এপস্টেইন কেলেঙ্কারি: রাজনীতিক কিংবা ধনকুবের, প্রশ্নের মুখে ক্ষমতাবানদের সংযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস) এপস্টেইন নথির বিস্তারিত প্রকাশ করেছে।
গত শুক্রবার প্রকাশিত এসব নথিতে প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠা, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি ও দুই হাজার ভিডিও রয়েছে বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।
এই নথি প্রকাশের পর থেকেই ক্ষমতা, বিশেষাধিকার ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে বৈশ্বিক বিতর্ক জোরালো হয়েছে।
এসব প্রকাশনায় এপস্টেইনের জীবন, অপরাধ এবং তার বিস্তৃত যোগাযোগ সম্পর্কে নতুন সব তথ্য যুক্ত হয়েছে।
সেইসঙ্গে রয়েছে খ্যাতনামা রাজনীতিক, ধনকুবের এবং এমনকি বিভিন্ন দেশের রাজপরিবারের সদস্যদের অপরাধকাণ্ডের ফিরিস্তিও।
একইসঙ্গে প্রশ্নও উঠেছে, প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি নজরদারির বাইরে থেকে গেছেন কি না।
প্রেক্ষাপট: যে মামলা দেখেনি বিচারের মুখ
আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কুখ্যাত যৌন অপরাধীদের একজন হিসেবে পরিচিত জেফরি এপস্টেইন ছিলেন একজন বিনিয়োগকারী।
বিবিসির তথ্যমতে, যৌন ব্যবসার উদ্দেশ্যে মানব পাচারের অভিযোগে কারাবন্দী হয়ে বিচার শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন জেফরি।
কিন্তু গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক দিন পরেই ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন জেফরি।
গত বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (এফবিআই) জানায়, এপস্টেইন জেলে আত্মহত্যা করেছেন।
সন্দেহজনক এ মৃত্যুর কারণে তার বিরুদ্ধে হওয়া ফৌজদারি মামলা কখনোই আদালতে পৌঁছায়নি। এতে বহু অভিযোগ যেমন যাচাইয়ের বাইরে থেকে যায়, তেমন মেলেনি অনেক প্রশ্নের উত্তরও।
বিবিসি জানায়, ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় এক অপ্রাপ্তবয়স্ককে দিয়ে যৌনব্যবসা করানোর অভিযোগে এপস্টেইন সাজা হয়েছিল।
তবে ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রসিকিউটরদের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি করেন তিনি। আর সীমিত মেয়াদের কারা ভোগ করেই বাকি অভিযোগ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন।
পরবর্তীতে ওই সমঝোতা চুক্তিটি ব্যাপক সমালোচিত হয়।
বিশ্লেষকদের দাবি, এই চুক্তি এপস্টেইনসহ অন্য প্রভাবশালীদেরও তদন্তের হাত থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করেছে।
শিক্ষক থেকে ধনকুবের বিনিয়োগকারী
বিবিসি জানায়, নিউইয়র্কে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জেফরি শুরুতে একটি বেসরকারি স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। পরে ওয়াল স্ট্রিটের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি অর্থলগ্নি খাতে কাজ শুরু করেন।
তার গড়ে তোলা এপস্টেইন অ্যান্ড কো নামের প্রতিষ্ঠানটি ধনী গ্রাহকদের অর্থ ব্যবস্থাপনা করত।
আর এর মাধ্যমেই তিনি বিপুল সম্পদ, ব্যক্তিমালিকানাধীন দ্বীপ ও জেটসহ বিলাসবহুল জীবনযাপন গড়ে তোলেন। রাজনীতি, ব্যবসা, শিক্ষাঙ্গন ও বিনোদন জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কও গড়ে তুলেছিলেন।
সেইসঙ্গে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, রাজপরিবারের সদস্য ও কোটিপতিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। এগুলো তার অপরাধের প্রমাণ না হলেও পরবর্তীতে তীব্র নজরদারির মুখে পড়ে।
এপস্টেইন নথি
এপস্টেইন নথি বলতে এপস্টেইন ও তার দীর্ঘদিনের সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের তদন্তে সংগৃহীত দলিলপত্রকে বোঝায়।
বিবিসির জানায়, এসব নথির মধ্যে রয়েছে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের লিখিত বিবরণ, ই-মেইল, খুদেবার্তা, অভ্যন্তরীণ তদন্ত স্মারক এবং জেফরির সম্পত্তি থেকে জব্দ করা বিভিন্ন উপাদান।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ভুক্তভোগীদের পরিচয় গোপন রাখতে চেষ্টা করেছে। যেসব তথ্যে স্পষ্ট যৌন নির্যাতনের বিবরণ রয়েছে তা গোপন রাখা হয়েছে বা সম্পাদনা করা হয়েছে।
ব্লুমবার্গের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নথিগুলো রাজনীতিক, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে জেফরির যোগাযোগের তথ্য দেয়।
নথিতে দেখা যায় কিছু ব্যক্তি প্রকাশ্যে স্বীকার না কলেও জেফরির সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রেখেছিলেন।
তবে এসব নথিতে তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়নি।
ব্লুমবার্গ আরও জানায়, নথিগুলোর মধ্যে একটি প্রস্তাবিত অভিযোগপত্রও আছে। এই অভিযোগ পত্রে জেফরির বিরুদ্ধে মানবপাচার ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রলুব্ধ করার অভিযোগ আনার কথা ছিল।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদ্য প্রকাশিত নথিগুলো নারী পাচারের ইঙ্গিত দেয়। যেখানে অন্যান্য অনেক পুরুষের কাছে নারীদের পাচার করা হয়েছে।
এটি সেই সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে বলা হয়েছিল তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এ বিষয়ে নেই।
গার্ডিয়ান জানায়, কিছু নথিতে ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন, জেফরি বা ম্যাক্সওয়েলের নির্দেশে তারা অর্থ বা সুবিধার বিনিময়ে অন্য পুরুষদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তবে দ্য গার্ডিয়ান আরও জানায়, এসব অভিযোগের অনেকগুলোই এখনো প্রমাণিত নয়। কিছু অভিযুক্ত সরাসরি অস্বীকারও করেছেন। আগের তদন্তে কর্তৃপক্ষও এসব দাবিকে অসমর্থিত বলেছিল।
নথিতে জেফরির অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দুটি দ্বীপকে ব্যবহার করা হয় বলেও জানানো হয়েছে।
এপস্টেইন আইল্যান্ড
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত লিটল ও গ্রেট সেন্ট জেমস দ্বীপকে জেফ্রি এপস্টেইন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গোপন কম্পাউন্ডে রূপ দিয়েছিলেন। এখানেই তিনি পাচার করে আনা নারী ও শিশুদের রাখতেন।
সিবিএস নিউজ জানায়, দুটি দ্বীপ মিলিয়ে মোট ২৩৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত ছিলো এপস্টেইন আইল্যান্ড।
এখানে অভিজাত অতিথিদের জন্য ছিল বিলাসী পরিবেশ। আর পাচার হওয়া ব্যক্তিদের জন্য জায়গাটি ছিলো নিয়ন্ত্রিত ফাঁদ।
দ্বীপগুলোর ভৌগোলিক অবস্থানই এ ব্যবস্থাকে কার্যকর করে তুলেছিল।
এখানে উচ্চপ্রযুক্তি সুবিধার বাড়িঘর ছিলো। উচ্চপর্যায়ের অতিথিদের গোপন ক্যামেরায় ধারণ করার ব্যবস্থাও ছিলো।
ব্যক্তিগত জেট ও হেলিপ্যাডের মতো বিলাসী সুবিধাও ছিলো দ্বীপ দুটিতে। কিন্তু এগুলো কঠোর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হতো বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নথিতে বলা হয়েছে, এই দ্বীপগুলো একটি লজিস্টিক হাবের মতো ব্যবহৃত হতো।
নথি অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের সাধারণ ভ্রমণকারীর ছদ্মবেশে সেন্ট থমাস বিমানবন্দর দিয়ে দ্বীপে আনা হতো। পরে তাদের বন্দী করে রাখা হতো।
কেন এখন নথিগুলো প্রকাশ করা হলো
বিবিসির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বিপুল সমর্থনে একটি আইন পাস হয়েছে। আর এর ফলেই এই নতুন করে নথি প্রকাশ করা হচ্ছে।
ওই আইনে এপস্টেইন-সংক্রান্ত সব তদন্ত নথি প্রকাশ করতে বিচার বিভাগকে বাধ্য করা হয়। তবে, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের শর্তও রাখা হয় তাতে।
শুরুতে নথি প্রকাশের বিরোধিতা করলেও আইনপ্রণেতা ও জনসাধারণের চাপের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিলটিতে স্বাক্ষর করেন বলে দাবি বিবিসির।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় প্রকাশ।
তবে সমালোচকদের দাবি, প্রকাশ হওয়া তথ্যগুলো ব্যাপকভাবে সম্পাদিত।
নথি অনুযায়ী কারা যুক্ত
ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, নথিতে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সরকার খাতের পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য রয়েছে।
তবে একইসঙ্গে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, নথিতে নাম থাকা মানেই অপরাধের প্রমাণ নয়।
বিবিসিও জানায়, আগের ও বর্তমান প্রকাশনায় সামাজিক বা পেশাগতভাবে এপস্টেইন সঙ্গে যুক্ত বহু হাইপ্রোফাইল ব্যক্তির নাম এসেছে। তাদের অনেকেই তার অপরাধকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। অনেকে দাবি করেছেন তারা জানতেনও না।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীদের বিবৃতি ও তদন্ত নথিতে তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে আগের তদন্তে কর্তৃপক্ষ এসব দাবি প্রায়ই অস্বীকার করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নথিতে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের নাম রয়েছে। তিনি ২০০৫ সালে এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের দাবি করলেও ২০১৮ সালে তার ব্যক্তিগত দ্বীপে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে উল্লেখ আছে।
এপস্টেইন নথিতে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের কথিত বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ও নারী সরবরাহের অভিযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ইলন মাস্কের সঙ্গে এপস্টেইনের যোগাযোগ থাকলেও তিনি দ্বীপে যাওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের কথা বলেছেন।
এ ছাড়া ক্যাথি রুমলার, স্টিভেন সিনোফস্কি ও লিওন ব্ল্যাকের নাম এসেছে বিভিন্ন যোগাযোগ ও অভিযোগের প্রেক্ষাপটে।
নথিতে আরও রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, বিল ক্লিনটন, পিটার ম্যান্ডেলসন ও হার্ভে ওয়াইনস্টিনের নাম।
তাদের ক্ষেত্রে সামাজিক সম্পর্ক, ভ্রমণের তথ্য বা অভিযোগের উল্লেখ আছে।
কিন্তু নথিতে নাম থাকা বা অভিযোগ ওঠা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়।
ক্ষমতা, জবাবদিহিতা ও অসমাপ্ত বিচার
এপস্টেইন নথিগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো দেখায় কীভাবে সম্পদ ও প্রভাব বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতার সঙ্গে মেলে।
গার্ডিয়ানের জানায়, এসব নথি প্রমাণ করে জেফরির নির্যাতন নেটওয়ার্ক একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা আর সুরক্ষার ওপরও নির্ভরশীল ছিল।
একইসঙ্গে নথিতে কারও নাম থাকা মানেই অপরাধের প্রমাণ নয়।
এতে নথিভুক্ত তথ্য ও অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
এপস্টেইন মৃত্যুর কারণে বহু অভিযোগ কখনো আদালতে যাচাই হয়নি।
এতে ভুক্তভোগীরা পূর্ণ ন্যায়বিচারও পাননি।