ইরানের রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক ও যোদ্ধা কে এই লারিজানি?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়লেও খুব দ্রুত সামনে আসেন আলি লারিজানি।

তিনি একটি অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠনের কথা ঘোষণা দেন। ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি তিনি। সম্ভাব্য অস্থিরতা বা বিভাজনের আশঙ্কা মাথায় রেখে কঠোর বার্তাও দেন।

ভিন্নমতাবলম্বী কিংবা কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’ যদি পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া হবে—এমন সতর্কবার্তাও দেন তিনি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সবসময় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেছেন এবং দেশের বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত সম্পর্ক গড়ে তোলারও দায়িত্ব পালন করেছেন।

আলি লারিজানি ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রের একজন প্রভাবশালী নেতা। আন্তর্জাতিক স্তরে তিনি পারমাণবিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার তদারকি করেন। অবশ্য সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ওয়াশিংটন তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

লারিজানি বিভিন্ন সময় মস্কো সফর করেন এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ট্রাম্পের চাপের বিরুদ্ধে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম এমন এক প্রধান মিত্র ও বিশ্বশক্তির সঙ্গে খামেনির সম্পর্ক সামলাতে তার এই সফর সহায়ক হয়।

লারিজানিকে চীনের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে ২০২১ সালে ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তি সই হয়।

আলি লারিজানি প্রায় ২০ বছর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পর্ষদের (এসএনএসসি) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। গত বছর ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর তিনি আবারো এই পর্ষদের নেতৃত্বে ফিরে আসেন।  

লারিজানি ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সাবেক সদস্য। ২০০৫ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেন।

সেই সময় পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন বন্ধ করার বিনিময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর দেওয়া সুযোগ-সুবিধার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি চকলেটের বিনিময়ে মুক্তা চাওয়ার মতো।

তখন ইরানি বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, লারিজানি কূটনীতির মাধ্যমে পশ্চিমাদের রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। তখন তাকে একজন বাস্তববাদী নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, ইরান এমন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে যা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে ইরান দাবি করে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

লারিজানি ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। সেই মেয়াদে থাকাকালীন প্রায় দুই বছরের জটিল আলোচনার পর ২০১৫ সালে ছয়টি বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরান একটি পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছায়। ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।

লারিজানি বিভিন্ন সময় বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কখনোই ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব নয়।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পিবিএস ফ্রন্টলাইনকে তিনি বলেন, আপনি যখন কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবেন, সেটি অন্য কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। বিষয়টি এমন ধরুন আপনি কোনো যন্ত্রের উদ্ভাবক এবং সেই যন্ত্রটি আপনার কাছ থেকে চুরি হয়ে গেছে। আপনি তবুও এটি আবারও তৈরি করতে পারবেন।

প্রথমে ২০০৫ সালে লারিজানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ে ব্যর্থ হন। পরে তিনি ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছিলেন। কিন্তু দুইবারই গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাকে অযোগ্য ঘোষণা করে। অযোগ্যতার কারণ হিসেবে জীবনযাত্রার মান এবং বিদেশে পারিবারিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়।

১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে ইরানের এক নেতৃস্থানীয় আলেম পরিবারে জন্ম নেওয়া লারিজানি শৈশবেই ইরানে চলে আসেন এবং পরে দর্শনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার ভাইদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিচার বিভাগ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

জানুয়ারির বিক্ষোভ দমনে লারিজানির ভূমিকার কারণে ক্ষুব্ধ ইরানি-আমেরিকান অ্যাক্টিভিস্টদের প্রতিবাদের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক পদ থেকে তার মেয়েকে বরখাস্ত করা হয়।