ট্রাম্পের অস্ত্র যেভাবে তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করছে ইরান
দেখতে এটি যেন একটি সাধারণ লেগো সেট। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা।
চাঁদের আলোয় আলোকিত এক নির্জন প্রান্তরে ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে আসছেন আমেরিকার এক আদিবাসী নেতা। এরপর দ্রুত দৃশ্য বদলাতে দেখা যায়—যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নিপীড়নের শিকার বিভিন্ন মানুষ: শৃঙ্খলবন্দি কৃষ্ণাঙ্গ, ইরাকের কুখ্যাত আবু গারিব কারাগারের বেঁচে থাকা ভুক্তভোগী।
তারপর দৃশ্য যায় ইরানি সেনাদের দিকে, যারা ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যানার লাগাচ্ছে—‘অপহৃত কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য’, ‘হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানুষের জন্য’, ‘ইরানের এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫-এর নিহতদের স্মরণে’। শেষ দৃশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিশাল মূর্তি ভেঙে পড়ে, আর ভেসে ওঠে বার্তা—‘সবার জন্য এক প্রতিশোধ’।
For all the crimes you committed against humanity,
for all the voices you silenced,
and for all the children whose play was left unfinished—
Once and for all
ONE VENGEANCE FOR ALL. pic.twitter.com/7JugYm2YU4— Explosive Media (@ExplosiveMediaa) March 28, 2026
আল জাজিরা বলছে, এই ভিডিওটি ২৯ মার্চ প্রকাশিত হয় এবং সামাজিকমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি ইরানভিত্তিক কয়েকটি গ্রুপের তৈরি একাধিক লেগো-ধাঁচের ভিডিওর অংশ, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে তেহরানের বার্তাকে জোরদার করছে।
এই ভিডিওগুলোর নির্মাতা ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’—যারা লেগোর মতো ব্লক ও চরিত্র ব্যবহার করে কখনো গম্ভীর, কখনো র্যাপ-স্টাইলের ভিডিও বানাচ্ছে। তাদের তৈরি কনটেন্টে প্রায়ই ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করা হয় এবং তার নিজের বক্তব্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়—যেখানে তাকে ভণ্ডামি ও ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।
তাদের একটি ইউটিউব চ্যানেল ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সহিংসতা প্রচারের অভিযোগে। তবে গ্রুপটির এক প্রতিনিধি জানান, এতে তারা বিস্মিত নন। তার ভাষায়, ‘পশ্চিমা বিশ্ব সত্যকে নীরবতার আড়ালে ঢেকে রাখে এবং যে কণ্ঠ তা প্রকাশ করতে চায়, তাকে থামিয়ে দেয়।’
The veil is thinning.
Good. Evil.
Time is running out.
Choose your side.
𝐑𝐈𝐒𝐄 𝐔𝐏! pic.twitter.com/iFdCJpiygL— Explosive Media (@ExplosiveMediaa) April 2, 2026
প্রতীকের ব্যবহার ও বার্তা
এই ভিডিওগুলোর ভিজ্যুয়ালে গভীর প্রতীকী অর্থ রয়েছে। সবুজ ও লাল রঙের ব্যবহার শিয়া ঐতিহ্যের প্রতিফলন—সবুজ ন্যায়বিচারের প্রতীক মহানবীর (সা.) দৌহিত্র হুসাইনের, আর লাল অত্যাচারের প্রতীক।
ভিডিওগুলোতে ‘এপস্টিন রেজিম’, ‘লুজার’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের ব্যঙ্গ করা হয়। ট্রাম্পের ‘মাগা’ টুপি পরা চরিত্রগুলো দেখিয়ে তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি—যেমন নতুন যুদ্ধে না জড়ানো বা সাধারণ মানুষের পাশে থাকার কথা—ভঙ্গ করার অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
একটি ভিডিওতে লেবাননের জনগণের উদ্দেশে বার্তা দেওয়া হয়—ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ড তাদের ছেড়ে যাবে না। এটি এমন এক সময় প্রকাশ করা হয়, যখন দেশটিতে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ চলছিল।
এই কনটেন্ট তৈরির পেছনে কাজ করছে ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী ১০ জনের একটি দল। তারা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে—যদিও ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর বেশিরভাগ সামাজিকমাধ্যমই ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।
তাদের দাবি, তারা স্বাধীনভাবে কাজ করে। যদিও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাদের কিছু কনটেন্ট কিনে সম্প্রচার করে, তবুও তারা আগে কনটেন্ট তৈরি করে, পরে সেটি বিক্রি করে।
In 48 hours,
You learned the truth:
Everything for Epstein’s pleasure
Soldiers thrown in the trash.
𝐁𝐥𝐚𝐜𝐤 𝐅𝐫𝐢𝐝𝐚𝐲! pic.twitter.com/KNUJ5RIBOi— Explosive Media (@ExplosiveMediaa) April 6, 2026
বর্ণনার লড়াইয়ে নতুন কৌশল
এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া একা নয়। ‘পারসিয়া বই’ ও ‘সাউদার্ন পাঙ্ক’র মতো অন্যান্য নির্মাতারাও একই ধরনের লেগো ভিডিও তৈরি করছে। এই প্রবণতা ইরানের বাইরে ছড়িয়ে পাকিস্তানেও পৌঁছেছে। ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার আগে স্থানীয় নির্মাতারাও এমন ভিডিও বানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভিডিওগুলোর শক্তি রয়েছে তাদের উপস্থাপনায়। ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক ফাসি জাকা বলেন, পশ্চিমা গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে যে বর্ণনা তৈরি করেছে, তার বিপরীতে এই ভিডিওগুলো তথ্যযুদ্ধের একটি নতুন পথ তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, ভিডিওগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজন—যেমন ‘এপস্টিন’ ইস্যু বা ‘মাগা’ রাজনীতি—খুব কৌশলে ব্যবহার করছে, যা এগুলোকে আরও কার্যকর করে তুলছে।
دمُكم دمُنا
أطفالُكم أطفالُنا
لن نترك لبنان أبدًا
انتظروا قلیلا... pic.twitter.com/NSdUJ0emuB— Explosive Media (@ExplosiveMediaa) April 8, 2026
জনমত যুদ্ধের অংশ
কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোনসের মতে, ইরান জানে যে সামরিকভাবে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে পারবে না। তাই জনমত গড়ে তোলাই তাদের সবচেয়ে বড় কৌশল।
তার ভাষায়, এই ধরনের ‘ট্রল প্রোপাগান্ডা’—যেখানে ব্যঙ্গ ও তীক্ষ্ণ বার্তা ব্যবহার করা হয়—বর্তমান যুগে খুব কার্যকর।
তিনি মনে করেন, ভিডিওগুলোর বার্তা আরও বেশি প্রভাব ফেলত যদি সেগুলো ইরান থেকে না আসত—কারণ পশ্চিমা দর্শকদের মধ্যে ইরান সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস রয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, এই ভিডিওগুলোর আক্রমণাত্মক ভাষা ও কৌশল অনেকটাই ট্রাম্পের নিজস্ব যোগাযোগশৈলীর প্রতিফলন। ফলে এক অর্থে, ইরান ট্রাম্পের অস্ত্রই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।
সব মিলিয়ে লেগোর মতো নিরীহ উপস্থাপনাকে ব্যবহার করে ইরান যে বার্তা দিচ্ছে, তা কেবল বিনোদন নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত তথ্যযুদ্ধের অংশ, যেখানে লক্ষ্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বিশ্বজনমতও।
