এক্সপ্লেইনার

ডিপ স্টেট: পর্দার আড়ালে কারা থাকেন

শরীফ এম শফিক
শরীফ এম শফিক

সাধারণত যা দেখা যায় না কিংবা যা সম্পর্কে জানা যায় না, তার প্রতি আমাদের একটা ভয় কাজ করে। ‘ডিপ স্টেট’ শুনলেও এক ধরনের শীতল বা অস্বস্তিকর অনুভূতি তৈরি হয়। এর কারণ, এটি এমন এক ধারণা যেখানে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃত ক্ষমতা পর্দার আড়ালে থাকে।

যখন আমরা শুনতে পাই যে, আমাদের ভাগ্য এমন কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে যাকে আমরা চিনি না, যার কোনো নাম নেই কিংবা যাকে সরানোর ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই, তখন এক ধরনের অসহায়ত্ব তৈরি হয়।

‘ডিপ স্টেটের’ সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, গবেষক, বিশ্লেষক, সাংবাদিকরা এটিকে নিজেদের বোঝাপড়া অনুযায়ী ব্যাখ্যা করলেও, সবার কথায় একটা বিষয় প্রায় একই—রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তরালে থাকা গোপন ও শক্তিশালী চক্রের এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার।

‘ডিপ স্টেট’ প্রসঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক রবার্ট কাপলান তার বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, প্রতিটি আধুনিক রাষ্ট্রেই একটি অদৃশ্য ‘স্থায়ী কাঠামো’ থাকে যা সরকার পরিবর্তন হলেও অপরিবর্তিত থাকে, যারা মূলত জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দোহাই দিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে।

নিউইয়র্ক টাইমসের দীর্ঘ সময়ের হোয়াইট হাউস প্রতিবেদক মাইকেল ক্রাউলি ‘ডিপ স্টেটকে’ বলে থাকেন ‘অদৃশ্য রাষ্ট্র’। তার মতে, এই শব্দ দিয়ে এমন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ করা হয়, যারা বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে। 

তার মতে, বিশেষজ্ঞরা মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে ‘ডিপ স্টেট’ শব্দ ব্যবহার করেন, যেখানে নামমাত্র গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার আড়াল থেকে সামরিক ও গোয়েন্দা প্রধানরাই আসল কলকাঠি নাড়েন এবং প্রয়োজন মনে করলে নির্বাচিত নেতাদের সরিয়ে দিতে পারেন।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ‘ডিপ স্টেট’

বিভিন্ন সময়ে ‘ডিপ স্টেট’ আলোচনায় এলেও বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় এর ভূমিকার কথা প্রথম বড় আকারে আলোচনায় আসে গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে।

২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন যে, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ স্টেট’-এর কোনো ভূমিকা ছিল কি না।

জবাবে ট্রাম্প সরাসরি বলেছিলেন যে, মার্কিন ‘ডিপ স্টেটের’ কোনো ভূমিকা ছিল না। তবে এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয় না যে, ট্রাম্প কি মার্কিন ডিপ স্টেটের অস্তিত্ব অস্বীকার করলেন, নাকি তাদের ভূমিকার কথা অস্বীকার করলেন। 

সম্প্রতি এনসিপি নেতা ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার একটি বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ‘ডিপ স্টেট’ বিতর্ক তৈরি করেছে। এক আলোচনা সভায় তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালে দায়িত্ব পালনের শুরুতে তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’ তাদের ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল। ওই ডিপ স্টেটের মধ্যে দেশি-বিদেশি ‘অনেকগুলো পক্ষ’ ছিল উল্লেখ করে তিনি সুনির্দিষ্ট করে কারও নাম বলবেন না বলে জানান।

তার দেওয়া এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের পর প্রশ্ন উঠেছে—আসলে কারা এই অদৃশ্য শক্তি এবং তাদের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল?

ডিপ স্টেট কী?

ওয়াশিংটনে সাংবাদিকের প্রশ্নে ট্রাম্প বিরক্তিভাব নিয়ে যদিও বলেন যে, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে মার্কিন ডিপ স্টেটের ভূমিকা নেই, তাহলে প্রশ্ন আসে—এর মাধ্যমে তিনি কি আসলে ‘ডিপ স্টেটের’ অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলেন? 

তাহলে কোনো দেশের নির্বাচিত সরকারের সমান্তরালে অদৃশ্য থেকে ওই দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে কলকাঠি নাড়াতে সক্ষম—এমন শক্তিশালী গোষ্ঠীকেই ট্রাম্প ‘ডিপ স্টেট’ বোঝেন?

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, তুর্কি শব্দগুচ্ছ ‘দেরিন দেভলেত' (Derin Devlet) বা ‘রাষ্ট্রের অন্তরালে’ থেকেই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটির উৎপত্তি। তুরস্কের ইতিহাসে ‘দেরিন দেভলেত’ বলতে এমন একটি গোপন ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ককে বোঝানো হয়, যারা নির্বাচিত সরকারের সমান্তরালে থেকে দেশ চালান। এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা মূলত সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা বিচার বিভাগ ও আমলাতন্ত্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে হয়ে থাকেন।

মিশরের ‘সুপ্রিম কাউন্সিল অব দ্য আর্মড ফোর্সেস’কে দেশটির প্রকৃত ক্ষমতার উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হোসনি মোবারক থেকে মুরসি—বেসামরিক নেতৃত্বে যিনিই থাকুন না কেন, সামরিক বাহিনী তার বিশাল ক্ষমতা ও স্বতন্ত্র ব্যবস্থা বজায় রাখে এবং তাদের স্বার্থ বিঘ্নিত হলে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে।

যুক্তরাজ্যের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে একজন নির্বাচিত মন্ত্রীর ঠিক পরের ধাপেই থাকেন একজন ‘পার্মানেন্ট সেক্রেটারি’। মন্ত্রীরা নির্বাচনের পর বদলে যান, কিন্তু এই আমলারা দশকের পর দশক ধরে একই পদে বা মন্ত্রণালয়ে বহাল থাকেন। নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই আমলাদের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান এতই বেশি যে, তারা চাইলেই মন্ত্রীর যেকোনো সিদ্ধান্তকে কৌশলে আটকে দিতে পারেন। এটাকেই ব্রিটিশ রাজনীতির ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়। এটি জনপ্রিয় ব্রিটিশ সিরিজ ‘ইয়েস মিনিস্টার’-এ হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

‘ডিপ স্টেটে’ কারা থাকে

ডিপ স্টেটের সাধারণত কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকে না। আসিফ মাহমুদের বক্তব্যে ডিপ স্টেটে ‘একাধিক পক্ষের’ কথা উল্লেখ ছিল। 

অক্সফোর্ড অভিধানের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘ডিপ স্টেট’ সাধারণত সরকারি সংস্থা বা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের একটি চক্র যারা সরকারি নীতির ওপর গোপন নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।

অনেকে গোয়েন্দা বাহিনীকে ডিপ স্টেটের মূল চালিকাশক্তি মনে করেন। এক্ষেত্রে প্রায়ই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের প্রথম পরিচালক এডগার হুভারের নাম আসে। তিনি আটজন প্রেসিডেন্টের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন এবং গোপন নথি ও নজরদারির মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক আন্দোলনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ডিপ স্টেটে গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনীর একটি অংশ, প্রভাবশালী আমলাতন্ত্র, বিদেশি শক্তির প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অংশ, সিভিল সোসাইটির একাংশ থাকতে পারে।’

তার মতে, ‘ডিপ স্টেট মূলত তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, যখন কোনো মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকের ভাষা ও কর্মকাণ্ডে বিশেষ কোনো তৃতীয় পক্ষের স্বার্থ বড় হয়ে দেখা দেয়, তখনই সেখানে ডিপ স্টেটের অস্তিত্ব আঁচ করা যায়। এটি অনেকটা “সিন্ডিকেট” বা “অদৃশ্য ব্যবস্থাপনার” মতো কাজ করে, যেখানে দৃশ্যমান সরকার শুধু কাগজে-কলমে অনুমোদন দেয়, মূল সিদ্ধান্ত হয় আড়ালে।’

কোনো রাষ্ট্রে ‘ডিপ স্টেট’ শক্তিশালী হয়ে উঠলে সেখানে সত্যিকারের ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ’ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. সাব্বির। তিনি বলেন, ‘ডিপ স্টেট ক্ষমতার একটি জটিল ও অন্ধকার দিক। এটি যখন রাজনৈতিক সরকারের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে, তখন জনস্বার্থের চেয়ে বিশেষ মহলের স্বার্থই প্রাধান্য পায়। গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা একান্ত প্রয়োজন।’