অভিশংসন থেকে গ্রেপ্তার: রাষ্ট্রপতিকে সরানোর সাংবিধানিক মারপ্যাঁচ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন বা ইমপিচমেন্ট নানা কারণে বার বার আলোচনায় এসেছে। এই বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর ও এর সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও জটিল। অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক রাষ্ট্রপতিকে তার পদ থেকে অপসারণ করা যায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতিকে কেবল ‘সংবিধান লঙ্ঘন’ অথবা ‘গুরুতর অসদাচরণ’-এর সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত করা সম্ভব।
তবে এটি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এর জন্য জাতীয় সংসদে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। অভিযোগ উত্থাপন থেকে শুরু করে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সবশেষে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটেরও প্রয়োজন পড়ে।
এই লেখায় জেনে নেওয়া যাক, অভিশংসন কী, কেন করা হয়, এর প্রক্রিয়াটিই বা কেমন? অভিশংসন হওয়ার পর কী হয়? বাংলাদেশে কোনো রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের ইতিহাস আছে কি?
অভিশংসন কী?
অভিশংসন হলো একটি বিশেষ সাংবিধানিক বা বিচারিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিকে (যেমন রাষ্ট্রপতি) গুরুতর কোনো অপরাধ বা অনিয়মের দায়ে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে এটি সাধারণ কোনো প্রশাসনিক বহিষ্কার নয়, বরং সংসদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি চূড়ান্ত আইনি পদক্ষেপ। সংসদে অভিশংসিত হলে রাষ্ট্রের সেই উচ্চপদস্থ ব্যক্তিটির সম্মান ও পদমর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়।
কেন রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা হয়?
প্রধানত দুটি কারণে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যেতে পারে। সংবিধানের ৫২(১) অনুচ্ছেদে সুনির্দিষ্ট কারণগুলোর বর্ণনা দেওয়া আছে।
একটি কারণ হলো সংবিধান লঙ্ঘন। মানে, যদি রাষ্ট্রপতি সংবিধানের কোনো নির্দেশ অমান্য করেন বা পদের শপথ ভঙ্গ করেন।
আরেকটি হলো গুরুতর অসদাচরণ। যদি তিনি পদের অমর্যাদা করেন, কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়ান বা কোনো বড় ধরনের ফৌজদারি অপরাধে লিপ্ত হন, তবে তাকে এই অভিযোগে অপসারণ করা যায়।
সংবিধানের ৫২(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই ‘অসদাচরণ’ বা ‘লঙ্ঘন’ তদন্ত করার জন্য সংসদ কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করতে পারে। অর্থাৎ, শুধু অভিযোগ তুললেই হয় না, সেটি তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হতে হয়।
সংবিধান অনুযায়ী অভিশংসন প্রক্রিয়া
বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ ভাগের নির্বাহী বিভাগের ১ম পরিচ্ছেদের ৫২ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বলা হয়েছে।
প্রথমে সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের (অর্ধেকের বেশি) স্বাক্ষরে অভিযোগ লিখে স্পিকারের কাছে একটি প্রস্তাবের নোটিশ দিতে হবে।
স্পিকারের কাছে নোটিশ দেওয়ার দিন থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। আবার ৩০ দিনের বেশি দেরিও করা যাবে না। সংসদ অধিবেশন না থাকলে স্পিকার দ্রুত অধিবেশন ডাকবেন।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে সংসদ কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালকে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারে। তদন্ত চলাকালে রাষ্ট্রপতি সশরীরে উপস্থিত থেকে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনেরও অধিকার পাবেন।
তদন্ত শেষে যদি সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে অভিযোগটি সঠিক বলে প্রমাণিত হয়, তবে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার দিন থেকেই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে।
জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এও রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়া বলা হয়েছে। এই সনদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে হলে প্রস্তাবটি দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদের উভয়কক্ষ, মানে নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ--দুই জায়গাতেই পৃথকভাবে পাস হতে হবে। উভয় কক্ষের মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন বাধ্যতামূলক।
রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলে দায়িত্ব কে পালন করবেন?
যদি কোনো কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয় (অভিশংসন, পদত্যাগ বা মৃত্যু), তবে বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা নির্ধারিত আছে।
সেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি আবার নিজ দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করতে হয়।
অভিশংসনের পর কি গ্রেপ্তার করা সম্ভব?
সংবিধানের ৫১(১) ও ৫১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালে তিনি কিছু বিশেষ সুবিধা বা ইনডেমনিটি ভোগ করেন। রাষ্ট্রপতিকে তার কাজের জন্য কোনো আদালতের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। পদে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে আদালতে কোনো ফৌজদারি মামলাও দায়ের করা যাবে না। গ্রেপ্তার ও কারাবাসের জন্য আদালত থেকে পরোয়ানা জারি করা যাবে না।
তবে অভিশংসনের মাধ্যমে পদচ্যুত হলে তিনি সাধারণ নাগরিক হয়ে যান। তখন তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রচলিত আইনে মামলা ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব।
বাংলাদেশে অভিশংসনের রেকর্ড আছে কি?
বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি অভিশংসন করে অপসারণ করা হয়নি। তবে কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে অভিশংসনের উপক্রম হয়েছিল বা পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে।
২০০২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিরুদ্ধে সংসদীয় দল অনাস্থা এনেছিল এবং অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে অভিশংসন ভোট হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন এবং কাজ শেষে প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালে তার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে সসম্মানে বিদায় নেন।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদ পালন করেন। ১৯৯৬ সালের ১৯ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, কোনো প্রধানমন্ত্রী ছিল না) সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান চেষ্টা হয়। তবে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের কয়েকটি সিদ্ধান্তে তা ব্যর্থ হয়।
শেখ হাসিনা তখন বিরোধী দলীয় নেত্রী ছিলেন। পরে ১৯৯৬ সালের জুন মাসে নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। তৎকালীন বিরোধী দল তার পদত্যাগ দাবি করলেও তিনি পুরো মেয়াদ শেষ করে ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর বিদায় নেন।