গল্প

হিমালয়চূড়ায় লাল পতাকা

মোহিত কামাল
মোহিত কামাল

দেহ থেকে মনটা আলাদা হয়ে গেছে। বিছানায় শুয়ে আচমকা এমনটাই অনুভব করল গুলজার। সে জানে, দেহ ও মন এক সুতায় গাঁথা। তবু ওরা আলাদা হয় কীভাবে?

মনে প্রশ্ন জাগলেও বিস্মিত হলো না। বরং বেডের পাশে ঝোলানো সুইচ অফ করে দেওয়ার পর গাঢ় আঁধারে ডুবে গেল ঘর। এবার নিজের দেহের মধ্যে নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল।

কোথায় সে?

দেহের ভেতরে, নাকি দেহের বাইরে?

হাত-পা আছে। বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন আছে। শ্বাস চলছে। অথচ মনে হচ্ছে, এগুলোর কোনোটিই তার নয়। যেন সে দূর থেকে নিজের দেহটাকে দেখছে একটা খোলসরূপে। বহুদিনের ব্যবহারে জীর্ণ, অথচ এখনও সচল।

বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করল, মস্তিষ্ক ঘুমানোর আগেই নিজের আকাঙ্ক্ষা আর অনিয়ন্ত্রিত চাহিদার ঘূর্ণিজগৎ শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে।

কতদিন পর! নিজেকে বড্ড সুখী মনে হতে লাগল। কোনো চাওয়া নেই। পাওয়ার তাড়না নেই। কারও কাছে নিজেকে প্রমাণ করার ব্যস্ততা নেই। আগামীকাল নিয়ে কোনো হিসাব নেই। অতীতের কোনো অনুতাপও নেই। তবু মনে প্রশ্ন উড়ে এলো, সুখ কি স্থায়ী হবে?

প্রশ্নটা অন্ধকারে ঝুলে রইল।

মাথার ওপরে ফ্যান ঘুরছে। ঘূর্ণায়মান আওয়াজ বিরক্তি জাগাচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে প্রশান্তির একটা স্বর ভেসে আসছে অনেক দূর থেকে।

কোন অসীম জগৎ থেকে আসছে এই মধুর আওয়াজ?

এবার কোমল সুরে ভেসে গেল মনে জেগে ওঠা নানা রকম প্রশ্ন। প্রশ্নগুলো একসময় শব্দ হারিয়ে ফেলল। তারপর আকৃতি। তারপর অস্তিত্ব।

শান্তির পরশ খেয়ে চোখ জোড়া লেগে গেছে। ঘুমের জগতে ঢুকে গেল সে।

দুই

কাকের কা... কা... আওয়াজে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় চোখ জোড়া খুলে তাকাল জানালার দিকে। ঝোলানো পর্দার ফাঁক গলিয়ে কোমল রোদের রেখা চলে এসেছে বিছানা বরাবর। ডান হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গেল আলোর রেখা।

প্রচণ্ড এক ঝাঁকি খেয়ে অনেকটা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল বিছানা থেকে। মনে হয়েছে, এ রোদরেখা আলোর উৎস নয়; চকচকে এক ছুরির ফলা যেন পোঁচ বসিয়ে দিয়েছে হাতে।

হাত সরিয়ে নিলো গুলজার। হাতের তালুতে কোনো ক্ষত নেই। রক্ত নেই। অথচ ব্যথাটা রয়ে গেল। হঠাৎ রোদের ঢেউ থেকে কানে ভেসে এলো ধ্বনি-তরঙ্গ। ওটাকে নির্দেশ করে গুলজার প্রশ্ন করল—

‘কী মেসেজ বয়ে নিয়ে এসেছো?’

‘আমি তোমার অভিলাষ।’

ধ্বনিটা মৃদু। অথচ অস্বীকার করার উপায় নেই।

‘তোমার অভিপ্রায় পূরণের জন্য বহু আগেই জেগে উঠেছি। তুমি এখনো ঘুমিয়ে থাকলে চলবে?’

উড়তে থাকা অভিলাষের ঝোলানো লেজটা ধরার চেষ্টা করল সে। পারল না। অভিলাষ আরও দূরে সরে গেল।

তারপর শুনল কর্কশ কণ্ঠস্বর, ‘ওঠো! আমি তোমার চাহিদা। আমার মোটাসোটা চাহিদা পূরণ করতে হবে না? ঘুমিয়ে থাকলে চলবে? বেরিয়ে যাও কাজে।’

গুলজার এবার চারদিকে তাকাল। ঘরটা আগের মতোই আছে। বিছানা, টেবিল, চেয়ার, জানালা, পর্দা, সবকিছুই স্বাভাবিক। শুধু সে স্বাভাবিক নেই। উদ্ধত কণ্ঠস্বর আর ধমক খেয়ে ভেঙে না গিয়ে নিজের মাথায় হাত রাখল গুলজার। আশ্চর্য হয়ে অনুভব করল, দেহের মধ্যে আবার ফিরে এসেছে মন। কানেক্ট হয়ে গেছে দেহের প্রতিটি কোষের সঙ্গে।

আবার জোগান দিচ্ছে তার বিরামহীন আকাঙ্ক্ষার কথা। সীমাহীন চাহিদারাও হিমালয় সমান উঁচু হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে তাকিয়ে রইল। হিমালয় কি সত্যিই পাহাড়? নাকি মানুষের নিজের তৈরি এক অদৃশ্য উচ্চতা?

যত ওপরে ওঠে, তত ওপরে উঠতে হয়। এক চূড়া পেরোলেই সামনে আরেক চূড়া। এক চাহিদা পূরণ হলেই জন্ম নেয় আরেক চাহিদার। অর্জনের আনন্দ শুকিয়ে যাওয়ার আগেই নতুন ক্ষুধা চেপে ধরে পেটের নাড়িভুঁড়ি, চেপে ধরে বুকের মধ্যে অবিরাম ধুকপুক করে চলতে থাকা হৃৎপিণ্ডকেও।

তিন

গুলজার জানালার দিকে তাকাল। রোদের রেখাটা তখনও মেঝেতে পড়ে আছে। এবার ওটাকে আর ছুরির ফলা মনে হলো না। বরং মনে হলো, দূরে কোথাও যাওয়ার পথ দেখিয়ে রাখা অচেনা সরু সিঁড়ি।

সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। পেছন থেকে আবার ডাক এলো, ‘কোথায় যাচ্ছ?’

গুলজার থামল।

‘হিমালয়ে।’

‘কেন?’

সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, ‘চূড়ায় উঠতে।’

কণ্ঠস্বর হেসে উঠে বলল, ‘চূড়ায় উঠে কী করবে?’

গুলজার এবার নিজের ভেতরের দিকে তাকাল। সেখানে অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মাঝখানে ক্ষীণ এক আলো দেখতে পেল এবার। বিভ্রান্ত কিংবা উল্লসিত না হয়ে জবাব দিল, ‘দেখব চূড়ার ওপারেও কি আরেকটা হিমালয় দাঁড়িয়ে আছে?’

দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল সে। পেছনে রয়ে গেল ঘর। আর ঘরের ভেতরে, বিছানার ওপর, নিঃশব্দে পড়ে রইল তার সেই মন, কিছুক্ষণ আগে সুখী হতে চেয়েছিল, আর এখন আবার অসীমের দিকে ছুটছে সুখের সন্ধানে।

আচমকা কবিতার স্বরে প্রশ্ন হানা দিল গুলজারের মাথায়, ‘সুখকে ধরাছোঁয়া কি এত সোজা? এই জীবনের চাহিদা পূরণ করা কি এত সোজা? অতি আকাঙ্ক্ষার লাগাম টেনে ধরা কি এতই সোজা? সবাই তো সুখী হতে চায়, সুখ কি কেউ খুঁজে পায়? সুখের হিমালয়চূড়া কি হিমালয় পর্বতশৃঙ্গের চেয়েও উপরে বাস করে?’

প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই বুকের মধ্যে নতুন আলোড়ন উঠল। কে যেন ঢুকে বসেছে হৃৎপিণ্ডের কেন্দ্রে। 

টের পেয়ে গুলজার প্রশ্ন করল, ‘কে তুমি? কীভাবে ঢুকলে আমার বুকের ভেতর?’

জবাব বেরিয়ে এলো কবিতার পঙ্ক্তি পঙ্ক্তিতে ভর করে—

‘শুনেছি মাটি আর পানির সম্পর্ক 
চিরকালের শেকড় মাটিকে স্পর্শ করে
শেকড় পানিকে পায়
তোমার চোখের পানি ঝরে পড়ে
আমার মন বেদনায় ভরে যায়
এতটুকু বীজ ফুঁড়ে জেগে ওঠে অঙ্কুর
শেকড় মাটিকে স্পর্শ করে
শেকড় পানিকে পায়।’

‘এই যে দেখছি উপমহাদেশের কবি সম্পূরণ সিং কালরার কবিতা! এই মুহূর্তে এই কবিতা কেন আওড়ালে?’ বিস্ময়ে হতবিহবল হয়ে প্রশ্ন করল গুলজার।

‘তুমি ঠিক ধরেছ। আমাকে সবাই কবি গুলজার হিসেবে চেনে। তবে তোমার অস্তিত্বের মধ্যে বসে আছি আমি। তোমার সেই অস্তিত্বকে চিনতে পারছো তুমি?’

উত্তর শুনে আমাদের গল্পের গুলজারের চোখ শুকিয়ে গেল। মুখ শুকিয়ে গেল। অনুভব করল, নিজ জীবনের শেকড় পানি শূন্যতায় ভুগছে। সঙ্গে সঙ্গে তৃষ্ণায় আরও কাতর হয়ে পানি খুঁজতে লাগল; খুঁজে পাচ্ছে না জীবনের তরল নির্যাস। তার মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সব পানি নিঃশেষ হয়ে গেছে, চারিদিকে শুধু শূন্যতা; শুকনো ঠনঠনে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সে তাকিয়ে আছে অসীমের দিকে। 

অসীমের মাঝেও সে দেখতে পেল হিমালয়চূড়া সমান আকাঙ্ক্ষা আর চাহিদার লাল পতাকা উড়ছে, ডাকছে ওকে।

(তথ্যঋণ: গল্পটি লিখতে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবি গুলজারের ছোট্ট একটি কবিতা এখানে ব্যবহার করা হয়েছে।)