যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধবিরতি: ৪০তম দিনে যা ঘটছে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের ৪০তম দিনে এসে এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে পরিস্থিতি। মঙ্গলবার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

আল জাজিরা বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া চূড়ান্ত সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে এই সমঝোতা হয়। এর আওতায় ইরান সাময়িকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে রাজি হয়েছে এবং শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দুই সপ্তাহের জন্য এই কৌশলগত জলপথে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা হবে।

এই যুদ্ধবিরতি অর্জনের পেছনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে জানা গেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সময়সীমা বাড়াতে এবং ইরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

হরমুজ প্রণালি, অর্থনীতি ও কৌশল

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং ইরান ও ওমান ট্রানজিট ফি আদায় করতে পারবে। তেহরান জানিয়েছে, এই অর্থ যুদ্ধ-পরবর্তী দেশ পুনর্গঠনে ব্যবহার করা হবে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত এই প্রণালি খোলা বা বন্ধ থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকায় আগুন দিচ্ছেন ইরানিরা। ছবি: এএফপি

ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা

শুক্রবার ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া আলোচনায় ইরান একটি ১০ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির জন্য তহবিল গঠন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার প্রদান।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা অব্যাহত

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি। ইসরায়েল জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং সেখানে তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

যুদ্ধবিরতির পরও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্যবস্তু হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একইসঙ্গে গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।

ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে ইরান ও লেবানন থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলায় অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছে বলে দেশটির জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে।

অন্যদিকে, ইরাকের ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো দুই সপ্তাহের জন্য সামরিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

ইরানে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি

তেহরানে হামলা ও প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলি বাহিনী স্বীকার করেছে যে, একটি অভিযানে ভুলবশত তেহরানের একটি সিনাগগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং এটিকে ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে তেহরানের নেতৃত্ব যুদ্ধকে নিজেদের পক্ষে সফল হিসেবে তুলে ধরছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশটির নেতৃত্ব জনগণকে বোঝাতে চাইছে যে, এই যুদ্ধ ‘ইরানের শর্তেই শেষ হচ্ছে’।

কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চীন ভূমিকা রেখেছে।

এদিকে ন্যাটো প্রধান মার্ক রুটে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন, যেখানে ইরান সংকটের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।

আঞ্চলিকভাবে তেহরান ও বাগদাদে যুদ্ধবিরতি উপলক্ষে উদযাপন দেখা গেলেও অনেক সাধারণ নাগরিক সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই বিরতিকে পুনর্গঠনের সময় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের সতর্কতা

যুদ্ধবিরতির আগে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় একই সময়ে সতর্কতা জারি করে এবং তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে।

বাহরাইনে একটি স্থাপনায় হামলার পর আগুন লাগলেও দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে সৌদি আরবকে এই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।

বাগদাদে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ইরাকের স্কুলশিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকার ওপর দাঁড়িয়ে খেলতে দেখা যায়। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

হোয়াইট হাউস যুদ্ধবিরতিকে পিছু হটা নয়, বরং একটি কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, ‘এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় সর্বোচ্চ সুবিধা এনে দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ খুলে দিতে পারে।’

এদিকে ইরাকে অপহৃত মার্কিন সাংবাদিক শেলি কিটলসনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সির মতে, এই যুদ্ধবিরতি আসলে ট্রাম্পের একটি কৌশলগত পিছু হটা, কারণ সংঘাতটি ‘সম্পূর্ণ বিপর্যয়ে’ পরিণত হচ্ছিল। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের একটি বের হওয়ার পথ দরকার ছিল এবং তিনি সেটিই বেছে নিয়েছেন।’

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী দুই সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ সময়ের আলোচনার ফলাফলই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে নাকি আবার সংঘাতে রূপ নেবে।

তার মতে, আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর। এমনকি আলোচনা ব্যর্থ হলেও একই মাত্রার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইরান এখনো উল্লেখযোগ্য চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা ধরে রেখেছে।