গল্প

উড়বে ফুল অনেক দূরে

আহমেদ খান হীরক
আহমেদ খান হীরক

মাঠের ধারে জমি, জমির ধারে নদী৷ ছলছল কলকল বয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন৷ সেই নদীর ধারে ফুটলো এক ফুল। লাল টুকটুক ফুল। কী যে মজা ফুলের!

বাতাস এসে দুলিয়ে দেয় তাকে। বৃষ্টি এসে নাড়িয়ে দেয় তাকে। সূর্য এসে বলে, ঘুমিয়ে আর থেকো না তো ফুল, দেখো সকাল হয়ে গেছে।

ফুলের কী যে দারুণ লাগে তখন। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে ঝলমলে এক দিন। নীলচে আকাশ। আকাশের ভেতর সাদা সাদা মেঘ। মেঘের মাঝ দিয়ে বেরিয়ে আসছে সূর্যের কত রঙ!

এর মধ্যেই ফুল দেখলো নদী। বাহ, কী যে দারুণ ঢেউ। বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে দূরে দূরে। সেই নদীতে দূর থেকে ভেসে আসছে শুকনো গাছের ডাল। ডালের ওপর লালচে দুই ফড়িং। খেলছে তারা। ছুটছে তারা এদিক-ওদিক। ডালের সাথে ভেসে ভেসে কোথায় তারা মিলিয়ে গেলো। ফুল দেখলো তার চারপাশে সবাই শুধু ছুটছে—

বাতাস ছুটছে দিকে দিকে
পাখি উড়ছে ডানার জোরে
গরু যাচ্ছে বাড়ির পানে
মৌমাছিও মজায় ওড়ে

কেবল সে যাচ্ছে না কোথাও, ভাসছে না হাওয়ায়, ছুটছে না মাঠে। মানে আমাদের লাল টুকটুক ফুল। মনটা এবার তার ভীষণ খারাপ হলো। তার কি তাহলে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাই জীবন?

ফুলটা এবার তার পাতাটাকে বলল
পাতাটা এবার তার ডালটাকে বলল
ডালটা এবার তার কাণ্ডটাকে বলল
কাণ্ডটা এবার তার শিকড়টাকে বলল

কী বলল?

ফুল বলল পাতাকে, আমি উড়তে চাই। বাতাসে ভাসতে চাই। মাঠের ধারে ছুটতে চাই।

পাতা বলল ডালকে, ফুল উড়তে চায়। বাতাসে ভাসতে চায়। মাঠের ধারে ছুটতে চায়।

ডাল বলল কাণ্ডকে, পাতা বলেছে ফুল উড়তে চায়। বাতাসে ভাসতে চায়। মাঠের ধারে ছুটতে চায়।

কাণ্ড যে-ই বলল শিকড়কে, শিকড় চমকে উঠলো। তাড়াতাড়ি বলে উঠলো, ফুল! ফুল! আমাদের ছেড়ে গেলে তুমি বাঁচবে না। শুকিয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তোমার রঙ আর থাকবে না। তোমার সুবাসও আর থাকবে না।

ফুল বললো, থাক থাক শিকড়। তোমাকে আর অকারণে ভয় দেখাতে হবে না। সবাই ওড়ে, সবাই ছুটে বেড়ায়, কেবল আমরাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকি...

ফুল রাগ করে মুখ ফিরিয়ে নিলো। শিকড় বলল, আমাদের এভাবেই একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, এটাই নিয়ম। একসাথে থাকলেই যে আমরা ভালো থাকি। পরিবারকে তো এভাবেই থাকতে হয় ফুল!

ফুল আর কথাই বলল না। তার সত্যি অনেক রাগ হয়েছে। এতই যে ওই আকাশও তার ভালো লাগছে না, এই বাতাসেও তার মন ভরছে না।

বিকেলের দিকে সেই বাতাসও কেমন থমকে গেলো। আর রাতের দিকে এলো ঝড়। এই ঝড় কী সে ঝড়! ঝড়ের তোড়ে নদী কেঁপে কেঁপে উঠলো। জোনাক পোকাগুলো লুকিয়ে গেলো ঝোপের ভেতর। আর আমাদের লাল টুকটুক ফুলটা ঝড়ের তোড়ে উড়ে উড়ে যেতে লাগলো। ফুলটার মনে হলো যে কোনো সময় ডাল থেকে সে ভেঙে যাবে। তখন কি সে উড়তে পারবে?

এ সময়েই অনেক দূর থেকে একটা সবুজ পাতা ছুটে এলো ঝড়ের সাথে। ফুলটা বলল, আরে বাহ! তুমি তো দেখি উড়ছো...

পাতা বলল, আমি উড়ছি না ফুল। আমি ডাল ভেঙে গেছি। আমার পরিবার থেকে আলাদা হয়ে গেছি। এবার আমার কী হবে আমি কিচ্ছু জানি না!

বলতে না বলতেই পাতা সাঁই করে উড়ে চলে গেলো কোথায়। এবার ফুলের ভয় হলো। সেও কি এবার ভেঙে যাবে? পাতাটার মতো ভেসে যাবে?

ঝড় আরও বাড়লো—শোঁ শোঁ শোঁ...

শিকড় বলল, আমাদের একসাথে থাকতে হবে। কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। একে অপরকে ধরে রাখতে হবে...

শিকড় ধরে রাখলো কাণ্ডকে
কাণ্ড ধরে রাখলো ডালকে
ডাল ধরে রাখলো পাতাকে
পাতা ধরে রাখলো ফুলকে

সারা রাত ঝড় হলো। আর সারা রাত তারা একে অপরকে ধরে রাখলো। থাকলো একসাথে।

সকাল হলো আবার। নতুন সকাল।

ঝড় থেমে গেছে। ফুল দেখলো সে ভেঙে যায়নি। ভেসে যায়নি। উড়েও যায়নি কোথাও। একসাথে থেকে একে অপরকে রক্ষা করেছে।

কী মজা একসাথে থাকার!