‘শান্তি আলোচনার’ মধ্যেও ইরানে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা চলছে বলে দাবি করলেও ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণই ওই অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে না।
গতকাল সোমবার রাতভর ইরানের রাজধানী তেহরানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তাবরিজ, ইস্পাহান ও কারাজ শহরও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। আল জাজিরার খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ট্রাম্প বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে পরিকল্পিত হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় দুটি গ্যাস স্থাপনা ও একটি পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বার্তা সংস্থা ফার্স বলছে, জায়নবাদী ও মার্কিন শত্রুদের অব্যাহত হামলার অংশ হিসেবে ইস্পাহানের কাভেহ স্ট্রিটে অবস্থিত গ্যাস প্রশাসন ভবন এবং গ্যাস প্রেসার রেগুলেশন স্টেশনে হামলা চালানো হয়েছে।
মধ্য ইরানের ওই স্থাপনাগুলো আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ফার্স। একমাত্র এই সংবাদমাধ্যমই সেখানে হামলার খবর দিয়েছে। তারা আরও জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমে খোররামশাহর বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি গ্যাস পাইপলাইনেও হামলা হয়েছে।
ইরাক সীমান্তবর্তী খোররামশাহর শহরের গভর্নরের বরাত দিয়ে ফার্স জানিয়েছে, খোররামশাহর গ্যাস পাইপলাইন প্রসেসিং স্টেশনের বাইরের এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় অধ্যাপক ও গবেষক তার দুই সন্তানসহ নিহত হয়েছেন। রাজধানীর উত্তরাঞ্চলে তার নিজ বাসভবনে হামলার সময় তারা নিহত হন।
ইরানের ইংরেজি ভাষার নিউজ চ্যানেল প্রেস টিভি জানায়, নিহত ওই ব্যক্তির নাম সাঈদ শামাগদারি। তিনি ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির প্রকৌশল বিভাগে শিক্ষকতা করতেন।
ইসরায়েল এর আগেও ইরানের বেশ কয়েকজন শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানীর ওপর হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের অভিযোগ ছিল, তারা ইরানের সমরাস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ইরানের জরুরি সেবা সংস্থার প্রধান জাফর মিয়াদফার জানিয়েছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২০৮ জন শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৮ জনের প্রাণ গেছে যুদ্ধের শুরুতে মিনাভ শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করেছে, মিনাভ হামলার ঘটনাটি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে তদন্ত করা উচিত।
ইরান সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এ পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলেও হামলা অব্যাহত
হামলার এই আবহের মধ্যেই নতুন কূটনৈতিক পথ উন্মোচনের আলাপ শোনা যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মিশর, পাকিস্তান ও ওমানসহ বেশ কয়েকটি দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
গতকাল সোমবার ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনার কথা নাকচ করেছেন। যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ‘খুবই ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ হয়েছে বলে ট্রাম্প দাবি করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর তারা এই প্রতিক্রিয়া জানান।
ইরানের সংসদীয় জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতিবিষয়ক কমিটির সদস্য ইসমাইল কাওসারিকে উদ্ধৃত করে ফার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসার আগে ইরানি কর্মকর্তাদের ‘বিচক্ষণতার সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন’।
সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা কাওসারি বলেন, আলোচনা নিয়ে তারা এই প্রথম মিথ্যা বলছে না। তাদের স্বভাবই হলো বিভেদ সৃষ্টি করা, যেন তারা জনগণকে সরকারের প্রতি সন্দিহান করে তুলতে পারে এবং এমন ধারণা দিতে পারে যে কিছু একটা করা হয়েছে, অথচ আসলে কিছুই হয়নি।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তৌহিদ আসাদি জানান, সংঘাত নিরসনে শেষ পর্যন্ত কূটনীতির দ্বার উন্মোচিত হবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি।
তিনি বলেন, ইরানের কূটনৈতিক ও সরকারি সূত্রগুলো থেকে যা আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তাতে সংঘাত স্থগিতের বিষয়টি তারা ইতিবাচকভাবে নেবে কি না তা নিশ্চিত নয়। তাদের মূল দাবি হলো, দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার স্থায়ী নিশ্চয়তা আগে পেতে হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর ফলে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে।
এদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চল সরাসরি যুদ্ধের সামরিক প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোট ১৯টি ড্রোনকে প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে, যেগুলোর লক্ষ্য ছিল দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ।
কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দিয়েছে। কুয়েত সিটি থেকে আল জাজিরার মালিক ট্রেইনা জানান, মধ্যরাত থেকে ভোররাত পর্যন্ত ১২ থেকে ১৩ বার সতর্কতা সংকেত বা সাইরেন বেজে ওঠে।
ট্রেইনা বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন সম্ভাব্য চুক্তির কথা বলেছিলেন, তখন অনেক মানুষই খুব আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু গত রাতে যারা হামলার সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে কমে যাবে বলে আশা করেছিলেন, তারা বুঝতে পেরেছেন যে পরিস্থিতি মোটেও তেমন নয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, সোমবার অ্যামাজন জানায়, বাহরাইনে তাদের অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে।
আনবারে ইরান সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) ওপর মার্কিন বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। সোমবার আনবারে পিএমএফের অপারেশন কমান্ড সদরদপ্তরে গোষ্ঠীটির প্রধান সাদ দাওয়াইকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। হামলায় তিনি নিহত হন।
ইসরায়েলেও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। দেশটি হাইফাসহ ইসরায়েলজুড়ে একাধিক হামলা চালিয়েছে। তেল আবিবের একটি ভবনে ক্ষেপণাস্ত্রের স্প্লিন্টার বা ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানায় অন্তত ছয়জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চলছে।
এদিকে, অস্ট্রেলিয়া সফররত ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছেন, ইরানের সংঘাত নিরসনে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
লিয়েন সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখন ‘সংকটজনক’ এবং অবশ্যই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধে ইরানের প্রচেষ্টার ‘নিন্দা জানানো’ উচিত।