শিশুর হাতের লেখা সুন্দর করার কৌশল

রবিউল কমল
রবিউল কমল

অনেক শিশুর হাতের লেখা এলোমেলো হয়। কেউ লাইনের মধ্যে লিখতে পারে না, কেউ দুই শব্দের দূরত্ব ঠিক রাখতে পারে না, আবার কারও হাত খুব দ্রুত ব্যথা হয়ে যায়। ফলে পরীক্ষার বা স্কুলের খাতা দেখতে সুন্দর লাগে না। অনেক সময় এর প্রভাব পড়ে শিশুর মার্ক পাওয়ার ওপর।

বাংলাদেশের অনেক অভিভাবক ভাবেন, ‘আরও বেশি লিখলে ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু হাতের লেখা নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা বলছেন, কেবল বেশি লিখলেই হবে না, সঠিক পদ্ধতিতে অনুশীলন করাটাই বেশি জরুরি।

ঢাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফি। পড়ালেখায় সে বেশ ভালো। ক্লাসে প্রশ্ন করলে সব উত্তরই ঠিকঠাক দিতে পারে। কিন্তু পরীক্ষার খাতা দেখলে শিক্ষক প্রায়ই বলেন, ‘লেখা আরেকটু পরিষ্কার হলে ভালো হতো।’

15,900+ Parents Helping Children With Writing Stock Photos, Pictures &  Royalty-Free Images - iStock
ভুল ভঙ্গিতে বসলে কবজি, কাঁধ ও ঘাড়ে অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ে। এতে লেখা সুন্দর হয় না। ছবি: সংগৃহীত

পেন্সিলে গ্রিপ ব্যবহার

অনেক শিশুই পেন্সিল খুব শক্ত করে ধরে লেখে। ফলে কিছুক্ষণ লিখলেই আঙুল ও কবজিতে ব্যথা শুরু হয়। এতে হাতের লেখা ধীরে ধীরে আরও এলোমেলো হয়ে যায়।

শিশুদের হাতের লেখা শেখাতে কাজ করে হাতেখড়ি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সাল বলেন, এ ক্ষেত্রে একটি পেন্সিল গ্রিপ বেশ কার্যকর হতে পারে। রাবার বা সিলিকনের তৈরি এই ছোট্ট উপকরণটি পেন্সিলের ওপর লাগিয়ে দিলে শিশুর আঙুল সঠিক জায়গায় বসে। এতে পেন্সিল ধরতে কম শক্তি লাগে এবং হাতও তেমন ব্যথা হয় না।

বর্তমানে বাংলাদেশের বড় স্টেশনারি দোকান কিংবা অনলাইন মার্কেটপ্লেসেও বিভিন্ন ধরনের পেন্সিল গ্রিপ পাওয়া যায়।

বসার ভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ

অনেক শিশু লেখার সময় খাতার ওপর ঝুঁকে পড়ে। বেশিরভাগ অভিভাবক বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। অথচ ভুল ভঙ্গিতে বসলে কবজি, কাঁধ ও ঘাড়ে অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ে। এতে লেখা সুন্দর হয় না।

এ জন্য বিশেষজ্ঞরা স্ল্যান্ট বোর্ড বা ঢালু লেখার বোর্ড ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সাল বলেন, আলাদা বোর্ড না থাকলেও সমস্যা নেই। একটি মোটা ফাইল, পুরোনো রিং বাইন্ডার বা শক্ত বইয়ের ওপর খাতা রেখে সামান্য ঢালু করে দিলেই একই সুবিধা পাওয়া যায়। প্রয়োজনে কাগজ যেন পিছলে না যায়, সেজন্য ক্লিপ বা রাবার ব্যান্ড ব্যবহার করা যেতে পারে।

Effective Tips To Improve Kids Handwriting Within A Week
বাংলাদেশের অনেক স্কুলে সাধারণ দাগ দেওয়া খাতা ব্যবহার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

লাইনের ভেতরে লেখার মজার উপায়

বাংলাদেশের অনেক স্কুলে সাধারণ দাগ দেওয়া খাতা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যেসব শিশুর লাইনের মধ্যে লিখতে সমস্যা হয়, তাদের জন্য একটু ভিন্ন পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে।

তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সাল পরামর্শ দেন, অভিভাবক চাইলে খাতার লাইনের ওপর আঠা বা পাফি পেইন্ট দিয়ে হালকা উঁচু দাগ তৈরি করতে পারেন। শুকিয়ে গেলে শিশুরা পেন্সিল দিয়ে লিখতে গিয়ে বুঝতে পারবে কখন তার অক্ষর লাইনের বাইরে চলে যাচ্ছে। এভাবে হাতের লেখার অনুশীলন খেলাধুলার মতোই আনন্দদায়ক হয়ে উঠবে।

শব্দের দূরত্ব ঠিক রাখার কৌশল

অনেক সময় দেখা যায়, শিশুরা একেকটি শব্দ এমনভাবে লিখে যে সব শব্দ একসঙ্গে লেগে যায়। আবার কেউ কেউ এত বেশি ফাঁক রাখে যে পড়তে অসুবিধা হয়।

তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সালের মতে, এ সমস্যার সমাধান হতে পারে একটি সাধারণ আইসক্রিমের কাঠি বা কাঠের স্কেল। একটি শব্দ লেখার পর কাঠিটি খাতায় সোজা করে রেখে পরের শব্দ শুরু করতে বলুন।

এভাবে কয়েক সপ্তাহ অনুশীলনের পর শিশু নিজেই সঠিক দূরত্ব বজায় রাখতে শিখে যাবে বলে জানান তিনি।

এই কাঠিটিকে আরও আকর্ষণীয় করতে তাতে ছোট্ট একটি মুখ আঁকতে পারেন বা একটি সুন্দর স্টিকার লাগিয়ে দিতে পারেন। এতে পুরো ব্যাপারটি তার কাছে খেলার মতোই আনন্দের হয়ে উঠবে।

How to Improve Kids Handwriting: Expert Tips for Parents
খেলতে খেলতেই শিশুরা অক্ষরের সঠিক গঠন শিখতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

অক্ষরেরও আছে নিজস্ব ঘর

সব অক্ষরের উচ্চতা এক নয়। যেমন ইংরেজি h লম্বা, o ছোট, আবার p নিচের দিকে নেমে যায়। এসব মনে রাখতে ‘Sky, Grass, Dirt’ নামের একটি মজার কৌশল আছে।

বাংলাদেশের অভিভাবকেরা এটিকে সহজ করে বলতে পারেন ‘আকাশ, ঘাস, মাটি’।

এই পদ্ধতিতে লম্বা অক্ষর যাবে আকাশে। ছোট অক্ষর থাকবে ঘাসের মধ্যে আর নিচের দিকে নেমে আসা অক্ষর পৌঁছাবে মাটিতে।

এভাবে খেলতে খেলতেই শিশুরা অক্ষরের সঠিক গঠন শিখে ফেলে।

শুধু বকা নয়, দরকার বোঝাপড়া

মোহাম্মদপুরের পঞ্চম শ্রেণির মীমের হাতের লেখা খুব ধীর। বাড়িতে সবাই ভাবতেন, সে ইচ্ছে করেই সময় নষ্ট করে। পরে স্কুলের শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মীমের হাতের নড়াচড়ার দক্ষতা আরও একটু উন্নত হওয়া দরকার।

মীমের মা রিফাত তানজিনা জানান, শিক্ষক তাকে বাসায় প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট করে লেখা অনুশীলন করতে বললেন। কয়েক মাস পর তার খাতায় স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেল। এখন মীমের হাতের লেখা আগের চেয়ে ভালো।

Child writing with mom Vectors - Download Free High-Quality Vectors |  Magnific (formerly Freepik)
বকাঝকা না করে অভিভাবকেরি উচিত পাশে থেকে উৎসাহ দেওয়া। ছবি: সংগৃহীত 

শিক্ষক–অভিভাবকের যৌথ ভূমিকা

তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সাল বলেন, যদি কোনো শিশুর হাতের লেখা দীর্ঘদিন ধরেই এলোমেলো থাকে, তাহলে বকাঝকা না করে শ্রেণিশিক্ষকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। অনেক সময় বিশেষ ধরনের লাইনযুক্ত খাতা, অতিরিক্ত সময় বা ভিন্নভাবে অনুশীলনের সুযোগ দিলে এই সমস্যা দূর হয়।

কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে কর্মথেরাপি (Occupational Therapy) থেকেও উপকার পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।

শেষ কথা, সুন্দর হাতের লেখা মানেই ভালো শিক্ষার্থী, এমন নয়। আবার এলোমেলো হাতের লেখা মানেই শিশুটি অলস বা অমনোযোগী, এ কথাও সত্য নয়। অনেক মেধাবী শিশুরও হাতের লেখায় সমস্যা থাকতে পারে।

তাই শিশুকে বারবার ‘তোমার লেখা খারাপ’ না বলে, বরং ছোট ছোট কৌশলে, ধৈর্য নিয়ে এবং প্রশংসা করে অনুশীলনে উৎসাহ দিন। কারণ সুন্দর হাতের লেখা এক দিনে তৈরি হয় না, প্রতিদিনের একটু একটু চর্চাই হাতের লেখাকে সুন্দর করে।