ডেঙ্গুতে এ বছর ২৮১ মৃত্যু, ২৬ বছরে তৃতীয় সর্বোচ্চ
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই রোগে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮১ জনে দাঁড়িয়েছে। গত ২৬ বছরে ডেঙ্গুতে বার্ষিক মৃত্যুর হিসাবে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি পর্যালোচনায় গুরুতর কিছু তথ্য উঠে এসেছে।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকীর নেতৃত্বে ১১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এক দিনের মধ্যেই মারা গেছেন।
পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে। ৩১ দশমিক ২ শতাংশ মারা গেছেন এক্সপানডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমে। ১৬ দশমিক ১ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতায়। আর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী মারা গেছেন অন্য কারণে।
অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকী বলেন, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু শনাক্ত হতে অন্তত তিন দিন দেরি হয়েছে।
চিকিৎসাবিদ অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, বারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া, রোগ শনাক্তে দেরি এবং রোগটির উপসর্গের ধরনে পরিবর্তন, সব মিলিয়ে গুরুতর রোগী ও মৃত্যু বাড়ছে।
তিনি বলেন, আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরবর্তী সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে।
তার মতে, ডেঙ্গুর চারটি ধরন (সেরোটাইপ) রয়েছে। প্রথমবার আক্রান্ত হলে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। জ্বর বা অন্যান্য উপসর্গকে সাধারণ সর্দি-জ্বর বা অন্য কোনো অসুস্থতা মনে করে অনেকে চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে যান।
তবে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে রোগের তীব্রতা বাড়তে পারে বলে জানান অধ্যাপক আব্দুল্লাহ।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু এখন আগে ভাগে শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জ্বরের মাত্রা কম থাকে এবং এক-দুই দিন জ্বর, শরীর ব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া বা কাশির মতো সাধারণ উপসর্গ দেখা যায়।
ফলে অনেকে এসব উপসর্গকে গুরুত্ব দেন না। চিকিৎসকের কাছে যান তখনই, যখন শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করেছে।
অধ্যাপক আব্দুল্লাহ বলেন, সমস্যা হলো রোগীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তাদের ডেঙ্গু হয়েছে। রোগ শনাক্ত হওয়ার সময় তাদের অবস্থা গুরুতর হয়ে যেতে পারে। তখন চিকিৎসকদের আর তেমন কিছুই করার থাকে না।
ডেঙ্গুর প্রকোপ চলাকালে জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, সর্দি বা অন্য কোনো মৃদু উপসর্গ দেখা দিলেও ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন তিনি।
জাতীয় ডেঙ্গু চিকিৎসা নির্দেশিকা বা গাইডলাইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক অধ্যাপক এইচ এম নাজমুল আহসান।
তিনি বলেন, রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসা ঠিক করতে হবে। প্লেটলেটের মাত্রা কমে গেলেই প্লেটলেট দিতে হবে বিষয়টি এমন না।
এই অধ্যাপক আরও বলেন, অপ্রয়োজনে প্লেটলেট দেওয়া, ভুলভাবে তরল বা স্যালাইন দেওয়া এবং অতিরিক্ত তরল শরীরে প্রবেশ করানো থেকেও নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে এগুলো মৃত্যুর কারণও হয়।
ডেঙ্গু পরীক্ষা আরও সহজলভ্য করার ব্যাপারে জোর দেন অধ্যাপক নাজমুল। বিশেষ করে শহর ও গ্রামাঞ্চলের নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহজে পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও ১ হাজার ৯৯৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা এ বছর এক দিনে সর্বোচ্চ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছর মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। আর ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে মারা যান ২৮১ জন।


