জানান, ১৯৯৮ সালে কাঁকড়া রপ্তানি নীতিমালা প্রণয়নের পর থেকে নিয়মিত এই দুই মাসের বিরতি পালন করা হচ্ছে। এতে কাঁকড়ার প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত হয় ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়। তবে প্রকৃতির এই প্রয়োজনীয় বিরতি বননির্ভর মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তার ছায়াও ফেলে। 

ঋণ, দুশ্চিন্তা আর প্রতিকূলতার মাঝেও নতুন মৌসুমের প্রথম দিনে শ্যামনগরের জেলেদের চোখে ছিল আশার ঝিলিক। সুন্দরবনের জল-জঙ্গলে হয়তো আবারও মিলবে জীবিকার স্বস্তি।