দাসপ্রথা ফেরাল তালেবান, আফগান নারীরা এখন কেমন আছে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

এক শতাব্দী আগে যে আফগানিস্তান ‘দাসপ্রথা’ বিলুপ্ত করে মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি প্রগতিশীল উদাহরণ তৈরি করেছিল, আজ সেই দেশের আইনে আবার ফিরে এসেছে ‘দাস’ শব্দটি। তালেবানদের নতুন ফৌজদারি আইনে মুক্ত মানুষ ও দাসের মধ্যে পার্থক্য টেনে দেওয়া শুধু একটি শব্দচয়নের বিষয় নয়, এটি আফগান সমাজের গভীর পশ্চাদপসরণ ও মানবাধিকারের ভাঙনের প্রতীক।

এই আইনি পরিবর্তনের ছায়ায় আরও অদৃশ্য হয়ে পড়ছে আফগান নারীদের জীবন, শিক্ষা, চিকিৎসা, কাজ, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সব ক্ষেত্রেই তারা আজ প্রায় পুরোপুরি প্রান্তিক। দাসত্বের ভাষা ফিরে আসা এবং নারীদের অধিকার বিলুপ্তির এই যুগপৎ বাস্তবতা আফগানিস্তানকে কোন অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা সময়ই বলে দেবে।

দাসপ্রথা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তানে দাসপ্রথা নিয়ে আইনি অবস্থানে এক নাটকীয় ও উদ্বেগজনক পরিবর্তন ঘটেছে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর দেশটির নতুন আইনি কাঠামোতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর আবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দাস’ শব্দটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আফগান আইনের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

তুর্কি টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুতে তালেবান কর্তৃপক্ষ একটি নতুন ফৌজদারি আইন অনুমোদন করে। এই আইনের একাধিক ধারায় স্পষ্টভাবে ‘মুক্ত ব্যক্তি’ ও ‘দাস’-এর মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে, ফলে কার্যত দাসত্বকে একটি স্বীকৃত আইনি শ্রেণি হিসেবে হাজির করা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে, তালেবানদের এই আইনের ১৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যে অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি (হুদুদ) নেই, সে ক্ষেত্রে অপরাধীকে বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তি (তাজির) দেওয়া হবে, ‘অপরাধী মুক্ত হোক বা দাস’ উভয় ক্ষেত্রেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, আইনে ‘দাস’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে তালেবানরা এমন একটি মর্যাদাকে বৈধতা দিচ্ছে, যা আফগানিস্তানে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

এই পরিবর্তন আফগানিস্তানের আগের আইনি কাঠামোর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কয়েক দশক ধরে দেশটির কোনো সংবিধান বা দণ্ডবিধিতে দাসপ্রথার অস্তিত্ব স্বীকৃত ছিল না।

দ্য ডিপ্লোমেট বলছে, প্রথম নজরে এই ফৌজদারি আইনটি একটি সাধারণ আইনি কাঠামোর মতো মনে হতে পারে। কিন্তু এই আইনের লক্ষ্য নাগরিকদের সুরক্ষা নয়, বরং তাদের নিয়ন্ত্রণ করা।

যা জানা জরুরি

আফগানিস্তানে দাসপ্রথা আইনগতভাবে বিলুপ্ত হয় ১৯২৩ সালে, রাজা আমানুল্লাহ খানের শাসনামলে। এরপর এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে প্রতিটি সংবিধানেই এই নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল।

তালেবানদের ২০২৬ সালের ফৌজদারি আইনে আবার ‘দাস’ শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছে, যা ইসলামি ও আন্তর্জাতিক দাসবিরোধী নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে যে আজকের দুনিয়ায় দাসপ্রথার কোনো বৈধতা নেই, ইসলাম ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও মানুষের মুক্তিকে উৎসাহিত করে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তালেবানরা প্রকাশ্যে দাস রাখার প্রথা পুনর্বহালের ঘোষণা দেয়নি। তবে আইনি নথিতে ‘দাস’ শব্দের অন্তর্ভুক্তি প্রতীকীভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং আধুনিক মুসলিম বিশ্বের সেই ঐকমত্য থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে দাসপ্রথাকে মানব মর্যাদা ও ইসলামি নীতির পরিপন্থী বলে বিবেচনা করা হয়।

বাস্তবতা হলো, মুসলিম দেশগুলোসহ বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র দাসপ্রথা অবৈধ ও নিন্দিত। তালেবানদের এই শব্দচয়ন দেশ-বিদেশে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কীভাবে আফগানিস্তান এই অবস্থায় এসে পৌঁছাল, তা বোঝার জন্য দেশটির দাসপ্রথার আইনি ইতিহাস জানা জরুরি।

ইসলামি আইন ও আফগান ইতিহাসে দাসপ্রথা

ইসলামি আইনের প্রেক্ষাপটে, ধ্রুপদী শরিয়াহ সীমিত কিছু ক্ষেত্রে দাসপ্রথার অনুমতি দিয়েছিল মূলত যুদ্ধের ফল হিসেবে। সুন্নি ও শিয়া উভয় ধারার ঐতিহাসিক ফকিহরা (ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহ শাস্ত্রে পারদর্শী বিশেষজ্ঞ বা আইনজ্ঞ) একমত ছিলেন যে, বৈধ যুদ্ধে বন্দী অমুসলিমদের দাসে পরিণত করা যেতে পারে, তবে কোনো মুক্ত মুসলমানকে দাস বানানো নিষিদ্ধ। সপ্তম শতাব্দী থেকে ইসলামি ফিকহে দাসদের অধিকার, মানবিক আচরণ এবং তাদের মুক্ত করার নানান বিধান তৈরি হয়।

পবিত্র কোরআনে দাসদের সঙ্গে মানবিক আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং মুক্তির পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সূরা নূরের ৩৩ নম্বর আয়াতে দাসদের মুক্তিপণের মাধ্যমে মুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আফগানিস্তানসহ প্রাক-আধুনিক মুসলিম সমাজে দাসপ্রথা একটি স্বীকৃত সামাজিক বাস্তবতা ছিল, যদিও তা ধর্মীয় নিয়মে সীমাবদ্ধ ছিল। কোনো মুসলমানকে দাস করা নিষিদ্ধ ছিল এবং দাসের ওপর নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে দেখা হতো।

ঐতিহাসিকভাবে আফগান ভূখণ্ডে দাসরা সাধারণত যুদ্ধবন্দী বা ঋণদাস হতেন। তারা গৃহকর্মী, শ্রমিক কিংবা সৈনিক হিসেবে কাজ করতেন। আমেরিকার মতো বৃহৎ কৃষিভিত্তিক দাসপ্রথা এখানে ছিল না, তবে দাসত্ব অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ঠুর ছিল। বিশেষ করে উনিশ শতকে দাস বেচাকেনার ঘটনা ঘটেছে।

এর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ ১৮৯১–৯৩ সালের হাজারা যুদ্ধ। আমির আবদুর রহমান খান হাজারা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নির্মম অভিযান চালান। ঐতিহাসিকদের মতে, হাজারা জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি মানুষ নিহত, বাস্তুচ্যুত বা দাসে পরিণত হয়। হাজার হাজার হাজারা নারী-পুরুষ ও শিশুকে কাবুল ও কান্দাহারের বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। এই অধ্যায় আফগান ইতিহাসে দাসপ্রথার সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিকটি প্রকাশ করে।

১৯২৩ সালের সংস্কার: দাসপ্রথার বিলুপ্তি

দাসপ্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে রাজা আমানুল্লাহ খানের (১৯১৯–১৯২৯) শাসনামলে। তিনি আফগানিস্তানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশটিকে আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। তার সংস্কারের অন্যতম প্রধান দিক ছিল দাসপ্রথা বিলুপ্তি।

১৯২৩ সালের আফগানিস্তানের প্রথম সংবিধানে দাসপ্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। সংবিধানের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়:
‘আফগানিস্তানে দাসপ্রথা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত। কোনো নারী বা পুরুষ অন্য কাউকে দাস হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।’

এটি আফগান ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দাসত্বকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করে। ইসলামি আধুনিকতাবাদের আলোকে এই সিদ্ধান্তকে ন্যায় ও মানবসমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে ব্যাখ্যা করা হয়।

পরবর্তী শাসকরাও এই নীতি বজায় রাখেন। ১৯৩১ সালের সংবিধানেও দাসপ্রথা নিষিদ্ধ থাকে। এরপর ১৯৬৪, ১৯৭৭, ১৯৮০ এবং ২০০৪ সালের সংবিধানগুলোতেও মানুষের স্বাধীনতা ও সমতার ওপর জোর দেওয়া হয়। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আফগান সমাজে দাসপ্রথা কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও আধুনিক ইসলামি ঐকমত্য

আফগানিস্তান ১৯২৬ সালের দাসপ্রথা-বিরোধী কনভেনশন এবং ১৯৬৬ সালের সম্পূরক কনভেনশনে যোগ দেয়। পাশাপাশি মানবাধিকার সনদ ও নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিতেও দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয়।

বিশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ সব মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে। আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, দাসপ্রথা বিলুপ্তি ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্য—ন্যায়, স্বাধীনতা ও মানব মর্যাদার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তালেবান শাসনামল: বিতর্কিত আইনি পশ্চাদপসরণ

১৯৯৬–২০০১ সালের তালেবান শাসনামলেও দাসপ্রথা আইনগতভাবে পুনর্বহাল হয়নি। কিন্তু ২০২৬ সালে প্রণীত নতুন তালেবান ফৌজদারি আইনে আবার ‘দাস’ শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছে।

এই আইন দাস ধরার বা বেচাকেনার অনুমতি দেয় না ঠিকই, তবে দাসত্বকে একটি সম্ভাব্য আইনি অবস্থা হিসেবে স্বীকার করে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ দাসপ্রথা এমন একটি অপরাধ, যা কোনো অবস্থাতেই বৈধ হতে পারে না।

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকেও তালেবানদের এই অবস্থান সমালোচিত হয়েছে। আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, দাসপ্রথা ছিল একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা, যা ইসলাম ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করতে চেয়েছে।

আফগানিস্তানে দাসপ্রথার ইতিহাস এক গভীর দ্বন্দ্বের (ঐতিহ্য বনাম ন্যায় ও মানবিক মর্যাদার আধুনিক ধারণার) প্রতিফলন। এক শতাব্দী আগে যে দেশ দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে উদাহরণ তৈরি করেছিল, আজ সেখানে আবার আইনে ‘দাস’ শব্দের প্রত্যাবর্তন গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজা আমানুল্লাহ খানের সেই দাসমুক্ত আফগানিস্তানের আদর্শ এখনো প্রাসঙ্গিক। তা শুধু আধুনিক মানবাধিকারের সঙ্গেই নয়, পবিত্র কোরআনের সেই মূল দর্শনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে সব মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন।

আফগানিস্তানে নারী হওয়ার বাস্তবতা

আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর থেকে তালেবানদের ডি ফ্যাক্টো কর্তৃপক্ষ (ডিএফএ) নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার কেড়ে নিতে একের পর এক নির্দেশনা জারি করেছে—শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাচলের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে জনজীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার পর্যন্ত।

বর্তমানে আফগানিস্তানে মেয়েরা মাধ্যমিক শিক্ষায় যেতে পারে না। নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিষিদ্ধ। অধিকাংশ চাকরি, এমনকি পার্ক, জিম ও ক্রীড়াকেন্দ্রের মতো জনসমাগমস্থলেও তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

এর পাশাপাশি চলমান মানবিক সংকট ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি সবার জীবনই কঠিন করে তুলেছে, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী ও কন্যাশিশুরা।

কিন্তু বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগের নয়। জাতিসংঘ নারী সংস্থার ২০২৪ সালের ‘আফগানিস্তান জেন্ডার ইনডেক্স’ দেখাচ্ছে, নারীর অধিকার সংকট যত গভীর হচ্ছে, তত দ্রুত আফগানিস্তানের সামগ্রিক অবনমন ঘটছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

নিচে তথ্যের আলোকে তুলে ধরা হলো পরিস্থিতির চিত্র এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ।

আফগান নারীরা কি স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন?

আফগান নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর ভয়, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, শিক্ষাব্যবস্থার ধস এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য নারী ও কন্যাশিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করছে।

অনেক নারী ভয়ের কারণে ঘর থেকেই বের হতে পারেন না। যারা বের হন, তাদের অনেক সময় মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ক্লিনিকে যেতে হয়, কিন্তু সেখানে গিয়ে কেবল নারী হওয়ার কারণেই চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে আসতে হয়।

কিছু প্রদেশে পুরুষ চিকিৎসকের কাছে নারী রোগীর চিকিৎসা নিষিদ্ধ। অথচ নারী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও ক্রমেই কমছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তালেবান কর্তৃপক্ষ নারীদের মেডিসিন ও ধাত্রীবিদ্যা পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, ফলে নারী চিকিৎসক হওয়ার শেষ সুযোগটিও বন্ধ হয়ে যায়।

এর ফলাফল ভয়াবহ। নারীরা আগের তুলনায় কম সুস্থ ও কম আয়ু নিয়ে বেঁচে আছেন। মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে, বিশেষ করে বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরী মাতৃত্বের হার বেড়ে যাওয়ায়। অধিকাংশ নারী নিজের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতেও পারেন না, সে দায়িত্ব চলে গেছে পুরুষ আত্মীয়দের হাতে।

ঘরে বন্দি থাকার ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। শারীরিক ব্যায়াম, সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক সহায়তার অভাবে নারী ও কন্যাশিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও নিরাশা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের নারীদের মতোই আফগান নারীরাও অর্থনৈতিক সংকটে নিজের স্বাস্থ্যের চেয়ে সন্তান ও পরিবারের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

আফগানিস্তানে মেয়েরা কেন স্কুলে যেতে পারে না?

ষষ্ঠ শ্রেণির শেষ দিনে স্কুলের গেট দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধিকাংশ আফগান কন্যাশিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হয়ে যায়। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তালেবান মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

তবে সংকট শুরু হয় আরও আগে। দারিদ্র্য, কড়া লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক রীতি ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ আফগান মেয়ে কখনোই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। অর্থনৈতিক সংকটে অনেক পরিবার ছেলে-মেয়ে উভয়কেই স্কুল থেকে নিয়ে আয় রোজগারে নামায় বা বাল্যবিবাহের প্রস্তুতি নিতে বাধ্য হয়, যার হার দিন দিন বাড়ছে।

কিছু অনানুষ্ঠানিক বা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম থাকলেও তা খুব অল্পসংখ্যক মেয়ের কাছে পৌঁছায় এবং কখনোই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার বিকল্প নয়। এসব পথ উচ্চশিক্ষা বা চাকরির সুযোগও তৈরি করে না।

এর প্রভাব মারাত্মক—

৭৮ শতাংশ তরুণ আফগান নারী শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন, যা তরুণ পুরুষদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। ২০২৬ সালের মধ্যে কিশোরী মাতৃত্ব ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। মাতৃমৃত্যুর হার ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ রাখার ফলে আফগানিস্তান প্রতিবছর জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারাচ্ছে।

এটি কেবল স্কুল বন্ধ থাকার গল্প নয়, এটি হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ, জীবিকা ও দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়া সমাজের গল্প।

আফগান নারীরা কি কাজ করতে পারেন?

বর্তমানে আফগানিস্তানে বিশ্বের অন্যতম বড় শ্রমবাজারভিত্তিক লিঙ্গ বৈষম্য বিদ্যমান। ২৫ শতাংশ নারী কাজ করছেন বা কাজ খুঁজছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশ।

এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। তালেবানরা সরকারি চাকরি, দেশি-বিদেশি এনজিও এবং বিউটি সেলুনের মতো খাতে নারীদের কাজ নিষিদ্ধ করেছে, যেগুলো একসময় নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল।

যেসব নারী কাজ করছেন, তাদের বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক খাতে কম আয়ের ও অনিশ্চিত কাজে বাধ্য হচ্ছেন। আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকারও সীমিত, ৭ শতাংশেরও কম আফগান নারীর ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল মানি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

নারী নেতৃত্বাধীন নাগরিক সংগঠনগুলোও চরম চাপে পড়েছে। তালেবানরা নারী এনজিওকর্মীদের নিষিদ্ধ করেছে, নেতৃত্ব থেকে নারীদের সরিয়ে দিয়েছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প নথিতে ‘নারী’ শব্দের বদলে ‘পুরুষ’ শব্দ ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে। ফলে বহু নারী সংগঠন বন্ধ হয়ে গেছে বা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে কমিয়ে এনেছে।

আফগানিস্তানে নারীরা কি রাজনীতিতে অংশ নিতে পারেন?

বর্তমানে আফগানিস্তানের আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে নারীদের কোনো স্থান নেই। ২০২০ সালে যেখানে সংসদের ২৫ শতাংশের বেশি আসনে নারী ছিলেন এবং প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন, সেখানে এখন তালেবান মন্ত্রিসভায় একজন নারীও নেই।

কিছু নারী অনানুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিজেদের কমিউনিটি ও সংগঠনের পক্ষে কথা বলছেন। তবে এটি সমান প্রতিনিধিত্বের বিকল্প নয়।

রাষ্ট্রের কোথাও নারী নেতৃত্বের কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই, না টেলিভিশনে, না সরকারি অনুষ্ঠানে। মেয়েদের কাছে বার্তাটি স্পষ্ট: নেতৃত্ব তোমাদের জন্য নয়।

এমনকি পারিবারিক পরিসরেও নারীদের প্রভাব কমে যাচ্ছে। জাতিসংঘ নারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিজেদের পরিবারে সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখার সক্ষমতা আছে বলে মনে করেন, এমন নারীর সংখ্যা ৬০ শতাংশ কমে গেছে।

আফগানিস্তানে নারী হওয়া কি নিরাপদ?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না এবং ঝুঁকি বাড়ছেই।

সারাদেশে নির্ভরযোগ্যভাবে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার তথ্য সংগ্রহ এখন আর সম্ভব নয়। তবে বিদ্যমান তথ্য ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। ২০১৮ সালে প্রতি তিনজন আফগান নারীর মধ্যে একজন গত এক বছরে স্বামী বা সঙ্গীর কাছ থেকে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন।

২০২১ সালের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা এবং সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের আইন ও সেবা ভেঙে পড়ায় সহিংসতা বেড়ে চলেছে।

চলাচলের নিষেধাজ্ঞা নারীদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। অনেক এলাকায় নারীদের ঘরের বাইরে যেতে হলে পুরুষ অভিভাবক সঙ্গে থাকতে হয়, এমনকি অল্প দূরত্বের জন্যও। বিধবা বা পুরুষ আত্মীয়হীন নারীদের খাদ্য বা চিকিৎসার জন্য বের হওয়াটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

বাল্যবিবাহ, জোরপূর্বক ও অল্প বয়সে বিয়ের হারও বাড়ছে। ২০২৩ সালে ১৮ বছরের নিচে প্রায় ৩০ শতাংশ আফগান মেয়ের বিয়ে হয়েছে, যার মধ্যে ১০ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছরেরও কম। দারিদ্র্যের চাপে অনেক পরিবার এটিকে টিকে থাকার কৌশল হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

তবুও কি নারীদের কোনো প্রভাব আছে?

চরম বিধিনিষেধের মধ্যেও আফগান নারী ও কন্যাশিশুরা পথ খুঁজে নিচ্ছেন।

তারা এখনো ব্যবসা চালাচ্ছেন, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে কাজ করছেন, সাংবাদিকতা করছেন এবং কমিউনিটি নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সব বাধা সত্ত্বেও তারা নিজেদের এবং সব আফগানের অধিকার নিয়ে কথা বলা চালিয়ে যাচ্ছেন।