ইরান যুদ্ধের কৌশল সামলাচ্ছেন যে মার্কিন অ্যাডমিরাল

স্টার অনলাইন ডেস্ক

লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর হুমকি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এড়িয়ে নৌযানগুলো আফ্রিকা ঘুরে হাজারো মাইল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হয়।

আগস্টের মধ্যে হুতিরা দুটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয় এবং কয়েকজন নাবিক নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের হামলাও তাদের থামাতে ব্যর্থ হয়।

সেই সময় পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে লোহিত সাগরে অভিযানে যান যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ভাইস অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। এর দুই বছর পর কুপার এখন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান।

এই পদ গ্রহণ করে তিনি ইরান যুদ্ধে যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তার পূর্ব অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে আজ রোববার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন।

হুতিদের মোকাবিলায় পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা কুপার আগে বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের কমান্ডার ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা ড্যান শাপিরো বলেন, এই অঞ্চলের জলসীমা সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা ছিল।

শাপিরো সিএনএনকে বলেন, তিনি সেসময়ে নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিলেন। বাস্তব পরিস্থিতি ও কৌশলের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করছিলেন।

সেন্টকমের নেতৃত্বে

সেন্টকম বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি অভিযান শুরুর নির্দেশ দেওয়ার আগের দিন কুপার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্ভাব্য সামরিক বিকল্পগুলো সম্পর্কে ব্রিফ করেন।

তবে যুদ্ধ ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা, উপসাগরীয় দেশ এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধে। ফলে সংঘাতের শেষ পরিণতি এখনো অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিও বেড়েছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এ সংঘাতে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং আরও ১৪০ জন আহত হয়েছেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ জানতে চাইছেন কেন ইরানের একটি স্কুলে হামলা চালানো হয়েছিল, যেখানে ১৬৮ শিশু নিহত হয়।

এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব সেন্টকমের ওপরই রয়েছে, যার নেতৃত্বে আছেন কুপার।

যুদ্ধক্ষেত্র ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

তার সঙ্গে কাজ করা সূত্রগুলো বলছে, কুপারের সামরিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণাও রয়েছে।

তিন দশকের বেশি সময়ের সামরিক জীবনে তিনি কংগ্রেসের সামরিক বাজেট নিয়ে কাজ করা আইনপ্রণেতাদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।

বিশেষ করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে, যারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে।

পঞ্চম নৌবহরের নেতৃত্বে থাকার সময়ের কথা উল্লেখ করে এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বলেন, পাঁচ বছর এই অঞ্চলে থাকার পর ইসরায়েলে প্রায় সব জেনারেলই তাকে চিনত।

তিনি বলেন, কুপার এতবার ইসরায়েল সফর করেছেন যে অনেক ইসরায়েলি কর্নেলকেও তিনি নাম ধরে চিনতেন।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, কুপার প্রায় প্রতিদিনই একাধিকবার ইসরায়েলি সামরিকবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামিরের সঙ্গে কথা বলেন।

কূটনীতি ও সামরিক যোগাযোগ

ফেব্রুয়ারিতে কুপার ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে ওমানে ইরানের সঙ্গে পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনাতেও অংশ নেন। এটি সামরিক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বিরল ঘটনা।

পরদিন কুপারের আমন্ত্রণে তারা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীও পরিদর্শন করেন।

২০২৫ সালের আগস্টে সেন্টকমের দায়িত্ব নেওয়ার পর কুপার এই কমান্ডের নেতৃত্ব দেওয়া দ্বিতীয় নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল। তার পূর্বসূরি ছিলেন সেনাবাহিনীর জেনারেল মাইকেল এরিক কুরিলা।

সাবেক এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, কুরিলার ব্যক্তিত্ব ছিল প্রবল ও রুক্ষ, তবে কুপার আলোচনার মাধ্যমে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

তার মতে, কুপার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার দিকে গুরুত্ব দেন এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন।

মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সময়

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হলে কুরিলা ও কুপার ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে কাজ করেন।

বাইডেন প্রশাসনের সময় হোয়াইট হাউসের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা সমন্বয়ক ব্রেট ম্যাকগার্ক বলেন, সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক ফ্রন্টে চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল।

ম্যাকগার্ক বলেন, সে সময় ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ও জাহাজে হামলা চালায়।

এক বিবৃতিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এই অঞ্চলের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে কুপারের অভিজ্ঞতা চলমান অভিযানের সময় গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ সামরিক জীবন

কুপার ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল একাডেমি থেকে স্নাতক হন। তিনি হার্ভার্ড ও টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিভার্সিটি থেকে কৌশলগত গোয়েন্দা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

তার কর্মজীবনে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও বাহরাইনভিত্তিক বিভিন্ন কমান্ডে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

ওয়াশিংটনে তিনি হোয়াইট হাউস এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কার্যালয়ে নির্বাহী ও সামরিক সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় হোয়াইট হাউসে সামরিক সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ইরাক থেকে ফিরে আসা সাবেক সেনাদের জন্য চাকরি ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে কাজ করেন।

নৌবাহিনীর আইনবিষয়ক দায়িত্ব পালনের ফলে কংগ্রেসের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়, যারা এখন ইরান যুদ্ধের অর্থায়ন ও কার্যক্রম তদারক করছে।

টেক্সাসের সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ম্যাক থর্নবেরি বলেন, এই ধরনের দায়িত্ব জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিবেশ বুঝতে সহায়তা করে।

পঞ্চম নৌবহরের নেতৃত্বে থাকাকালে কুপার আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। এক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য তাকে ‘বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল’ বলে বর্ণনা করেন।

এক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সহকারী বলেন, ক্যাপিটল হিলে সাধারণত মানুষ ব্যক্তি হিসেবে তাকে পছন্দ করে। আমাদের অভিজ্ঞতায় তিনি পেশাদার এবং খোলামেলা।

ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ

ইসরায়েলের সঙ্গেও কুপারের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে কাজ করা এক সাবেক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বলেন, এই সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হয়েছে।

পঞ্চম নৌবহরের কমান্ডার থাকাকালে তিনি ইসরায়েলি নৌবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেন। এর মধ্যে ছিল দুই পক্ষের নৌঘাঁটিতে পারস্পরিক লিয়াজোঁ কর্মকর্তা নিয়োগ।

তিনি এই অঞ্চলের বিভিন্ন নৌবাহিনীর মধ্যে বৈঠক আয়োজন করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে কাজ করেন।

২০২৪ সালের এপ্রিলে ইরান প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি আঞ্চলিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গত আগস্টে সেন্টকমের দায়িত্ব নেওয়ার পর কুপার সেই প্রচেষ্টা এগিয়ে নেন এবং পূর্বসূরি কুরিলার সময় গড়ে ওঠা সামরিক যোগাযোগগুলো বজায় রাখেন।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কীভাবে সমন্বয় করবে—তা নিয়ে আলোচনাও শুরু করেন কুপার।

এই আলোচনাগুলো পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ ইরান হামলার পরিকল্পনার অংশ হয়ে ওঠে।