মার্কিন ৮২ এয়ারবোর্ন ডিভিশনের সক্ষমতা কী, কেন ইরান পাঠানোর পরিকল্পনা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ যখন চতুর্থ সপ্তাহে পা দিয়েছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাত দ্রুত শেষ করার জন্য নানা বিকল্প বিবেচনা করছেন।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীর অন্যতম চৌকস ইউনিট ‘৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের’ প্যারাট্রুপারদের মোতায়েনের পরিকল্পনা।

আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ বলছে, সামরিক চাপ ও আলোচনার একটি দ্বৈত কৌশল গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার অংশ হিসেবে এই বাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।

কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন কারা, ইরান যুদ্ধে নতুন এই বাহিনীর ভূমিকা কী হতে পারে?

৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন

ইউনাইটেড স্টেটস সার্ভিস অর্গানাইজেশনের (ইউএসও) তথ্য অনুযায়ী, ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন হলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যতম অভিজাত একটি দল, যাদেরকে মাত্র ১৮ ঘণ্টার নোটিশে মোতায়েন করা সম্ভব। এই ডিভিশনের সেনারা প্যারাস্যুটের সাহায্যে যেকোনো জায়গাতে নেমে অভিযান পরিচালনা করতে পারে।

সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থিত এই ডিভিশনটি ১৯১৭ সালে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ‘অল-আমেরিকান’ নামে পরিচিত এই দলটি আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৪৪ সালের ৬ জুন ‘ডি-ডে’ বা অপারেশন ওভারলর্ডের সময় তাদের দুর্ধর্ষ ভূমিকা ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সেসময় এই ডিভিশনের প্রায় ৬ হাজার ৪০০ প্যারাট্রুপার জার্মানির শত্রু সীমানার পেছনে নরম্যান্ডিতে প্যারাসুটের মাধ্যমে অবতরণ করে। তারা মিত্রবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রুট ও সেতু দখল করে জার্মানদের পাল্টা আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপারেশন মার্কেট গার্ডেন এবং ব্যাটল অব দ্য বালজের মতো বড় বড় অভিযানেও এই ডিভিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরবর্তী বছরগুলোতে এই ডিভিশনটি কোরিয়া, ভিয়েতনাম, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক এবং আফগানিস্তানেও অংশ নিয়েছে। ১৯৯১ সালে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম এবং বুশ প্রশাসনের গ্লোবাল ওয়ার অন টেররে তারা সম্মুখসারির ভূমিকা পালন করে।

২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পরও এই ইউনিটটিকে ইউরোপে মোতায়েন করা হয়েছিল।

সক্ষমতা

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের ক্ষিপ্রতা এবং যেকোনো বৈরী পরিবেশে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা। ২০১৮ সালে এই ডিভিশনে ‘ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্স’ নামে একটি বিশেষ দলও গঠন করা হয়।

গালফ নিউজের তথ্য অনুযায়ী, এই উচ্চ-প্রস্তুতিসম্পন্ন আইআরএফ ব্রিগেডে প্রায় ৩ হাজার সেনাসদস্য রয়েছেন। এই প্যারাট্রুপাররা মূলত ‘ফার্স্ট-ইন’ বা সর্বপ্রথম প্রবেশ অভিযানের জন্য প্রশিক্ষিত, অর্থাৎ তারা শত্রুর অঞ্চলে প্যারাসুট দিয়ে অবতরণ করে বিমানবন্দর, সেতু বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দ্রুত দখল করতে সক্ষম।

তবে, তাদের শক্তির পাশাপাশি একটি দুর্বলতাও রয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান অ্যাক্সিওসকে বলেন, ৮২তম এয়ারবোর্ন মূলত হালকা পদাতিক বাহিনী। তারা খুব দ্রুত পৌঁছাতে পারলেও তাদের সঙ্গে ভারী বর্ম বা সাঁজোয়া যান থাকে না। তাই অবতরণের সময় বা ভারী আক্রমণের মুখে তারা কিছুটা অরক্ষিত থাকে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য তাদের গতি, চমক এবং সহায়তাকারী অন্যান্য বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়।

ইরান যুদ্ধে তাদের ভূমিকা কী হবে?

চলমান ইরান যুদ্ধে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ভূমিকা হতে পারে অত্যন্ত কৌশলগত।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং সম্প্রতি যুক্ত হওয়া মেরিন ও অন্যান্য বাহিনীর কারণে এই সংখ্যা আরও বাড়ছে বলে জানিয়েছে গালফ নিউজ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মেজর জেনারেল ব্র্যান্ডন টেগটমেইয়ারের নেতৃত্বে এক থেকে দুই হাজার এয়ারবোর্ন সেনাসদস্য মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন হতে পারে।

এই সংঘাতের একটি বড় কেন্দ্রবিন্দু হলো তেল সরবরাহ। ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে এবং তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে চায়। এজন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন।

৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন এই অঞ্চলে মোতায়েন হলে তাদের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে খারগ দ্বীপের মতো কৌশলগত স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, যেন ইরানের জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত হয় এবং তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করা যায়।

একাধিক বিশ্লেষকের বরাতে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এই মোতায়েনের খবরটি বাস্তবে আক্রমণের পাশাপাশি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হিসেবেও কাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পাঁচ দিনের যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন, সেই সময়ের মধ্যে এই সেনা মোতায়েন সম্পন্ন করে ইরানের ওপর চাপ বৃদ্ধির কৌশল নেওয়া হতে পারে, যদিও ট্রাম্প একই সঙ্গে দাবি করেছেন যে আলোচনাও চলমান রয়েছে।

এরা কি ইরানে স্থলবাহিনী হিসেবে মোতায়েন হবে?

এই ডিভিশনের প্যারাট্রুপাররা সরাসরি ইরানের মাটিতে নামতে পারে। তবে তারা এককভাবে এই কাজ করবে না। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এখানে একটি পর্যায়ক্রমিক বা যৌথ পদ্ধতির কথা ভাবছেন বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।

প্রথম ধাপে মেরিন কর্পসের সদস্যরা (যাদের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার মেরিন ও নাবিক ইতিমধ্যে এই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে) প্রাথমিক আক্রমণ পরিচালনা করবে। সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় খারগ দ্বীপের মতো লক্ষ্যবস্তুর অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মেরিন কমব্যাট ইঞ্জিনিয়াররা বিমানবন্দর মেরামত এবং পরবর্তী বাহিনীর জন্য অবস্থান প্রস্তুত করার প্রাথমিক কাজ করবে।

খারগ দ্বীপ। ছবি: স্যাটেলাইট/রয়টার্স

প্রাথমিক অবস্থান সুরক্ষিত হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্যারাট্রুপাররা স্থলবাহিনীর মতো দ্রুত সেই অবস্থানগুলোতে প্রবেশ করবে এবং দখলকৃত এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে। সহজ কথায়, মেরিনরা প্রাথমিক আক্রমণ করে পথ তৈরি করবে, আর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন সেই অবস্থানে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করে অবস্থান ধরে রাখবে।

ইরানে মার্কিন স্থলবাহিনী মোতায়েন করা হলে তা হবে এই যুদ্ধের একটি বড় সামরিক উত্তেজনা বা পরিস্থিতির তীব্রতা বৃদ্ধি। এ ধরনের অভিযান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ সেখানে কাছাকাছি খুব বেশি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই। তা সত্ত্বেও, হরমুজ প্রণালী অতিক্রম না করেই উপসাগরীয় অঞ্চলের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে দ্রুত আঘাত হানার জন্য এই প্যারাট্রুপাররা বিশেষভাবে উপযোগী।

এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। এই মোতায়েনগুলো এখনো চূড়ান্ত আদেশের চেয়ে পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি হিসেবেই বেশি বিবেচিত হচ্ছে এবং মিশন যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে।