ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে শঙ্কা, উ. কোরিয়ার বিষয়ে সতর্কবার্তা আইএইএ প্রধানের
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের মতো কোনো সম্ভাব্য চুক্তি মূলত প্রযুক্তিগত নয় বরং একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো সমঝোতার ক্ষেত্রে কঠোর আন্তর্জাতিক যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে সেই চুক্তির বাস্তব কোনো মূল্য থাকবে না।
দ্য কোরিয়া হেরাল্ডের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রোসি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এর ৫, ১০ বা ২০ বছরের মেয়াদ প্রযুক্তিগতভাবে বড় কোনো পার্থক্য তৈরি করে না। বরং এটি নির্ভর করে পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার ওপর।
‘স্থগিতাদেশের ক্ষেত্রে এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মেয়াদ যতই হোক, প্রযুক্তিগতভাবে বড় পার্থক্য নেই’, বলেন তিনি।
তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, যাচাই ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। ‘যাচাই ছাড়া কোনো চুক্তি শুধু একটি কাগজের প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে। তখন সেটি কার্যত কোনো চুক্তিই নয়, বরং চুক্তির ভ্রম’, বলেন গ্রোসি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকেও চাপের মুখে ফেলেছে।
১১-১২ এপ্রিলের এই বৈঠকগুলো ছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি সংলাপ, যেখানে যুদ্ধবিরতি স্থিতিশীল করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতা চাইলেও ইরান পরমাণু অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তির আওতায় নিজেদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখতে অনড় অবস্থানে রয়েছে।
গ্রোসি জানান, তিনি সরাসরি এই আলোচনায় যুক্ত নন এবং আলোচনার বিস্তারিত বিষয়বস্তু সম্পর্কেও নিশ্চিত নন।
ইরানের বর্তমান পারমাণবিক মজুদের বিষয়ে গ্রোসি বলেন, সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী দেশটির ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বেশিরভাগই আগের সংরক্ষণস্থলেই রয়েছে, বিশেষ করে ইসফাহানের স্থাপনাগুলোতে।
এই বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক উপকরণ পর্যবেক্ষণের জন্য বিস্তৃত ও ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইএইএ প্রধান। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে পরিদর্শকদের বহিষ্কারের পরও সংস্থাটি বিভিন্ন উপায়ে দেশটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে এবং সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইয়ংবিয়নসহ বিভিন্ন স্থাপনায় কার্যক্রম দ্রুত বাড়ছে।
এর মধ্যে ৫ মেগাওয়াট রিঅ্যাক্টর, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট এবং হালকা পানির রিঅ্যাক্টরের কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত। এসব কার্যক্রম দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
তিনি আরও জানান, ইয়ংবিয়নের সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের মতো একটি নতুন স্থাপনা নির্মাণের লক্ষণও দেখা গেছে, যা দেশটির সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে। তবে সরাসরি প্রবেশাধিকার না থাকায় সঠিক উৎপাদনমাত্রা নিরূপণ করা কঠিন।
রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে গ্রোসি বলেন, সামরিক ক্ষেত্রে এমন কোনো সহযোগিতার প্রমাণ আইএইএ পায়নি। তবে বেসামরিক পারমাণবিক প্রকল্পে কিছু সহযোগিতার ইঙ্গিত রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন কর্মসূচি প্রসঙ্গে গ্রোসি বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে আইএইএ-এর সঙ্গে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে, যাতে ব্যবহৃত পারমাণবিক উপাদান অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত না হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এইউকেইউএস জোটের মাধ্যমে জটিল কাঠামোয় এই প্রকল্প এগোচ্ছে, অন্যদিকে ব্রাজিল নিজস্ব প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে এখনো অনেক বিষয় স্পষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করে তিনি। বলেন, এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং এতে গবেষণা, পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সমন্বয়ের বহু ধাপ রয়েছে, যা সম্পন্ন হতে এক দশক বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।
সামগ্রিকভাবে গ্রোসি জোর দিয়ে বলেন, ইরানসহ যেকোনো দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি কার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য যাচাই ব্যবস্থাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।