যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় কী কৌশল নিচ্ছে ইরান

দুলি মল্লিক
দুলি মল্লিক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা নতুন কিছু নয়, দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। তবে এখন এসে সেই উত্তেজনার পারদ যেন শীর্ষে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এখন সম্ভবত সবচেয়ে চর্চিত বিষয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক। এমনকি শোনা যাচ্ছে, মার্কিন প্রশাসন এবার ইরানে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ইরানকে অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে। মনোযোগ দিতে হচ্ছে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলায় যুদ্ধ প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার দিকগুলোতে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, ইরান একদিকে প্রতিরোধ, প্রতিরক্ষা ও পাল্টা হামলার জন্য কৌশল নির্ধারণ করছে। অন্যদিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে যোগ্য উত্তরসূরি, নেতৃত্ব নির্ধারণসহ পুরো সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন এনেছে খামেনি সরকার।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও থিংক ট্যাংকের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরান কোন কৌশলগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সম্ভব্য কী কী বিকল্প ব্যবস্থা আছে খামেনি সরকারের হাতে তা উঠে এসেছে।

সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলা

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইন্সটিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার সরকার দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্সকে ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। এর ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেছে আইএসডব্লিউ।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে বড় আকারের হামলার পরিকল্পনা করতে পারে ইরান। যদিও ইসরায়েল ইতোমধ্যে বহু লঞ্চার ধ্বংস করেছে, তবুও ইরানের হাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লঞ্চার আছে বলে ধারণা করা হয়।

মিলিশিয়া হামলা
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইরান সমর্থিত বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনী ছড়িয়ে আছে। ইরান তাদের সাহায্য নানাভাবে হামলা চালাতে পারে। যেমন ইরাক ও সিরিয়ায় মিত্র গোষ্ঠী এবং লোহিত সাগর অঞ্চলে হুতিদের মাধ্যমে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানা।

হরমুজ প্রণালী
ইরানের জন্য বড় একটি শক্তি হরমুজ প্রণালী। ইরান হয়তো হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব পড়বে।

আইএসডব্লিউর মতে, খামেনি কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত মূলত তার ওপরই নির্ভর করবে সফলতা। সীমিত আকারে হামলা হলে পাল্টা আঘাত ও উত্তেজনা কম হবে, কিন্তু বড় ধরনের হামলা হলে ঝুঁকিও বাড়বে। একইসঙ্গে যেকোনো ইরানের যেকোনো উদ্যোগে হয়তো পাল্টা ব্যবস্থা নেবে মার্কিন প্রশাসন।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সক্ষমতা কিছুটা কমেছে বলে মনে করছে আইএসডব্লিউ। তাই দেশটির হাতে এখন বিকল্প কম বলে জানায় সংস্থাটি। এ কারণে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক কার্যক্রম নিয়ে ওয়াশিংটনের দাবির সঙ্গে সমঝোতার দিকটা ভাবতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো নমনীয়তার ইঙ্গিত দেননি খামেনি। তবে ইরানের কিছু কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপসের পক্ষে থাকতে পারে বলে মনে করছে আইএসডব্লিউ।

সামরিক প্রস্তুতি ও মহড়া

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে অনিবার্য ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরানের সব সশস্ত্র বাহিনী। ইতোমধ্যে দেশের ভেতরে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তারা।

ইরাক সীমান্ত ঘেঁষা পশ্চিমাঞ্চল ও পারস্য উপসাগরীয় দক্ষিণ উপকূলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। ওইসব স্থান থেকে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব বলে জানায় মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি।

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালী ও ওমান সাগরে রাশিয়ার সঙ্গে দুদিনব্যাপী মহড়াও চালিয়েছে ইরান। ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বয় বাড়াতে এই মহড়া চালানো হয় বলে জানিয়েছেন দেশটির এক শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা। 

মানবঢাল ব্যবহার 

সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি হাসপাতাল, স্কুল, ক্রীড়াঙ্গন ও স্টেডিয়ামে অবস্থান নিয়েছে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। সম্ভাব্য মার্কিন বা ইসরায়েলি হামলা থেকে বাঁচতেই এ ধরনের জনবহুল বেসামরিক এলাকায় তারা অবস্থান নিচ্ছে বলে মনে করেছেন বিশ্লেষকরা।

এ ব্যাপারে দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক জামশিদ বারজেগার বলেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র বহু বছর ধরে আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে বেসামরিক স্থানকে সামরিকীকরণ এবং সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এবার তারা দেশের ভেতরে সেই কৌশল প্রয়োগ করতে যাচ্ছে।’

পারমাণবিক কেন্দ্র ও সামরিক স্থাপনার সুরক্ষা

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ থেকে সতর্ক হয়েছে ইরান। তাই এবার আগেভাগেই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সব স্থাপনা ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা নিয়েছে।

আল জাজিরা জানায়, গত কয়েক মাসে অন্তত দুটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রসহ পাঁচটি সামরিক স্থাপনার প্রবেশপথ মাটি চাপা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে এবং কংক্রিটের ছাদ তৈরি করে মূল স্থাপনা আড়াল করা হয়েছে। এর ফলে সরাসরি বিমান হামলা থেকে কিছুটা সুরক্ষিত থাকবে ওইসব স্থাপনা।

অভ্যন্তরীণ যত কৌশল

গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে শীর্ষ ২০ নেতাকে হারানোর পর অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ওপর অনেক বেশি জোর দিয়েছে খামেনি সরকার।

নতুন নেতৃত্ব
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এই সংকটময় সময়ে নেতৃত্বের ভার অনেকটাই তুলে দিয়েছেন তার বিশ্বস্ত সহযোগী ও শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানির হাতে। ৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ইরানের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, সাবেক বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার ও বর্তমানে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান।

ইরানের ছয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বিপ্লবী গার্ডের সদস্য ও সাবেক কূটনীতিকদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, সম্প্রতি কঠোরভাবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নেতৃত্ব দেন লারিজানি। সাম্প্রতিক সময়ে কার্যত লারিজানিই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দায়িত্ব সামলাচ্ছেন বলেও জানান তারা। তারা বলেন, যুদ্ধের সময়ও রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা তৈরি করছেন লারিজানি।

কাতারের দোহা সফরে আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লারিজানি বলেন, ‘আমরা প্রস্তুত। আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। গত সাত–আট মাসে দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলো নিয়ে কাজ করেছি।’

চার স্তরের উত্তরাধিকার কাঠামো
ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো নতুন করে সাজিয়েছেন খামেনি। সামরিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পদে চার স্তরের উত্তরাধিকার কাঠামো নির্ধারণ করেছেন।

শীর্ষ নেতৃত্বের সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা থেকে বাঁচাতে কৌশল নির্ধারণের জন্য লারিজানিসহ ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগীদের ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন খামেনি। যোগ্য উত্তরসূরি নির্ধারণ করতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিজ নিজ বিকল্পের তালিকা দিতেও বলা হয়েছে।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বা খামেনি নিহত হলেও যেন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় সে ক্ষমতাও একটি ঘনিষ্ঠ বলয়ের কাছে দিয়ে রেখেছেন তিনি। নিজের উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের নামও ঠিক করেছেন। যদিও তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক ভ্যালি নাসর বলেন, খামেনি যুদ্ধ ও উত্তরাধিকার—দুই পরিস্থিতির জন্যই রাষ্ট্রকে প্রস্তুত করছেন।

অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ 
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বড় শহরগুলোতে বিশেষ পুলিশ ইউনিট, গোয়েন্দা সদস্য ও মিলিশিয়া বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা আছে ইরানের। তারা চেকপোস্ট বসিয়ে অস্থিরতা ঠেকানো ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনদের (স্পাই) খুঁজে বের করবে।

‘ইরানের ডেলসি’

ভেনেজুয়েলায় উদাহরণ সামনে রেখে ‘ইরানের ডেলসি’ কে হতে পারেন—তা নিয়েও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন খামেনি।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হলে রাষ্ট্র পরিচালনা কারা করবে সে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন লারিজানি। এরপরই পার্লামেন্ট স্পিকার ও সাবেক গার্ড কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গালিবাফ।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিশেষজ্ঞ আলি ভাইজ বলেন, বিকল্প পরিকল্পনা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের ফল অনিশ্চিত। খামেনি এখন কম দৃশ্যমান, বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তিনি এখনো পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

অন্যদিকে পরমাণু ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ স্পষ্ট হলেও তেহরানসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসরায়েল। ওয়াশিংটন নিজস্ব কৌশলগত হিসাবকে অগ্রাধিকার দেবে নাকি ইসরায়েলের সঙ্গে থাকবে তার ওপরই নির্ভর করছে সংঘাত কোন পথে এগোবে।