হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের নতুন কৌশল: ‘ফি’ নয়, নিয়ন্ত্রণই মূল লক্ষ্য
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ নিয়ে ইরান যে নতুন অবস্থান নিয়েছে, তা কেবল আঞ্চলিক নয়, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
আল জাজিরা ও ডনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরান প্রচলিত অর্থে কোনো ট্রানজিট ফি আরোপ না করলেও, প্রণালির ওপর কার্যত পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিকে এগোচ্ছে।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে ফি আরোপের পরিকল্পনা নেই। তবে একইসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানি পার্লামেন্ট একটি নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে ‘প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ’–সংক্রান্ত খরচ নির্ধারণ করা হতে পারে। এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, সরাসরি ফি না বললেও ভিন্ন আকারে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রেজায়ি আরও বলেন, প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতেই হবে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে পরিচিত এই রুটে অবাধ চলাচলের ধারণার পরিবর্তে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে তেহরান। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো দেশগুলোর সামরিক জাহাজকে ‘বৈরি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথাও তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, ‘বন্ধুসুলভ’ দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজ পূর্ব-সমন্বয়ের মাধ্যমে চলাচলের সুযোগ পাবে।
এই অবস্থানকে আরও জোরালো করেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। গালিবাফের ভাষায়, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ‘মাঠের বাস্তবতা’ দিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নয়।
গালিবাফের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে—যদি অবরোধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তাহলে প্রণালিটি উন্মুক্ত থাকবে না। এর অর্থ, ইরান প্রণালিকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত। তিনি জানান, জাহাজ চলাচল নির্দিষ্ট রুট ও ইরানের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, যা একটি নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো ইরানের বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে দেশটি হরমুজ প্রণালিকে একটি ‘বার্গেইনিং চিপ’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। ইতোমধ্যে ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে নতুন নৌপথগুলো ইরানের উপকূলের কাছাকাছি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রণালিতে ইরানের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হবে।
একইসঙ্গে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, চলমান যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়ের জন্য প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খোলা থাকতে পারে। তবে সামরিক জাহাজের ক্ষেত্রে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ, ‘খোলা’ ও ‘বন্ধ’—এই দুই অবস্থার মধ্যবর্তী একটি শর্তাধীন ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে তেহরান।
সব মিলিয়ে ইরানের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, হরমুজ প্রণালি এখন আর শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার। সরাসরি ফি আরোপ না করলেও, নিয়ন্ত্রণ, সমন্বয় এবং শর্ত আরোপের মাধ্যমে ইরান কার্যত প্রণালির ওপর তার প্রভাব বাড়াতে চাইছে। এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতে নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও গভীরভাবে অনুভূত হতে পারে।


