ইরানি নৌকায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল তেহরান
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাতটি নৌকায় হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন এখন পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে মূলত অবরুদ্ধ এই জলপথ দিয়ে বের করে আনার চেষ্টা করছে।
গতকাল সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ কোরিয়া—উভয় দেশই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজে হামলার খবর জানিয়েছে। আরব আমিরাত আরও জানিয়েছে, ইরানের হামলার পর ফুজাইরাহ তেল বন্দরে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।
শিপিং কোম্পানি মেয়ার্স্ক বিবিসিকে জানিয়েছে যে, তাদের একটি মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিরাপত্তায় সফলভাবে প্রণালি পার হয়েছে। ট্রাম্প এই পাহারা দেওয়ার অভিযানকে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নাম দিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন যে, প্রণালিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এটিই ‘স্পষ্ট করে দেয় যে কোনো রাজনৈতিক সংকটের সামরিক সমাধান নেই’। তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম আসলে একটি অচলাবস্থা বা প্রজেক্ট ডেডলক।’
শিপিং কোম্পানি মেয়ার্স্ক জানিয়েছে যে, তাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ নির্বিঘ্নে পার হয়েছে এবং সব ক্রু নিরাপদ আছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালানোর পর থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। তেহরান এর পাল্টা জবাব হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ করে দেয়, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
এপ্রিলের শুরুতে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে, যার ফলে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করে। তবে এরপর থেকে খুব কম জাহাজই এই প্রণালি অতিক্রম করতে পেরেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নিজস্ব অবরোধ আরোপ করেছে।
ট্রাম্প বলেন, আমরা সাতটি ছোট নৌকা বা যেগুলোকে ওরা ফাস্ট বোট বলে, সেগুলো ডুবিয়ে দিয়েছি। ওদের কাছে কেবল এগুলোই অবশিষ্ট ছিল।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, নৌকাগুলোতে হামলা চালাতে তারা হেলিকপ্টার ব্যবহার করেছে।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের এই দাবি অস্বীকার করেছে। একটি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ফাস্ট বোট নয় বরং দুটি ছোট মালবাহী জাহাজে আঘাত হানা হয়েছে এবং এতে পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, সোমবার তাদের নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার এবং মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ওই প্রণালি অতিক্রম করেছে।
ইরান এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে অভিহিত করেছে। ইরানি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে সতর্কতা হিসেবে গুলি ছুড়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই দাবি অস্বীকার করেছে।
এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আডনক সংশ্লিষ্ট একটি ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের একটি জাহাজে বিস্ফোরণের খবর জানিয়েছে, যা আমিরাত উপকূলের ঠিক কাছেই নোঙর করা ছিল।
আমিরাত কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, তিনটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং চারটি ড্রোন প্রতিহত করেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, একটি হামলার কারণে ফুজাইরাহ তেল বন্দরে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং এতে তিনজন আহত হন।
আবুধাবি এই হামলাকে বিপজ্জনক প্ররোচনা আখ্যা দিয়ে বলেছে, হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এক অজ্ঞাত সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো পরিকল্পনা ইরানের নেই।
বিভিন্ন দেশ আমিরাতের অবকাঠামোতে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এই হামলাকে অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, যুক্তরাজ্য উপসাগরীয় অঞ্চলে "আমাদের মিত্রদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
ফুজাইরাহ বন্দরে হামলার খবরের পরপরই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।