ট্রাম্প-শি’র রাজকীয় ভোজ: কী ছিল মেন্যুতে, কেমন ছিল খাদ্য কূটনীতি?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের প্রথম দিনে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, গার্ড অব অনারসহ সবকিছুকে ছাড়িয়ে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে ‘স্টেট ব্যানকেট’ বা রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ।

বার্তাসংস্থা এপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেট হল অব দ্য পিপলে জাঁকজমকপূর্ণ এ ভোজসভায় ট্রাম্পকে স্বাগত জানানো হয় ভিন্ন এক চমক দিয়ে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠে তার প্রিয় গান ‘ওয়াইএমসিএ’।

আমেরিকান ডিস্কো গ্রুপ ‘ভিলেজ পিপল’ ব্যান্ডের ‘ওয়াইএমসিএ’ গানটি বেইজিং বাজিয়েছে চীনা সামরিক ব্যান্ড।  

ট্রাম্প সাধারণত এই গানের সঙ্গে হালকা নাচের ভঙ্গিতে হাত নাড়িয়ে মঞ্চ ছাড়েন, যা তার সমর্থকদের কাছে বেশ পরিচিত দৃশ্য। বহু বছর ধরে ট্রাম্পের নির্বাচনী সমাবেশ ও বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তের ‘সিগনেচার’ সংগীতও ছিল ‘ওয়াইএমসিএ’।

ছবি: এএপপি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

 

এর আগে ২০১৭ সালেও ট্রাম্পকে মুগ্ধ করতে তার প্রিয় গান ‘দ্য স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস ফরেভার’ গানটি বাজিয়েছিল চীন।

নৈশভোজের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্লাস তুলে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

টেবিলে সাজানো চীনের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মেন্যু যেন হয়ে ওঠে এক ধরনের কূটনৈতিক বার্তা।

চীনের রাষ্ট্রীয় ভোজসভা মানে ‘হুয়াইয়াং’ খাবার থাকবেই। সাংহাই অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী রান্না মূলত এর হালকা ও সূক্ষ্ম স্বাদ, নিখুঁত কাটাকাটির কৌশল এবং মৌসুমি উপকরণের ব্যবহারের জন্য সুপরিচিত।

 

মার্কিন অতিথিদের কথা মাথায় রেখে এবার বিশেষ জোর দেওয়া হয় ডেজার্টে। তিরামিসু, ফল, আইসক্রিম ও শিঙার খোলের আকৃতির বিশেষ পেস্ট্রি সবার নজর কাড়ে।

রাষ্ট্রীয় ভোজের মেন্যুতে সাধারণত যা থাকে—‘লায়ন্স হেড’ নামের নরম শূকরের মাংসের বল, ইয়াংঝৌ ফ্রাইড রাইস, মিষ্টি-টক সসে ভাজা ‘স্কুইরেল ফিশ’, হাজারো সূক্ষ্ম সুতোয় কাটা টোফু দিয়ে তৈরি ‘ওয়েনসি টোফু’, ইয়াংজি নদীর ইল মাছ ও বাঁশকুঁড়ি, মুচমুচে গরুর পাঁজরের মাংস, বেইজিং রোস্ট হাঁস, টমেটো স্যুপে লবস্টার, সরিষার সসে স্যামন ও মৌসুমি সবজির স্টু ইত্যাদি।

চীনের এসব খাবারে মসলার ব্যবহার খুব কম থাকে, যেন স্বাভাবিক স্বাদ বজায় থাকে।

খাবার যখন কূটনৈতিক অস্ত্র

দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অতিথিদের আপ্যায়নে খাবারকে প্রতীকী কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে চীন। চীনা সংস্কৃতিতে খাবারকে বিশেষ মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

দেশটির আধুনিক ইতিহাসে দুর্ভিক্ষ ও দীর্ঘদিনের রেশনিং ব্যবস্থার কারণে আলাদা মর্যাদা পেয়েছে খাবার।

বিদেশি নেতাদের চীন সফরে এসে খাবার নিয়ে নানা আলোচিত ঘটনাও ঘটেছে অতীতে।

ছবি: সংগৃহীত

 

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন বেইজিংয়ের একটি ইউনান রেস্টুরেন্টে ‘ম্যাজিক মাশরুম’ খাওয়ার ঘটনা নিয়ে রসিকতা করেছিলেন।

আর ২০১১ সালে তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বেইজিংয়ের একটি সাধারণ খাবারের দোকানে গিয়ে বিখ্যাত ভাজা লিভার খেয়েছিলেন।

চীনের আটটি প্রধান আঞ্চলিক রান্নার মধ্যে অন্যতম হুয়াইয়াং। দীর্ঘদিন ধরেই সব বড় কূটনৈতিক আয়োজনে এর উপস্থিতি রয়েছে।

১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ভোজসভা, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান ও ২০০২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সম্মানে আয়োজিত ভোজসভাতেও এই খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল।

সাংহাইয়ের অভিজাত হুয়াইয়াং রেস্টুরেন্ট ‘গুই হুয়া লৌ’র প্রধান শেফ শি কিয়াং বলেন, ‘হুয়াইয়াং খাবারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সর্বজন গ্রহণযোগ্যতা। এর স্বাদ সবারই ভালো লাগে। এমনকি বিদেশি অতিথিরাও হুয়াইয়াং খাবার সাদরে গ্রহণ করেছে।’

অতিথিদের নামে খাবারের নাম

চীন সফরকারী বিশিষ্ট অতিথিদের নামে খাবারের নামকরণও করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।

১৯৭১ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের গোপন চীন সফরের সময় তার জন্য বিশেষ এক ধরনের মুরগির রেসিপি তৈরি করা হয়েছিল। পরে তার নামেই ওই রেসিপির নামকরণ করা হয়।