কতটা টালমাটাল প্রকৃতির ক্যালেন্ডার

স্টার অনলাইন ডেস্ক

‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই চিরচেনা পঙ্‌ক্তি ঋতুরাজ বসন্তের অনিবার্য আগমনের কথা বলে।

কিন্তু ফুল কি আসে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে? প্রকৃতির ক্যালেন্ডার কি হারিয়ে ফেলছে তার নিজস্ব ছন্দ? ফুল ফুটবে কি না, ফুটলেও ঠিক সময়ে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও বৈশ্বিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করছে।

বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ২০০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে ফুল ফোটার সময় নাটকীয়ভাবে বদলে যাচ্ছে। 

ঋতুচক্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে ফুল একসময় নির্দিষ্ট সময়ে ফুটত, এখন অনেকগুলোই ফুটছে দুই সপ্তাহ আগে, আবার কিছু কিছু ফুটছে দেরিতে। ঋতু এসে দাঁড়ালেও ফুল আর ঠিক সময়ে সাড়া দিচ্ছে না।

ট্রপিকাল ফুল

গবেষকেরা বলছেন, সময়ের এই অমিল এখন শুধু ফুল ফোটার ক্ষেত্রে চোখে পড়লেও ভবিষ্যতে এর প্রভাব পরাগায়ন, ফলন ও জীববৈচিত্র্যসহ পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়বে।

‘প্লস ওয়ান’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কলরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুবিদ্যা ও বিবর্তনবিষয়ক জীববিজ্ঞান বিভাগের গবেষকেরা। তারা জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রায় ৮ হাজার উদ্ভিদের নমুনা ব্যবহার করে ১৭৯৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেন, উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে ফুল ফোটার সময় গড়ে প্রতি দশকে প্রায় দুই দিন করে বদলাচ্ছে।

ব্রাজিলের ফুল

 

গবেষকেরা ব্রাজিল, ইকুয়েডর, ঘানা ও থাইল্যান্ডসহ জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম গবেষণা করা অঞ্চলগুলো থেকে মোট ৩৩টি প্রজাতি শনাক্ত করেন। তারা দেখেন, কোনো কোনো প্রজাতির ক্ষেত্রে ফুল ফোটার সময়ের পরিবর্তন প্রতি দশকে মাত্র শূন্য দশমিক ০৩৭ দিন, আবার কোথাও তা ১৪ দিন পর্যন্ত পৌঁছেছে।

পরিবর্তনের চিত্র কখনো ফুল ফোটার সময় এগিয়ে যাওয়ার, আবার কখনো পিছিয়ে পড়ার। যেমন—ব্রাজিলের অ্যামারান্থ গাছ ১৯৫০ সালে যে ঋতুতে ফুল দিতো, এখন তা প্রায় ৮০ দিন পর ফুটছে। আবার ঘানার র‍্যাটলপড গুল্মের ফুল ফোটার সময় ৫০ থেকে ৯০ এর দশকের মধ্যে প্রায় ১৭ দিন এগিয়েছে।

ঘানার ফুল

 

গবেষকদের মতে, প্রজাতি ও পরিবেশভেদে একইসঙ্গে ফুল ফোটার সময় এগিয়ে ও পিছিয়ে দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন।

একসময় ধারণা করা হতো, উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা ওঠা-নামা তুলনামূলক কম হওয়ায় সেখানে ফুল ফোটার সময় এতটা বদলাবে না।

এ বিষয়ে প্রধান গবেষক কলরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্কাইলার গ্রেভস বলেন, ‘সেই ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। এখন পৃথিবীর এমন কোনো স্থান নেই, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবমুক্ত।’

এই পরিবর্তনকে বিজ্ঞানীরা দেখছেন ‘ক্যাসকেডিং ইমপ্যাক্ট’ বা ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি হিসেবে। কারণ ফুল ফোটার সময়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে ফল ধরা, বীজ ছড়ানো ও পরাগায়ন।

উদাহরণ হিসেবে গবেষকেরা পরাগায়ন প্রক্রিয়া তুলে ধরেন। তারা জানান, কোনো ফুলের পরাগায়ন নির্ভর করে পরিযায়ী বা অতিথি পাখির ওপর। পাখিটি বছরে মাত্র কয়েক দিনের জন্য ওই অঞ্চলে আসে। যদি ফুল ফোটার সময় বদলে গিয়ে পাখির আগমনের সঙ্গে আর না মেলে, তাহলে ফুলটি পরাগায়িত হবে না, পাখিটিও পাবে না প্রয়োজনীয় মধু। একটি মাত্র অমিল ভেঙে দিতে পারে পারস্পরিক নির্ভরতার সূক্ষ্ম জাল।

flower needs to be pollinated.

 

প্রধান গবেষক গ্রেভস বলেন, বাস্তুতন্ত্র আসলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম সম্পর্কের বুননে গড়া। এর কেন্দ্রে রয়েছে উদ্ভিদ, যা খাদ্য শৃঙ্খলের মূল ভিত্তি। এই ভিত্তিতে সময়গত ফাটল ধরলে তার প্রভাব প্রতিটি স্তরে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রাণী এই উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল, তারা বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, ফুল ফোটার সময় নির্ধারণে বিভিন্ন উদ্ভিদ ভিন্ন ভিন্ন সংকেত অনুসরণ করে। কারও জন্য দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা, কারও জন্য রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা, কারও জন্য বৃষ্টিপাত বা আলো।

ফুল ফোটার সময় পরিবর্তন।

 

গ্রেভস আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন যদি কোনো সংকেতকে ত্বরান্বিত করে, তবে ফুল আগে ফোটে। আর যদি সংকেত ব্যাহত হয়, তবে ফুল দেরিতে ফোটে। এই কারণে আমরা আগে ফোটা ও দেরিতে ফোটা—দুই ধরনের পরিবর্তনই দেখতে পাই।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা অন্ধকার অঞ্চল হিসেবে রয়ে গেছে। অথচ পৃথিবীর প্রায় এক–তৃতীয়াংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলই সবচেয়ে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আধার। প্রতিবছরই এখানে গড়ে প্রায় ১৮০টি নতুন প্রজাতির উদ্ভিদ আবিষ্কৃত হয়।

এ বিষয়ে স্কটল্যান্ডের এডিনবরারে অবস্থিত রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের গবেষক ড. এমা বুশ বলেন, উষ্ণমণ্ডলীয় বাস্তুতন্ত্র ও ঋতুচক্র দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্তভাবে নথিভুক্ত হয়নি। এই গবেষণা দেখাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুতন্ত্রের ভিন্ন ভিন্ন উপাদান ভিন্ন গতিতে সাড়া দিচ্ছে। ফলে উদ্ভিদ, পোকামাকড় ও প্রাণীরা সময়ের দিক থেকে অসামঞ্জস্য অবস্থায় পড়ছে, আর তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সবাই।

ম্যাপে ফুল ফোটার সময়

 

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফুল আগে-পরে ফোটার এই ঘটনা হিমালয়, তিব্বত ও আন্দিজ পর্বতমালা, উত্তরমেরু এমনকি বাংলাদেশের মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলগুলোতেও ঘটছে।

ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া—এমন বহু নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে গত কয়েক দশক ধরে ফুল ফোটার সময় নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা চলছে। এসব গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক প্রজাতির ক্ষেত্রে প্রতি দশকে ২ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত এগিয়ে যাচ্ছে ফুল ফোটার সময়। 

এর মূল কারণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি, শীতকাল ছোট হওয়া ও তুষার গলার সময় এগিয়ে আসা।

japan cherry

 

জাপানের কিয়োটোতে চেরি ফুলের এক হাজার বছরের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানান, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ফুল ফোটার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে এসেছে।

ইউরোপে আঙ্গুরলতা, ব্লুবেল, ওক, বার্চ—এমন বহু উদ্ভিদে একই প্রবণতা দেখা গেছে।