বিপ্লব-পরবর্তী নেপালের নির্বাচনে আলোচিত ৩ প্রার্থী

স্টার অনলাইন ডেস্ক

গত বছরের সেপ্টেম্বরে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে পরিচালিত গণঅভ্যুত্থানে নেপালের ক্ষমতাসীন সরকারের পতন হয়।

ওই ঘটনার পর প্রথমবারের মতো দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। বলা যায়, বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ‘জেন-জি অভ্যুত্থান পরবর্তী’ নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে নেপালিরা।

আগামী বৃহস্পতিবার আসছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

এই নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে আছেন ক্ষমতা ফিরে পেতে আগ্রহী সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জেন-জিদের আশীর্বাদপুষ্ট র‍্যাপার-মেয়র প্রার্থী ও নেপালি কংগ্রেস পার্টির নবনিযুক্ত নেতা।

আজ সোমবার এএফপির প্রতিবেদনে ওই তিন প্রার্থীর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ৫ মার্চের পার্লামেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী ওই তিনজনই।

তবে বেশিরভাগ বিশ্লেষক বলছেন, ভোটে কোনো দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

গগণ থাপা (৪৯)

গগণ থাপা নিজেকে ‘পরিবর্তনের দিশারী’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। তার দাবি, নেপালের রাজনীতিতে এখন আর তথাকথিত পুরনো ও অভিজ্ঞ নেতাদের স্থান নেই। তার হাত ধরেই দেশে পরিবর্তন ও সংস্কার আসবে।

গগণ থাপা
নির্বাচনী প্রচারণায় গগণ থাপা। ছবি: রয়টার্স

 

গত জানুয়ারিতে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নেতৃত্ব দিয়ে দলের প্রধানের দায়িত্ব দখলে নেন গগণ থাপা। নেপালি কংগ্রেস পার্টি দেশটির সবচেয়ে পুরনো ও শক্তিশালী দল। উৎখাত হওয়া জোট সরকারের বড় শরীক ছিল দলটি।

১৯৭৬ সালে জন্ম নেন তিনি। পরবর্তীতে ৯০ এর দশকের গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলন তাকে আকৃষ্ট করে। মুলত, ওই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ‘রাজতন্ত্রের’ কবল থেকে দেশকে রক্ষা করে। 

২০০৬ সালে রাজার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে নেপালি কংগ্রেসের নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দেন তিনি। ওই বিক্ষোভের জেরে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন রাজা।

বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেছেন গগণ থাপা। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য হন তিনি। সে সময় তিনি ছিলেন নেপালের তরুণতম আইনপ্রণেতাদের অন্যতম। 

একাধিকবার আইনপ্রণেতার ভূমিকা পালনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে ২০১৭ সালের মে পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন এই নেতা।  

গগণ থাপা এএফপিকে বলেন, ‘আমার সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা আছে। আছে প্রাণশক্তিও। শুধু আমার পক্ষেই দেশের জন্য কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দেওয়া সম্ভব।’

তিনি সুশাসন, সংস্কার ও বেকারত্ব দূর করার ওপর জোর দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

কে পি শর্মা ওলি (৭৪)

খাদগা প্রসাদ শর্মা ওলি নামটি বাংলাদেশের পাঠকের কাছে অপরিচিত শোনালেও ওলি শর্মা বা কে পি শর্মা ওলি নামটা পরিচিত। তিনিই নেপালের সেই নেতা, যাকে জেন-জি প্রজন্ম ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছিল।

কে পি শর্মা ওলি (৭৪)
নির্বাচনী প্রচারণায় কে পি শর্মা ওলি। ছবি: রয়টার্স

 

তবে অন্য অনেক দেশের উৎখাত হওয়া নেতার মতো তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। বরং নেপালের রাজনীতিতে বীরদর্পে ফিরে আসার উদ্যোগ নিয়েছেন।

এই অভিজ্ঞ মার্ক্সবাদী নেতা চার বার নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল-ইউনিফাইড মারক্সিস্ট লেনিনিস্ট (সিপিএন-ইউএমএল) দলের নেতা ওলি প্রায় ছয় দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন।

তরুণ বয়সেই রাজনীতি জড়ান ওলি। ১৯৭৩ সালে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের জেরে গ্রেপ্তার হন তিনি। প্রায় ১৪ বছর কারাবরণ করেন তিনি।

পরবর্তীতে দলের শীর্ষ পদ গ্রহণ করে ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রীত্ব হন ওলি শর্মা।

তার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি দেওয়া যায়। সমর্থকরা তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও জাতীয়তাবাদী মনোভাবের প্রশংসা করেন। বিশেষত, ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রাখতে তার ভূমিকা বেশ উল্লেখযোগ্য।

সমালোচকরা বলেন, ওলি ভিন্ন মতাবলম্বীদের ‘দেখতে পারেন না’। পাশাপাশি, তার শাসন ব্যবস্থাকেও আধিপত্যবাদের সঙ্গে তুলনা দেওয়া হয়।

ওলির বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি গত বছরের অভ্যুত্থানের সময় নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে সময় অন্তত ৭৭ জন নিহত হন। পরে বিক্ষুব্ধ নেপালিরা দেশটির পার্লামেন্ট ভবন জ্বালিয়ে দেয়।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ওলি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘বিক্ষোভে বাইরের লোক ঢুকে পড়ে সহিংসতা সৃষ্টি করেছিল।’ নাটকীয়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আবারও গত ডিসেম্বরে দলের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন ওলি।

এবারের ভোটে আগের সব সমস্যাকে পেছনে ফেলে ‘ঘুরে দাঁড়ানোর’ অঙ্গীকার করেছেন এই ক্ষমতাচ্যুত নেতা।

তিনি আসন্ন নির্বাচনকে, ‘যারা এই দেশকে জ্বালিয়ে দিতে চায় বনাম যারা দেশটিকে গড়ে তুলেছে’ এমন মানুষের লড়াই হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

বালেন্দ্র শাহ (৩৫)

‘বালেন’ নামেই তিনি বেশি পরিচিত। নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসে তারুণ্যের শক্তিতে পরিচালিত রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ার একেবারেই কেন্দ্রেই আছে এই তরুণ নেতার নাম।

ওলি সরকার উৎখাতে প্রকাশ্য সমর্থন জুগিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান বালেন।

বালেন্দ্র শাহ
নির্বাচনী প্রচারণায় বালেন্দ্র শাহ। ছবি: রয়টার্স

 

১৯৯০ সালে কাঠমান্ডুতে জন্ম নেওয়া বালেন দেশটির দশকব্যাপী মাওবাদী গৃহযুদ্ধের সময় স্কুল শিক্ষার্থী ছিলেন।

সাবেক হিপ-হপ ও র‍্যাপ শিল্পী বালেনের গানগুলো দুর্নীতি ও বৈষম্যবিরোধী।

৩৫ বছর বয়সী প্রকৌশলী বালেন্দ্র জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান গানের মাধ্যমে।

২০২২ সালে অনলাইনের জনপ্রিয়তাকে তিনি রাজনৈতিক বিজয়ে রূপ দেন। কাঠমান্ডুর প্রথম স্বতন্ত্র মেয়র হিসেবে জয়ী হন বালেন।

সরাসরি ও চাঁছাছোলা কথা বলে জনপ্রিয়তা পান তিনি। একাধিক সংস্কার প্রক্রিয়া চালু করে সুনাম কুড়ান।

কর ফাঁকি দেওয়া, যানজট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ে নানা উদ্যোগ নেন এই মেয়র।

গত ডিসেম্বরে মধ্যপন্থি দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে (আরএসপি) যোগ দেন বালেন।

এবার ওই দলের পক্ষে দেশ-নেতা হওয়ার দৌড়ে নেমেছেন এই তরুণ রাজনীতিক।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলির আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বালেন। বিশ্লেষকদের মত, এটি একটি অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।

এএফপিকে বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘আমি সহজ পথে হাঁটতে রাজি নই।’

উদারপন্থি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক ন্যায়বিচার, দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার মতো নির্বাচনী অঙ্গীকার নিয়ে এগোচ্ছেন এই তরুণ নেতা।

তিনি বলেন, জেন-জি প্রজন্মের সদস্যদের মূল দাবি সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তার ব্যক্তিপরিচয়ের সঙ্গে সব সময়ই জড়িয়ে থাকবে সংগীত। এমনকি, প্রধানমন্ত্রী হলেও।