বিএনপির বিজয়কে যেভাবে দেখছে ভারতীয় মিডিয়া
সব আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বেসরকারি ফলাফলে পরিষ্কার হয়ে গেছে কোন রাজনৈতিক দল ধরছে দেশের হাল।
গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত বিএনপি বড় বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো ফলাও করে প্রচার করছে।
এমন বাস্তবতায় বিএনপি-প্রধান তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক্স পোস্টে (টুইট) বাংলায় বলেছেন, ‘এই ফলাফল আপনার (তারেক রহমান) নেতৃত্বের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতিফলন।’
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পক্ষে তার সমর্থন অব্যাহত রাখবে।’
দিল্লির এমন শুভেচ্ছাবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে ভারতীয় গণমাধ্যম। পাশাপাশি প্রচার করছে, ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানে বিতাড়িত শেখ হাসিনার বাণী।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন বিকেলে আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইনে প্রধান প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল—‘নৌকাবিহীন ভোটে বাংলাদেশের আস্থা চেনা ধানের শিষের উপর, ক্রমশ পিছোতে পিছোতে কুড়ি বছর পর “সবার আগে” বিএনপি।’
এতে বলা হয়, ‘শেষ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে খালেদা এবং হাসিনাকে কেন্দ্র করেই। এই অক্ষ থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে বার করে আনার ডাক দিয়েছিলেন জামায়াত, এনসিপি-র নেতারা। কিন্তু, বাংলাদেশের জনগণ এখনো অচেনা বা অল্প চেনাদের হাতে শাসনভার দিতে স্বচ্ছন্ন নন।’
প্রতিবেদনের ভাষ্য, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’! এই স্লোগান নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ভোটের ফল বলছে, বাংলাদেশের জনগণ ‘সবার আগে’ রাখল সেই বিএনপি-কেই। আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করা না-হলেও গণনায় স্পষ্ট ইঙ্গিত, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০ বছর পর ফের ঢাকার মসনদে ফিরছে প্রয়াত খালেদা জিয়ার দল।
অপর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘ভোটে হারলেও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে সেরা ফল জামায়েতের, শফিকুরদের উত্থান কি চাপে ফেলে দেবে ভারতকে’।
সকালে এক শীর্ষ প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘তারেককে অভিনন্দন জানিয়ে সমাজমাধ্যমে বাংলায় পোস্ট মোদির, একসঙ্গে কাজের বার্তা, শুভেচ্ছা জানালো আমেরিকাও’।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ১৩ ফেব্রুয়ারি সকালে সমাজমাধ্যমে প্রথমে ইংরেজি ও পরে বাংলায় পোস্ট করে তারেককে ‘আন্তরিক অভিনন্দন’ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ওই দুই পোস্টে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘আমি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপিকে নির্ণায়ক বিজয়ের অভিমুখে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জনাব তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।’
প্রতিবেদনটিতে নরেন্দ্র মোদির বাংলা পোস্ট তুলে ধরা হয়েছে। পোস্টে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আরও লিখেন, ‘এই ফলাফল আপনার নেতৃত্বের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতিফলন।’
‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পক্ষে তার সমর্থন অব্যাহত রাখবে।’
নরেন্দ্র মোদির আশা—‘আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং আমাদের অভিন্ন উন্নয়নের লক্ষ্যগুলি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায়ে আপনার সঙ্গে একযোগে কাজ করার প্রত্যাশা রাখছি।’
একই দিনে পত্রিকাটির অপর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘ঘনিষ্ঠতা চায় পাকিস্তান, বাংলাদেশে তারেক রহমানের জয় নিশ্চিত হতেই পোস্ট পাক প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টের! কী বার্তা।’
প্রতিবেদনটিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সমাজমাধ্যম বার্তা তুলে ধরে বলা হয়: ‘সবকিছু ঠিক থাকলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানই হতে চলেছেন সে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। জয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তান থেকেও এলো শুভেচ্ছাবার্তা। তারেককে জয়ের অভিনন্দন জানিয়ে সমাজমাধ্যম পোস্ট করলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বার্তা দিয়েছেন তিনি। বার্তা এসেছে পাক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির কাছ থেকেও।’
এতে আরও বলা হয়, ‘তবে হাসিনা দেশ ছাড়ার পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। দীর্ঘদিন পরে ঢাকা থেকে করাচি পর্যন্ত রুটে শুরু হয়েছে বিমান চলাচল। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির বার্তা দিলো পাকিস্তান।’
ভোটের দিন বিকেলে বাংলাদেশের নির্বাচনের খবরের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমটি পলাতক হাসিনার বার্তা নিয়ে ভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেই প্রতিবেদনটি পরদিন দুপুরেও দৈনিকটির ওয়েবসাইটে দেখা যায়।
প্রতিবেদন অনুসারে, ‘সমাজমাধ্যমে হাসিনার দাবি, দেশবাসী এই “প্রহসনের ভোটকে প্রত্যাখ্যান” করেছেন।’
এতে আরও বলা হয়, ‘হাসিনা মনে করেন, “ভোটগ্রহণের উৎকৃষ্ট সময়ে জনগণের এই কম অংশগ্রহণ” প্রমাণ করে যে, তারা ভোট প্রত্যাখ্যান করেছেন।’
বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে দেওয়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুভেচ্ছাবাণী প্রচার করেছে এই সময় অনলাইন। বাংলাদেশের নির্বাচনের পরদিনও সংবাদমাধ্যমটি লাইভ সংবাদ পরিবেশনের ব্যবস্থা রেখেছিল। সমাজমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত মমতার বার্তাটি সংবাদমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
পোস্টে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের সকল ভাইবোনকে, জনগণকে, জানাই আমার শুভনন্দন, আমার আগাম রমজান মোবারক। বাংলাদেশের এই বিপুল জয়ের জন্য অভিনন্দন জানাই আমার তারেকভাইকে, তার দলকে ও অন্যান্য দলকে। সবাই ভালো থাকুন, সুখী থাকুন। আমাদের সঙ্গে সব সময় বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় থাকবে, এটাই আমরা কামনা করি।’
অপর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘… বাংলাদেশের পাশে থাকবে ভারত’, খালেদা-পুত্র তারেককে বার্তা নরেন্দ্র মোদির’।
‘ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার পরে খালেদাপুত্র তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক কেমন হবে, এখন সব নজর সেই দিকেই,’ বলে প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।
আজকাল-এর প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘এপার-ওপার সুসম্পর্কের বার্তা, “তারেকভাইকে” শুভেচ্ছা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতার’।
এতে বলা হয়, ‘ওপার বাংলায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ের পথে বিএনপি। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হলেও, মোদি থেকে মমতা, তারেক রহমানকে বিজয়ের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়, ‘দিল্লিতে বসে ভোট প্রত্যাখ্যান হাসিনার, বাংলাদেশের ভোটে জয় নিয়ে তারেক রহমানকে কী বার্তা মোদির?’
এর আগে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসেছিলেন তারেকের সঙ্গে দেখা করতে—সেই তথ্য জানিয়ে প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ‘দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশি হাইকমিশনে গিয়ে শোকবার্তা লিখেছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। লোকসভা ও রাজ্যসভায় খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করা হয়েছিল।’
দ্য স্টেটসম্যান-এর বাংলা সংস্করণ দৈনিক স্টেটসম্যান-এর দুইটি প্রধান প্রতিবেদন পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে ছাপানো হয়। একটির শিরোনামে বলা হয়—‘বাংলাদেশ নির্বাচন: ২১২ আসনে এগিয়ে বিএনপি, সরকার গঠনের পথে’।
প্রতিবেদনটির ভাষ্য—‘রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন নজর থাকবে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং মন্ত্রিসভা গঠনের দিকে।’
অপর প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘প্রহসনের ভোট বলে তোপ শেখ হাসিনার, ভোটের হার ঘিরে উত্তপ্ত বাংলাদেশের রাজনীতি’।
এতে বলা হয়—‘রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটের হার ও স্বচ্ছতা নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা আগামী কয়েকদিন বাংলাদেশের রাজনীতিকে উত্তপ্ত রাখবে।’
বাংলাদেশের নির্বাচনের বেসরকারি ফল প্রকাশের পর সংবাদ প্রতিদিন এক বিশাল ব্যানার শিরোনাম করে। বলা হয়—‘প্রত্যাবর্তনেই পরিবর্তন’। সংবাদমাধ্যমটির ওয়েব পেজের ওপরের অংশজুড়ে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন ছিল।
একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘ড্রাগনের “রক্তচক্ষু” “চিকেনস নেক”-এ! বিএনপি জিততেই “একসঙ্গে কাজ করার” বার্তা চীনের’।
প্রতিবেদনটিতে হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে ‘ভারতবিরোধী’ পাকিস্তান ও চীনের ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি ‘সেভেন সিস্টার্স’ হিসেবে পরিচিত ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় ৭ রাজ্য ও ‘চিকেনস নেক’ হিসেবে পরিচিত ২০ কিলোমিটারের শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়।
একই দিন বিকেলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার অনলাইন সংস্করণে গুরুত্বের সঙ্গে মোদি-তারেকের ফোনালাপের কথা জানানো হয়। বিএনপি নেতার কাছে নরেন্দ্র মোদি ‘শান্তি ও অগ্রগতি’র আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছেন বলেও সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়।
হিন্দুস্তান টাইমস-এর অনলাইন সংস্করণে ভোটের পরদিনও বাংলাদেশের নির্বাচনের সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়েছে। এ দিনেও নির্বাচনের সংবাদের লাইভ কাভারেজ দেওয়া হয়।
ওইদিন একটি প্রতিবেদনে ২০ বছর পর নির্বাচনে জিতে বিএনপির ক্ষমতায় আসার সংবাদ দেওয়া হয়। অপর এক প্রতিবেদনের শিরোনামে, তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বার্তা পাঠানোর তথ্য দিয়ে নাটকীয়ভাবে বলা হয়—‘ইন্ডিয়া উইল…’।
অর্থাৎ, নরেন্দ্র মোদির বার্তাটিতে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে তা প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য হিন্দু বাংলাদেশের নির্বাচনের পরদিনও লাইভ আপডেট দেয়। ওই দিন বিকেলে লাইভ আপডেটের প্রধান শিরোনামে নির্বাচনের ফল নিয়ে জামায়াতের অসন্তোষের কথা তুলে ধরা হয়।
একই দিনে সংবাদমাধ্যমটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের উত্থান নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধও প্রকাশ করে।
ইন্ডিয়া টুডে-ও বাংলাদেশের নির্বাচন, বিএনপির জয় ও বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অভিনন্দনের সংবাদসহ একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনগুলোয় বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের সহযোগিতা ও সমর্থন থাকবে বলে জানানো হয়।