এপস্টিন ফাইলস: গণিতে আগ্রহ, অর্থের নেশা ও অন্ধকার অধ্যায়
নিউইউর্কের ব্রুকলিনে ১৯৫৩ সালে সাধারণ এক পরিবারে জন্ম তার। সেখানেই বেড়ে ওঠা। এরপর স্কুলশিক্ষক থেকে ধনকুবের বনে যাওয়া। ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে ওঠাবসা, অপরাধে জড়ানো আর বিতর্ক। শেষে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে মৃত্যু। যত ছোট পরিসরে গল্পটা বলা হলো, আসলে এপস্টিনের গল্প ততটা ছোট নয়।
মার্কিন বিচার বিভাগ সম্প্রতি কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক এপস্টিন-সম্পর্কিত বিপুল সংখ্যক নথি প্রকাশ করেছে। এসব নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে এপস্টিন নথির আলোচনা সামনে এলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশে রাজি ছিলেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ভুক্তভোগীদের আপত্তি আর নিজের রিপাবলিকান পার্টির চাপের মুখে মত পাল্টাতে বাধ্য হন তিনি। পরে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ— প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে এপস্টিন-সংক্রান্ত বিলটি বিপুল ভোটে পাস হয়। গত বছরের নভেম্বরে ট্রাম্প ওই বিলে সই করলে আইন অনুযায়ী সেসব নথি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।
এপস্টিন নথির প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠা, এক লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং দুই হাজার ভিডিও গত শুক্রবার প্রকাশ করা হয়। এসব নথিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ছাড়াও সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক, সাবেক ব্রিটিশ প্রিন্স অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর, সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী লর্ড ম্যান্ডেলসনসহ প্রভাবশালী বহু ব্যক্তির নাম এসেছে।
নথিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উঠে আসায় বিভিন্ন অঙ্গনে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। কে কখন কোন বিতর্কের মুখে পড়বেন, সেই অনিশ্চয়তা আর ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বিশিষ্টজনদের। অনেকে নাম আসায় নানা কৌশলও অবলম্বন করছেন। যেমন— যুক্তরাজ্যে নিজের লেবার পার্টিকে বিতর্কের হাত থেকে বাঁচাতে দলের সদস্যপদই ছেড়ে
দিয়েছেন ম্যান্ডেলসন। আবার এপস্টিন সংক্রান্ত তদন্তে সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়েছেন ক্লিনটন ও হিলারি ক্লিনটন।
সাধারণ পরিবারে জন্ম, শিক্ষকতা দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু
এপস্টিনের জন্ম নিউইয়র্কের কনি আইল্যান্ডে। তার বাবা সেমুর ও মা পাউলার পূর্বসূরিরা ছিলেন ইহুদি অভিবাসী। ব্রুকলিনের কনি আইল্যান্ডের শেষ প্রান্তের সি গেট এলাকায় শিশু এপস্টেইনের বেড়ে ওঠা। ১৯৫০-৬০ এর দশকে ওই এলাকায় ইহুদি মধ্যবিত্তদের বসবাস ছিল। তার পরিবার তখন স্থানীয় সিনাগগের ঠিক বিপরীত পাশের ভাড়া করা একটি বাড়িতে বসবাস করত।
এপস্টিনের বাবা সেমুর নিউইয়র্ক সিটির পার্কস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন ডিপার্টমেন্টে মালি ও মাঠপরিচর্যাকারী হিসেবে কাজ করতেন। তার মা ছিলেন গৃহিনী। এপস্টিনের যখন জন্ম হয়, তখন হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি—সাধারণ ঘরের ছেলেটিই একদিন ওয়াল স্ট্রিটের প্রভাবশালী মানি ম্যানেজার হয়ে বিপুল সম্পদ অর্জন করবে এবং পরে কুখ্যাত হয়ে উঠবেন।
অ্যালেক্স ক্রস সিরিজের লেখক জেমস প্যাটার এবং সাংবাদিক জন কনোলি ও টিম ম্যালয় এপস্টিনকে নিয়ে ‘ফিলথি রিচ’ নামে একটি বই লেখেন, যাতে তার ছোটবেলার নানা তথ্য উঠে এসেছে। এপস্টিন ও তার ভাই মার্ক—দুজনই ছিলেন মেধাবী ছাত্র, বিশেষ করে গণিতে তাদের বেশ আগ্রহ ছিল। অল্প বয়সেই এপস্টিন পিয়ানো শেখা শুরু করেন। সংগীত প্রতিভার জন্য বন্ধুমহলে জনপ্রিয় ছিলেন তিনি।
হাইস্কুল জীবনে এপস্টিন ছিলেন শান্ত, কোমল ও সংযত। বন্ধুদের চোখে তিনি ছিলেন স্নেহশীল ও উদার মনের মানুষ। তারা আদর করে তাকে ডাকতেন ‘এপি’ বলে।
নিউইয়র্কের গ্রেভসেন্ড এলাকার লাফায়েট হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন এপস্টিন। সেখানে ইতালিয়ান, ইহুদি ও আফ্রিকান-আমেরিকান সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান ছিল। তবে সেই সময় দক্ষিণ ব্রুকলিনে বিশেষ করে লাফায়েট এলাকায় ইহুদিদের অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হতো।
লাফায়েটের এক সাবেক শিক্ষার্থী স্মৃতিচারণায় প্যাটারসন ও তার সহলেখকদের বলেন, স্কুলটিতে তখন বেশ অস্থিরতা ছিল। এটি ছিল মূলত শ্রমজীবী অধ্যুষিত এলাকা, যেখানে একসময় প্রায় ৯০ শতাংশ বাসিন্দাই ছিলেন ইতালীয়। পরে কিছু ইহুদি পরিবার সেখানে বসতি গড়ে তোলে, আর তাতেই বিদ্বেষের সূত্রপাত হয়। অনেক ইতালীয়ই চাইতেন না, ইহুদিরা সেখানে থাকুক।
নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের ‘জেফরি এপস্টিন: ইন্টারন্যাশনাল মানিম্যান অব মিস্টেরি’ নিবন্ধ অনুযায়ী, ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে কুপার ইউনিয়নে পদার্থবিজ্ঞানের কিছু কোর্স করেন এপস্টিন। পরে ১৯৭১ সালে তিনি সেখান থেকে সরে গিয়ে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির কুরাঁ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন, যেখানে হৃদ্যন্ত্রের গাণিতিক শারীরবিদ্যা (ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিওলজি অব দ্য হার্ট) বিষয়ে পড়াশোনা করেন।
তবে সেখান থেকেও কোনো ডিগ্রি ছাড়াই বেরিয়ে যান। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালের দিকে এপস্টিন ম্যানহাটনের মর্যাদাপূর্ণ প্রিপারেটরি স্কুল-ডালটন স্কুলে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত পড়াতেন।
উত্থানের গল্প
এপস্টিনের এক শিক্ষার্থীর বাবা কাজ করতেন ওয়াল স্ট্রিটে। তার প্রতি তিনি বেশ মুগ্ধ হয়ে সরাসরি বলেছিলেন, ‘আপনি ডালটনে গণিত পড়াচ্ছেন কেন? আপনার তো ওয়াল স্ট্রিটে কাজ করা উচিত। আমার বন্ধু এস গ্রিনবার্গকে কল দিন না।’
তখন আর্থিক বিনিয়োগ সংস্থা বেয়ার স্টার্নসের সিনিয়র পার্টনার গ্রিনবার্গ বরাবরই বিশ্বাস করতেন—ঝুঁকি নিতে আগ্রহী, মেধাবী, কিন্তু নামকরা ডিগ্রিবিহীন তরুণরাই সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। এমন কর্মীদের জন্য তাদের একটি নামও ছিল (পিএসডি—দরিদ্র, মেধাবী এবং ধনী হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা)। এই বর্ণনা এপস্টিনের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
১৯৭৬ সালে এপস্টিন সবকিছু ছেড়ে আমেরিকান বিনিয়োগ ব্যাংক বেয়ার স্টার্নসে যোগ দেন। সেখানে তিনি আমেরিকান স্টক এক্সচেঞ্জে একজন ফ্লোর ট্রেডারের জুনিয়র সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার উত্থান ঘটে।
সেই সময়ে অপশনস ট্রেডিং ছিল জটিল ও কম-বোঝার একটি ক্ষেত্র। এটা তখন মাত্রই জনপ্রিয় হওয়া শুরু করেছে। অপশনসের মূল্য নির্ধারণ করতে ব্ল্যাক–স্কোলস অপশন প্রাইসিং মডেলের মতো জটিল গাণিতিক সূত্র আয়ত্ত করতে হতো। এপস্টিনের জন্য এসব ছিল এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি নিজের ক্লায়েন্ট তালিকা তৈরি করে ফেলেন।
১৯৮০ সালে এপস্টিন বেয়ার স্টার্নসের পার্টনার হন, তবে ১৯৮১ সালের মধ্যেই তিনি প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দেন। আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় কাজ করা তার জন্য উপযুক্ত ছিল না। তাছাড়া, বিপুল অর্থের সংস্পর্শে এসে তিনি বুঝতে পারেন, নিজের জন্য বড় কিছু করার সময় এসে গেছে।
১৯৮২ সালে এপস্টিন নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাকে নিয়ে প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, ১৯৮২ সালেই তিনি দ্রুত ধনী ক্লায়েন্ট জোগাড় করতে শুরু করেন। তার কোম্পানির কোনো বড় প্রচারণা, কোনো ঝাঁকজমকপূর্ণ মার্কেটিং ছিল না। কোম্পানির পক্ষ থেকে শুধু এতটুকুই বলা হতো, এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ থাকলেই জেফরি এপস্টিনের দরজা খোলা।
শুরু থেকেই তার ব্যবসা ছিল সফল। তবে এপস্টিনের সঙ্গে বিনিয়োগ করতে হলে কঠোর শর্ত মানতে হতো। তিনি ক্লায়েন্টের বিলিয়ন ডলারের সম্পদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতেন, একটি নির্দিষ্ট ফি আদায় করতেন এবং প্রয়োজন মনে করলে সব ধরনের আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনি ক্ষমতাও রাখতেন। তিনি এক বিলিয়ন ডলারের ন্যূনতম সীমা কঠোরভাবে বজায় রাখতেন।
এপস্টিন কম লোক নিয়েই কার্যক্রম চালাতেন। ঘনিষ্ঠদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার প্রকৃত কর্মীসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫০, যারা মূলত প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বাজারে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সব সিদ্ধান্ত এপস্টিন নিজেই নিতেন। তার কোনো ম্যানেজার ছিল না। শুধু প্রায় ২০ জন হিসাবরক্ষক এবং একদল সহকারী তার ব্যস্ত জীবন সামলাতে সাহায্য করতেন। সহকারীদের মধ্যে অনেকেই চোখে পড়ার মতো আকর্ষণীয় তরুণী ছিলেন।
ধরা যাক, ১৫ বিলিয়ন ডলারের ওপর তিনি যদি মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ফিও নিতেন—তাহলে বছরে তার আয় দাঁড়াত প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলার। এই পুরো অর্থ সরাসরি তার পকেটে। নিঃসন্দেহে এটি ছিল অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা।
অর্থের নেশা
২০১৯ সালে যৌন অপরাধী এপস্টিন যখন কারাগারে দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন ফৌজদারি মামলার নথি অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫৬০ মিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছিল। তার কয়েকটি বিলাসবহুল প্রোপার্টি ছিল। এর মধ্যে ছিল ম্যানহাটনের আপার ইস্ট সাইডে একটি প্রাসাদোপম টাউনহাউস, যার মূল্য ৫০ মিলিয়নের বেশি।
আরও ছিল ফ্লোরিডার পাম বিচে একটি বড় প্রাসাদ, যার মূল্য প্রায় ১২ মিলিয়ন। নিউ মেক্সিকোর একটি র্যাঞ্চ, যার মূল্য প্রায় ১৭ মিলিয়ন ডলার। আর প্যারিসে আনুমানিক ৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ছিল।
তার ব্যক্তিগত মালিকানায় দুটি ক্যারিবীয় দ্বীপও ছিল— গ্রেট সেন্ট জেমস ও লিটল সেন্ট জেমস। লিটল সেন্ট জেমস (৭৫ একর) তিনি ১৯৯৮ সালে ৭ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলারে কিনেছিলেন। ২০১৬ সালে গ্রেট সেন্ট জেমস (১৬৫ একর) তিনি ২০ মিলিয়নের বেশি মূল্যে কিনেছিলেন।
২০২৩ সালে এই দ্বীপগুলো ৬০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয় বিলিয়নেয়ার স্টিফেন ডেকফের কাছে। এ ছাড়া এপস্টেইনের একটি প্রাইভেট জেটও ছিল, যা ‘ললিতা এক্সপ্রেস’ নামে পরিচিত।
যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে এপস্টিনের অর্থ আসত তার মধ্যে ছিল জেপি মরগ্যান। ১৯৯৮ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ব্যাংকটি তাকে ঋণ দিত এবং নিয়মিত বড় অঙ্কের নগদ অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দিত। পরে ২০২৩ সালে এই ব্যাংক একটি মামলার মাধ্যমে ২৯০ মিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়। এই অর্থ প্রায় ২০০ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল।
২০২৩ সালের জুনে সিবিএস মানিওয়াচকে ই-মেইলের মাধ্যমে জেপি মরগ্যান জানিয়েছিল, এপস্টিনের আচরণ ছিল ‘ভয়ঙ্কর’ এবং তার সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করে।
ডয়েচে ব্যাংকের সঙ্গেও এপস্টিনের আর্থিক লেনদেন ছিল। ২০২৩ সালে জার্মান ব্যাংকটি একটি মামলা মীমাংসা করতে ৭৫ মিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়, যেখানে অভিযোগ ছিল— ব্যাংকটি সচেতনভাবে জেনেশুনেই এপস্টিনের কর্মকাণ্ড থেকে লাভবান হয়েছে। মীমাংসার বিষয়ে ব্যাংকটি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে ২০২০ সালে তারা স্বীকার করে, ২০১৩ সালে এপস্টিনকে ক্লায়েন্ট হিসেবে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এবং তাদের প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা ছিল।
গত বছরের অক্টোবরে মার্কিন কংগ্রেসম্যান জেমি রাসকিন বলেছিলেন, ব্যাংকগুলো দেড় বিলিয়ন ডলারের অস্বাভাবিক লেনদেন চিহ্নিত করেছিল। এই লেনদেনগুলো এপস্টিনের অপরাধের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই মাসে ব্যাংক অব আমেরিকার বিরুদ্ধে এক ভুক্তভোগী মামলা করে দেন। তার ভাষ্য ছিল, ব্যাংকটি এপস্টিনের অপরাধকে সহজ করেছে এবং এতে লাভও পেয়েছে। তবে ব্যাংক অব আমেরিকা এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
বিবিসিকে দেওয়া এক এক সাক্ষাৎকারে এপস্টিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তার উপার্জিত অর্থ অবৈধ বা অপরাধমূলকভাবে অর্জিত কি না। জবাবে তিনি বলেন, না। আমি এসব অর্থ উপার্জন করেছি। আমি বৈধভাবেই উপার্জন করেছি। আরেক প্রশ্নে জানতে চান তিনি স্বয়ং শয়তান কি না, জবাবে এপস্টিন বলেন, না, তবে আমার একটা ভালো ভাবমূর্তিও আছে।
২০১৯ সালে ‘আত্মহত্যা’র ঠিক দুই দিন আগে এপস্টিন তার উইল সর্বশেষবার হালনাগাদ করেন। মৃত্যুর পর বন্ধু, কর্মী, ব্যবসায়িক সহযোগী এবং ভাইয়ের সন্তানদের মধ্যে সম্পদ বণ্টন করার পরিকল্পনা ছিল তার।
এপস্টিন ফাইলস
২০০৫ সালে এক কিশোরীর বাবা-মা অভিযোগ করেন, জেফরি এপস্টিন ফ্লোরিডার পাম বিচের এক ম্যানশনে তাদের মেয়ের ওপর যৌন নিপীড়ন চালিয়েছেন। এ ঘটনার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এরপর ২০০৬ সালে পুলিশ এপস্টিনের সঙ্গে আরও দুজনের বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্কের অভিযোগ আনে। পাম বিচের অ্যাটর্নি মামলাটি গ্র্যান্ড জুরিতে পাঠান। পরে জুলাইয়ে এফবিআই তদন্ত শুরু করে। এই তদন্তের নাম দেওয়া হয়েছিল অপারেশন ‘লিপ ইয়ার’।
২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি অ্যালেক্স অ্যাকোস্টার (যিনি পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শ্রমমন্ত্রী হন) সঙ্গে এপস্টিনের একটি গোপন মীমাংসা চুক্তি হয়। চুক্তি বা সমঝোতা অনুযায়ী, তিনি যৌন অপরাধের দোষ স্বীকার করতে রাজি হন। যদিও এ চুক্তি সম্পর্কে ভুক্তভোগীদের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
পরে মার্কিন গণমাধ্যম ভক্স জানায়, এফবিআইয়ের তদন্তের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা একটি নথিতে এপস্টিনের অপরাধের এতটাই শক্ত প্রমাণ ছিল যে, এটি সম্ভবত তাকে আজীবন কারাগারে রাখতে পারত।
পরে এপস্টিনের আইনজীবী ও অ্যাকোস্টার দপ্তরের মধ্যে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলে। আলোচনার সময় অ্যাকোস্টা ধারাবাহিকভাবে তার দাবির কাছে নতি স্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে এমন একটি চুক্তি হয়েছিল, যেন কেউ তার অপরাধ জগতের পরিসর সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জানতে না পারে।
এরপর এপস্টিন আদালতে হাজির হয়ে তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর দুইটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন এবং মাত্র ১৮ মাসের সাজা পান। তাকে এই সাজা পাম বিচ কাউন্টির একটি আটককেন্দ্রে থাকা একটি ব্যক্তিগত উইংয়ে কাটানোর অনুমতি দেওয়া হয়। সেখানে তার জন্য আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল এবং তাকে সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করার সুযোগ দেওয়া হতো।
২০০৯ সালে এপস্টিন মাত্র ১৩ মাস জেল খেটেই ছাড়া পান। এরপর তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্রিটেনের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে আনন্দ উদযাপন করতে আপার ইস্ট সাইডে ফিরে যান বলে নিউইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছিল। ২০১১ সালে এপস্টিনকে নিজের নাম নিউইয়র্কে একজন যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধন করার পাশাপাশি প্রতি ৯০ দিনে পুলিশের কাছে রিপোর্ট দিতে বলা হয়। পরে দেখা যায়, তিনি তা করেননি।
২০১২ সালে এপস্টিন নিজের খ্যাতি ধরে রাখতে ক্যাম্পেইন চালান। তার ফাউন্ডেশন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশ্বব্যাপী কনফারেন্সে মিলিয়ন ডলার দান করে। তিনি ক্যানসারের গবেষণাতেও সহায়তা করেন।
২০১৫ সালে ভর্জিনিয়া রবার্টস নামে এক তরুণী অভিযোগ করেন, এপস্টিন তাকে প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও আইনজীবী অ্যালান ডারশোভিটজের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তিনি তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। তিনি বলেন, এপস্টিন তাকে ১৫ বছর বয়স থেকে ‘যৌন দাসী’ হিসেবে প্রস্তুত করেছিলেন। এরপর এপস্টিন ও তার বান্ধবী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক যৌন পাচার সংক্রান্ত অপরাধে মামলা দায়ের করা হয়।
২০১৬ সালে ম্যাডিসনে এক নারী মামলায় দায়ের করে অভিযোগ করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৯৯৪ সালে এপস্টিনের নিউইয়র্কের বাড়িতে একটি পার্টিতে তাকে ধর্ষণ করেছিলেন। তখন ওই নারীর বয়স ছিল ১৩। অবশ্য ট্রাম্প ও এপস্টিন উভয়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাবেক মিয়ামি ফেডারেল প্রসিকিউটর অ্যাকোস্টাকে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমমন্ত্রী পদে মনোনীত করেন। নিয়োগ নিশ্চিতকরণ শুনানিতে তাকে ১০ বছর আগে এপস্টিনের সঙ্গে হওয়া চুক্তি নিয়ে সংক্ষেপে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। পরে অ্যাকোস্টা শ্রমমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান।
২০১৮ সালে মিয়ামি হেরাল্ড এপস্টিনের দীর্ঘ সময়ের যৌন অপরাধের অভিযোগের ইতিহাস সামনে আনে, যা ‘এপস্টিনের যৌন পিরামিড স্কিম’ নামে পরিচিত।
২০১৯ সালের জুলাই মাসের ৬ তারিখে নিউ জার্সির টেটারবারো বিমানবন্দরে ফেডারেল এজেন্টদের হাতে গ্রেপ্তার হন এপস্টিন। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনের অনুযায়ী, ২০ জন ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা তার নিউইয়র্কের বাসায় ঢুকে তল্লাশি চালান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিলিয়নিয়ার পেডোফাইল জেফরি এপস্টিনকে নিউইয়র্কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘পতিতাবৃত্তির জন্য অপ্রাপ্তবয়স্কদের পাচার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১২ বছর আগে এক কিশোরীকে নির্যাতনের অভিযোগ থেকে
এপস্টিন বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ২০০২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক অনেককে পাচারের মামলায় তাকে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে।’
এপস্টিন নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। ওই সময় অ্যাকোস্টা শ্রমমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এই বলে, এপস্টিনের মামলা তার দপ্তরের কাজকর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
১০ আগস্ট ম্যানহাটনের মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টারের সেলে এপস্টিনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে নিউইয়র্ক সিটির চিফ মেডিকেল এক্সামিনার বলেন, তিনি ‘আত্মহত্যা’ করেছেন। এর পরই তার বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এপস্টিনের বিরুদ্ধে পরিচালিত একাধিক তদন্তে বিপুল সংখ্যক নথি জমা হয়। এর মধ্যে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের বয়ানসংক্রান্ত নথিও ছিল। তার বিভিন্ন বাড়িতে অভিযান চালিয়ে জিনিসপত্র ও বিভিন্ন নথি জব্দ করা হয়। এসবের মধ্যে তার ভ্রমণের তথ্য, রেকর্ডিং ও ই-মেইলসহ বিভিন্ন নথিও অন্তর্ভুক্ত।