ইস্টার উপলক্ষে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধবিরতি, যা জানা যাচ্ছে
ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব অর্থোডক্স ইস্টার উপলক্ষে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। তবে অতীত অভিজ্ঞতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে এই যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
কী সিদ্ধান্ত হয়েছে?
এএফপি বলছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বৃহস্পতিবার রাতে এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। ক্রেমলিনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেল ৪টা থেকে শুরু হয়ে রোববার রাত পর্যন্ত, মোট প্রায় ৩২ ঘণ্টা যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলৌসোভ এবং সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভকে এই সময়ের মধ্যে সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, ইস্টার উপলক্ষে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তারা আগেই দিয়েছিল এবং রাশিয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় তারাও একইভাবে পদক্ষেপ নেবে।
আগের যুদ্ধবিরতির অভিজ্ঞতা
এর আগে, গত বছরও ইস্টার উপলক্ষে একই ধরনের স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিল রাশিয়া। তবে সেই সময় উভয় পক্ষই শত শতবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
পরবর্তীতে ৯ মে রাশিয়ার জাতীয় দিবস উপলক্ষে আরও একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়া হলেও সেটিও কার্যকর হয়নি। ইউক্রেন সে সময় এই উদ্যোগকে ‘চরম ভণ্ডামি’ হিসেবে আখ্যা দেয়।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে রাশিয়া বরাবরই অনীহা দেখিয়ে আসছে। তারা চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির দিকে এগোতে চায়, অন্যদিকে ইউক্রেন বলছে, মস্কো প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী নয়।
যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার অগ্রগতি অনেকটাই ধীর হয়ে এসেছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত মাসে প্রায় আড়াই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো রাশিয়া উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন এলাকা দখল করতে পারেনি।
মার্চ মাসে পুরো ফ্রন্টলাইনে রাশিয়া মাত্র ২৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে এবং কিছু এলাকায় তারা অবস্থান হারিয়েছে।
বর্তমানে ইউক্রেনের মোট ভূখণ্ডের ১৯ শতাংশের একটু বেশি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরমধ্যে ক্রিমিয়া এবং দনবাস অঞ্চলের কিছু অংশ ২০২২ সালের আগেই রাশিয়া বা রুশপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
শান্তি আলোচনা কোথায় দাঁড়িয়ে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ বন্ধে একাধিক দফা আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। আবুধাবি ও জেনেভায় একাধিক বৈঠকও হয়েছে।
তবে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
শান্তি চুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে ভূখণ্ড ইস্যু। ইউক্রেন বর্তমান অবস্থান ধরে রেখে যুদ্ধ ‘ফ্রিজ’ করার প্রস্তাব দিলেও রাশিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেছে। মস্কো চায়, ইউক্রেন দোনেৎস্ক অঞ্চলের পুরো নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিক, যা কিয়েভের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
এ ছাড়া, ঝাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধবিরতির আশঙ্কা
ইউক্রেন জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে, যদিও এটি কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে দেশটির নাগরিকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিগা বলেছেন, ‘কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে যুদ্ধবিরতি একটি সঠিক কৌশল।’
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধবিরতি খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না। রুশ বিশ্লেষক কনস্তানতিন কালাচেভের মতে, রাশিয়া এখনো তাদের অবস্থান থেকে সরে আসতে প্রস্তুত নয়।
একইসঙ্গে রুশপন্থী সামরিক ব্লগারদের মতে, এই স্বল্প সময়ের যুদ্ধবিরতি মূলত নিহত ও আহতদের সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, কারণ ড্রোন যুদ্ধের কারণে এমন কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সব মিলিয়ে ইস্টার উপলক্ষে এই যুদ্ধবিরতি যুদ্ধের গতি কিছুটা কমাতে পারলেও স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সমাধানের জন্য উভয় পক্ষকেই বড় ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।